ফার্মগেট এলাকার ফুটপাত: উচ্ছেদের পর আবার দখল

ফুটপাত দিয়ে হাঁটার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই

  তেজগাঁও প্রতিনিধি ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফার্মগেট এলাকার ফুটপাত: উচ্ছেদের পর আবার দখল
তেজগাঁও কলেজের সামনে ইন্দিরা রোডের দুই পাশে ফুটপাতে দোকানপাট। এতে সমস্যায় পড়েছেন পথচারীরা। ছবি: যুগান্তর

বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েও দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না ফার্মগেট এলাকার ফুটপাত। সকালে উচ্ছেদ করলে বিকালেই দখল। নগরীর অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেটে প্রতিদিন লাখো মানুষের পদচারণা।

দিন-রাত সবসময়ই মানুষে ভরপুর থাকে ফুটপাত ও রাস্তাঘাট। সিটি কর্পোরেশন ও সরকারের প্রচেষ্টায়ও অবৈধ দখলমুক্ত হচ্ছে না এই এলাকার ফুটপাত।

সিটি কর্পোরেশন ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ক্ষমতাসীন দল, সিটি কর্পোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সদিচ্ছা না থাকায় এসব ফুটপাত দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না।

জানা যায়, গত অর্থবছরে ফার্মগেট এলাকায় পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য আধুনিক টাইলস দিয়ে ফুটপাত উন্নয়ন করা হয়। অথচ বেশির ভাগ দখল থাকায় ফুটপাত ধরে হেঁটে চলাচল করার কোনো সুব্যবস্থা নেই। দখলদারিত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছে না ফুটপাতের কোনো অংশ।

ফুটপাতজুড়েই গিজগিজ করছে বিভিন্ন ধরনের দোকান। পথচারীদের হাঁটার জায়গা দখল করে নানা ধরনের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা।

ফুটপাত দিয়ে হাঁটার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। তাই পথচারীরা বাধ্য হয়ে চলাচলের জন্য ব্যবহার করছেন মূল সড়ক। ফলে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। সেই সঙ্গে প্রতিনিয়ত পথচারীরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।

এই এলাকায় সরকারি-বেসরকারি বহু স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু কোচিং সেন্টারও রয়েছে। তাছাড়া রয়েছে বেশ কয়েকটি মার্কেট; যার জন্য প্রতিদিন এলাকার ফুটপাত ও রাস্তাঘাট মানুষে ভরপুর থাকে।

ফার্মগেট এলাকাজুড়ে ফুটপাতে দোকানের আধিক্য অসহনীয়। ফুটপাতগুলো হকাররা দখল করে ব্যবসা করলেও এর নেপথ্যে আছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। রাজধানীর হকাররাও এসব সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। প্রতিদিনই চলছে মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি।

কোনো এক অদৃশ্য শক্তির কারণে তাদের এ আধিপত্য। স্থায়ীভাবে ফুটপাত দখলমুক্ত ও হকারদের কোনোভাবেই ঠেকাতে পারছে না ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন।

ফার্মগেটের তেজগাঁও কলেজ ইন্দ্রিরা রোড, আনন্দ সিনেমা হল সড়ক, গ্রিন রোড, খামারবাড়ি, হলিক্রস রোডসহ প্রায় সব ফুটপাতই হকারদের দখলে। জানা যায়, এসব ফুটপাতে ব্যবসা করতে হলে প্রত্যেক হকারকেই ১০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত এককালীন দিতে হয়। এরপর দৈনিক ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। টোল না দিলে ফুটপাতে ব্যবসাও করা যায় না; যার একটি বড় অংশ পায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।

হলিক্রস কলেজ রোডের একাধিক পথচারী বলেন, ফার্মগেট এলাকার ফুটপাত দখল থাকায় রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে হয়; যা পথচারীদের জন্য খুবই বিপজ্জনক। বেশির ভাগ সময় রাস্তায় প্রচণ্ড যানবাহনের চাপ থাকে। তাই রাস্তা দিয়েও চলাচল করা যায় না।

ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সময় বহু মানুষের ধাক্কা খেতে হয়। বিশেষ করে নারী পথচারীদের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।

তেজগাঁও কলেজের সামনে ইন্দ্রিরা রোড এলাকায় দেখা যায়, এ সড়কের ফুটপাত দখল থাকায় পথচারীরা প্রধান সড়ক ধরে চলাচল করছেন। অন্যদিকে কলেজের সামনের রাস্তায় পথচারীর ঘিঞ্জি অবস্থা বিরাজ করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক আসিফ আকবার বলেন, গুলিস্তানের মতো এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করা গেলে এখানে কেন করা যাবে না? এই এলাকায় প্রতিদিন লাখো মানুষের চলাচল। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।

এখানে আগে ফুটপাত দখলমুক্ত করা প্রয়োজন। ফুটপাত রেখে বেশির ভাগ পথচারীকেই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে হয়। এজন্য প্রায়ই অনেক পথচারী দুর্ঘটনার শিকারও হন।

আমরা নারীর নিরাপত্তার কথা বলি অথচ তাদের নিরাপত্তার জন্য আমরা কোনো ব্যবস্থা নেই না। ফুটপাত দখল করে থাকা এক দোকানি সালেহ মিয়া বলেন, ‘টাকা দিয়ে দোকান বসাইছি, আবার প্রতিদিন চাঁদাও দিতে হয়।

মানুষও হাঁটুক, আমাদেরও ব্যবসা হোক। ফুটপাতে দোকান না বসালে কই যামু? বাজারে দোকানঘর নেয়ার মতো তো পুঁজি নাই। তাই প্রতিদিন লাইনম্যানকে টাকা দিয়ে দোকান চালাই।’

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্ষমতাসীন দল, সিটি কর্পোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নেন।

এ কারণেই উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টা পর হকাররা আবার ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে তাদের বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, স্থানীয় নেতা এবং পুলিশের মদদপুষ্ট চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফুটপাত দখলমুক্ত করা সম্ভব হবে না।

পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার হাইকোর্টের একাধিকবার আদেশ থাকলেও মানছে না কেউই।

হকার সূত্রে জানা গেছে, শার্ট, প্যান্টের ছোট দোকানের জন্য প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আর জুতা ও আরেকটু বড় দোকানের জন্য ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। কিন্তু এসব টাকা মূলত কাদের হাতে যাচ্ছে এর উত্তর দিতে নারাজ তারা।

তাদের ভাষায়- তারা শুধু লাইনম্যানকেই চেনেন, যারা এসে প্রতিদিন টাকা নিয়ে যান। ফার্মগেট এলাকা থেকে প্রতিদিন চাঁদা আদায় করে (লাইনম্যান) শাহ আলম, দুলাল, আবদুল আজিজ ও দেলোয়ার।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অঞ্চল-৫-এর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ হোসেন বলেন, পথচারীদের চলাচলের জন্য ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে সিটি কর্পোরেশন সব সময়ই তৎপর। আমাদের মশক নিধনের চিরুনি অভিযান শেষ হয়েছে।

ফুটপাত দিয়ে নির্বিঘ্নে পথচারী চলাচল নিশ্চিত করতে হেড অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের থেকেও একটি আদেশ আসছে। শিগগিরই আমরা ফুটপাত অভিযানে যাব এবং সব সময় মনিটরিং করা হবে; যাতে আবার ফুটপাত দখল না হয়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×