হাতিরঝিল অপরাধের আখড়া

সক্রিয় বহুমুখী অপরাধী * মধ্যরাতে বেলেল্লাপনা * বাইক ও কার রেসিং * লাখ টাকার চাঁদাবাজি

  ইকবাল হাসান ফরিদ ২২ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হাতিরঝিল অপরাধের আখড়া
হাতিরঝিল

দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিল এখন অনিয়ম আর অপরাধের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এখানে সক্রিয় রয়েছে অন্তত ৮টি ছিনতাইচক্র। এছাড়া মাদক বাণিজ্য, দেহবাণিজ্যসহ নানামুখী অপরাধ এখন ওপেন সিক্রেট।

৫ থানার মিলনস্থল এ হাতিরঝিলে দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠছে অপরাধচক্র। ফলে এখানে ঘুরতে আসা মানুষজন নিজেদের অনিরাপদ বোধ করছেন। হাতিরঝিলে গভীর রাত পর্যন্ত বেপরোয়া মোটরসাইকেল রেসিংয়ে মগ্ন থাকে কিশোর ও তরুণ গ্যাং।

চলে কার রেসিংও। উল্টাপথে চলে মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন যানবাহন। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে মানুষ। এখানে গাড়িতে বসে নারীদের উত্ত্যক্ত করে বখাটেরা। সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে এমন সব তথ্য।

সরেজমিন হাতিরঝিল ঘুরে দেখা গেছে, সন্ধ্যার পর থেকে হাতিরঝিলের সঙ্গে সংযুক্ত অন্তত ৩৮টি চোরাগোপ্তা গলি আর বাসাবাড়ির চোরাগেট ঘিরে বেড়ে যায় মাদক ব্যবসায়ী ও নেশাখোরদের আনাগোনা। তৎপরতা বাড়ে ছিনতাইচক্রের।

ঝিলের সংযোগ সেতুর আশপাশেই মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারীদের তৎপরতা বেশি। রাতে আলো স্বল্পতার সুযোগে সেখানে জুটিবদ্ধ হয়ে আপত্তিকর কর্মকাণ্ড করছেন কেউ কেউ। রাত যত গভীর হয় নিশিকন্যাদের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে।

কোথাও দলবেঁধে চলছে নেশার আসর। তেজগাঁওয়ের কুনিপাড়া ও বেগুনবাড়ী অংশে বেশ কয়েকটি বস্তিঘরের সঙ্গেই লাগোয়া রয়েছে ঝিলের রাস্তা-ফুটপাত। বাসিন্দারা সীমানা দেয়ালের মধ্যদিয়েই নিজেদের বাড়িঘরের গেট বানিয়ে নিয়েছেন।

হাতিরঝিলের মগবাজার মধুবাগ পয়েন্টেও এ ধরনের বেশ কয়েকটি বাসাবাড়ি রয়েছে। ঘোরাফেরার সুবাদে খদ্দের জুটিয়ে দেহব্যবসায়ীরা নিজেদের বাসাবাড়িতে নিয়ে যান। দেহব্যবসাকে ঘিরে হাতিরঝিলজুড়ে বেশ কজন দালাল তৎপর রয়েছে।

দালালরা বিভিন্ন বেঞ্চে ভবঘুরের মতো অবস্থান করলেও খদ্দের ধরার কাজই করে তারা।

রোববার মিরপুর থেকে হাতিরঝিলে ঘুরতে এসেছিলেন গার্মেন্টসকর্মী সেলিম ও তার এক মেয়ে বান্ধবী। মধুবাগ এলাকার সংযোগ ব্রিজে পরিচয় হয় এক নারীর সঙ্গে। তিনি তাদের ডেটিংয়ের নিরাপদ জায়গা করে দেয়ার কথা বলে মধুবাগ এলাকার বাসায় নিয়ে যান। চুক্তি ছিল ