করোনা বিষয়ে সচেতন নন তুরাগের ৯ বস্তির বাসিন্দা
jugantor
করোনা বিষয়ে সচেতন নন তুরাগের ৯ বস্তির বাসিন্দা
ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

  মো. পলাশ প্রধান  

২৪ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের বিষয়ে সচেতন নন তুরাগের ৯ বস্তির বাসিন্দারা। এতে এসব বস্তিতে যেকোনো মুহূর্তে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিভিন্ন কারণে এসব বস্তিতে অনেক লোক সমাগম দেখা গেছে। এ ছাড়া, এক সঙ্গে গোসল করা, বাজার করা, এমনকি খেলাধুলাও তারা করছে। বস্তির এসব মানুষকে সচেনতন করার জন্য কোনো উদ্যোগও চোখে পড়েনি।

এসব বস্তির মধ্যে রয়েছে- ১৫ নং বালুর মাঠ বস্তি, রানাভোলা বালুর মাঠ বস্তি, ফুলবাড়িয়া বালুর মাঠ বস্তি, টেকপাড়া বস্তি, কামারপাড়া বেদেপল্লি বস্তি, পাকুরিয়া বস্তি, শুক্রভাঙ্গা বস্তি, নয়নগর বস্তি, চণ্ডলভোগ বস্তি। এসব বস্তিতে আনুমানিক আড়াই লাখ মানুষের বসবাস। এর মধ্যে শিশু বয়স্করাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

বস্তিগুলোর প্রতিটি গলিতে ভ্রাম্যমাণ ফুসকা, চটপটি, হালিম, আচার, পিঠা, মুড়ির দোকান রয়েছে। এসব দোকানির মুখে মাস্ক নেই, হাতে হ্যান্ডগ্লাভসও নেই। ভিড় জমিয়ে একসঙ্গে ১০-১২ জন একত্রে খাচ্ছে। বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হতদরিদ্র এসব মানুষের করোনা নিয়ে তেমন আতঙ্ক নেই। তাদের আতঙ্ক রোজগার নিয়ে।

এদিকে, প্রতিদিন নতুন করে বহু মানুষ বস্তিতে এসে কম টাকায় ঘড় ভাড়া নিচ্ছে। যারা স্বল্প টাকা চাকরি করে বা দিন এনে দিন খায় তারাই বস্তিকে টার্গেট করে। তাদেরও আশ্রয় মিলছে বস্তিতেই। এসব মানুষের মধ্যে রয়েছে, গৃহকর্মী, গার্মেন্ট শ্রমিক, গাড়িচালক ও দিনমজুর।

তুরাগের বস্তির এসব বাসিন্দার মধ্যে বিশাল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের জন্য কোনো স্বাস্থ্যকর আবাসনের ব্যবস্থা নেই। এখন পর্যন্ত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে বস্তিবাসী তেমন কোনো সাহায্য পায়নি।

নাছিমা আক্তার তুরাগের ১৫নং বালুর মাঠ বস্তিতে ৯ বছর ধরে থাকেন। তিনি উত্তরার আবাসিক এলাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। জন্মের পর থেকেই ভূমিহীন তার পরিবার। তাই আরও অনেকের মতো নোয়াখালী থেকে ঢাকার পথেই পাড়ি জমিয়েছেন নাছিমা আক্তারের পরিবার। দুই ছেলে তিন মেয়ের সংসারে স্বামী রিকশাচালক। হঠাৎ করোনাভাইরাসের কারণে বাড়িওয়ালা একটি ঘড় ভাগ করে তিনটি ঘড় বানিয়ে ভাড়া দিয়েছে। এখন এ চারটি ঘড়ের সদস্যের সংখ্যা প্রায় ১৫ জনের বেশি। করোনাভাইরাস সম্পর্কে নাছিমা আক্তার বলেন, এ ভাইরাস সম্পর্কে টিভিতে দেখেছি। দেখলেইবা কী হবে? তিনি বলেন, গরিব অসহায়দের এসব ভাইরাসে আক্রান্ত করতে পারবে না। তুরাগ রানাভোলা বালুর মাঠ বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, গাদাগাদি করে রাখা হাঁড়ি-পাতিল, ছোট আলমারিসহ সংসারের সব কিছু। হাঁটতে হাঁটতে একটি গণ-রান্নাঘরে চোখে পড়ে। রান্নার বর্ণনা জানতে চাইলে রহিমা বেগম নামে এক বস্তির বাসিন্দা বলেন, একটি মেসে ৩৫ জনের জন্য রান্না করেন তিনি। করোনার সম্পর্কে অবগত নন। কোনো দিন মুখে মাস্ক বা হাতে হ্যান্ডগ্লাভস পরেননি। হঠাৎ করে কিভাবে পড়ব? তাছাড়া, গরিব মানুষ টাকা নাই। এসব জিনিস ক্রয় করারও ক্ষমতা নাই। করোনাভাইরাস সম্পর্কে আমাদের বস্তিবাসীকে কেউ সচেতন করতে আসেনি। আমরা একত্রে টয়লেট, গোসলখানা, পানির কল সব ব্যবহার করি। এখন পর্যন্ত আমাদের বস্তিতে করোনাভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হয়নি। তার বিশ্বাস ভবিষ্যতেও কারও এ রোগ হবে না।

ফুলবাড়িয়া বালুর মাঠ বস্তির দশম শ্রেণীর ছাত্র মো. নয়ন আহম্মেদ বলেন, করোনাভাইরাস সম্পর্কে অনেক ভয়ানক খবর শুনছি। তবে, আমাদের বস্তিতে কেউ এ ভাইরাস সম্পর্কে বিশ্বাস করে না। আমিও অনেকের কাছে গিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করছি। কেউ এ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ৫৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. জাহাঙ্গীর হোসেন যুবরাজ বলেন, ইতোমধ্যে আমার ওয়ার্ডের সব অসহায় গরিব দরিদ্রের মাঝে লিফলেট, মাস্ক ও স্প্রে বিতরণ করা হয়েছে। আমার ওয়ার্ডে এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ডা. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাস ছোঁয়াচে রোগ। এটি একজনের মধ্যে আক্রান্ত হলে সাথে সাথে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। তাদের হালকা জ্বর দেখা দিলে স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হবে। অবশ্যই মুখে মাস্ক পরতে হবে। বস্তির অধিকাংশ মানুষ এসব বিষয়ে সচেতন নয়। তাদের করোনাভাইরাস সম্পর্কে বেশি বেশি সচেতন করতে হবে। সচেতন না হলে বস্তিতে অতিদ্রুত মহামারী দেখা দিবে।

করোনা বিষয়ে সচেতন নন তুরাগের ৯ বস্তির বাসিন্দা

ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
 মো. পলাশ প্রধান 
২৪ মার্চ ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের বিষয়ে সচেতন নন তুরাগের ৯ বস্তির বাসিন্দারা। এতে এসব বস্তিতে যেকোনো মুহূর্তে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিভিন্ন কারণে এসব বস্তিতে অনেক লোক সমাগম দেখা গেছে। এ ছাড়া, এক সঙ্গে গোসল করা, বাজার করা, এমনকি খেলাধুলাও তারা করছে। বস্তির এসব মানুষকে সচেনতন করার জন্য কোনো উদ্যোগও চোখে পড়েনি।

এসব বস্তির মধ্যে রয়েছে- ১৫ নং বালুর মাঠ বস্তি, রানাভোলা বালুর মাঠ বস্তি, ফুলবাড়িয়া বালুর মাঠ বস্তি, টেকপাড়া বস্তি, কামারপাড়া বেদেপল্লি বস্তি, পাকুরিয়া বস্তি, শুক্রভাঙ্গা বস্তি, নয়নগর বস্তি, চণ্ডলভোগ বস্তি। এসব বস্তিতে আনুমানিক আড়াই লাখ মানুষের বসবাস। এর মধ্যে শিশু বয়স্করাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

বস্তিগুলোর প্রতিটি গলিতে ভ্রাম্যমাণ ফুসকা, চটপটি, হালিম, আচার, পিঠা, মুড়ির দোকান রয়েছে। এসব দোকানির মুখে মাস্ক নেই, হাতে হ্যান্ডগ্লাভসও নেই। ভিড় জমিয়ে একসঙ্গে ১০-১২ জন একত্রে খাচ্ছে। বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হতদরিদ্র এসব মানুষের করোনা নিয়ে তেমন আতঙ্ক নেই। তাদের আতঙ্ক রোজগার নিয়ে।

এদিকে, প্রতিদিন নতুন করে বহু মানুষ বস্তিতে এসে কম টাকায় ঘড় ভাড়া নিচ্ছে। যারা স্বল্প টাকা চাকরি করে বা দিন এনে দিন খায় তারাই বস্তিকে টার্গেট করে। তাদেরও আশ্রয় মিলছে বস্তিতেই। এসব মানুষের মধ্যে রয়েছে, গৃহকর্মী, গার্মেন্ট শ্রমিক, গাড়িচালক ও দিনমজুর।

তুরাগের বস্তির এসব বাসিন্দার মধ্যে বিশাল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের জন্য কোনো স্বাস্থ্যকর আবাসনের ব্যবস্থা নেই। এখন পর্যন্ত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে বস্তিবাসী তেমন কোনো সাহায্য পায়নি।

নাছিমা আক্তার তুরাগের ১৫নং বালুর মাঠ বস্তিতে ৯ বছর ধরে থাকেন। তিনি উত্তরার আবাসিক এলাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। জন্মের পর থেকেই ভূমিহীন তার পরিবার। তাই আরও অনেকের মতো নোয়াখালী থেকে ঢাকার পথেই পাড়ি জমিয়েছেন নাছিমা আক্তারের পরিবার। দুই ছেলে তিন মেয়ের সংসারে স্বামী রিকশাচালক। হঠাৎ করোনাভাইরাসের কারণে বাড়িওয়ালা একটি ঘড় ভাগ করে তিনটি ঘড় বানিয়ে ভাড়া দিয়েছে। এখন এ চারটি ঘড়ের সদস্যের সংখ্যা প্রায় ১৫ জনের বেশি। করোনাভাইরাস সম্পর্কে নাছিমা আক্তার বলেন, এ ভাইরাস সম্পর্কে টিভিতে দেখেছি। দেখলেইবা কী হবে? তিনি বলেন, গরিব অসহায়দের এসব ভাইরাসে আক্রান্ত করতে পারবে না। তুরাগ রানাভোলা বালুর মাঠ বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, গাদাগাদি করে রাখা হাঁড়ি-পাতিল, ছোট আলমারিসহ সংসারের সব কিছু। হাঁটতে হাঁটতে একটি গণ-রান্নাঘরে চোখে পড়ে। রান্নার বর্ণনা জানতে চাইলে রহিমা বেগম নামে এক বস্তির বাসিন্দা বলেন, একটি মেসে ৩৫ জনের জন্য রান্না করেন তিনি। করোনার সম্পর্কে অবগত নন। কোনো দিন মুখে মাস্ক বা হাতে হ্যান্ডগ্লাভস পরেননি। হঠাৎ করে কিভাবে পড়ব? তাছাড়া, গরিব মানুষ টাকা নাই। এসব জিনিস ক্রয় করারও ক্ষমতা নাই। করোনাভাইরাস সম্পর্কে আমাদের বস্তিবাসীকে কেউ সচেতন করতে আসেনি। আমরা একত্রে টয়লেট, গোসলখানা, পানির কল সব ব্যবহার করি। এখন পর্যন্ত আমাদের বস্তিতে করোনাভাইরাসে কেউ আক্রান্ত হয়নি। তার বিশ্বাস ভবিষ্যতেও কারও এ রোগ হবে না।

ফুলবাড়িয়া বালুর মাঠ বস্তির দশম শ্রেণীর ছাত্র মো. নয়ন আহম্মেদ বলেন, করোনাভাইরাস সম্পর্কে অনেক ভয়ানক খবর শুনছি। তবে, আমাদের বস্তিতে কেউ এ ভাইরাস সম্পর্কে বিশ্বাস করে না। আমিও অনেকের কাছে গিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করছি। কেউ এ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ৫৪ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. জাহাঙ্গীর হোসেন যুবরাজ বলেন, ইতোমধ্যে আমার ওয়ার্ডের সব অসহায় গরিব দরিদ্রের মাঝে লিফলেট, মাস্ক ও স্প্রে বিতরণ করা হয়েছে। আমার ওয়ার্ডে এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ডা. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাস ছোঁয়াচে রোগ। এটি একজনের মধ্যে আক্রান্ত হলে সাথে সাথে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। তাদের হালকা জ্বর দেখা দিলে স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হবে। অবশ্যই মুখে মাস্ক পরতে হবে। বস্তির অধিকাংশ মানুষ এসব বিষয়ে সচেতন নয়। তাদের করোনাভাইরাস সম্পর্কে বেশি বেশি সচেতন করতে হবে। সচেতন না হলে বস্তিতে অতিদ্রুত মহামারী দেখা দিবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন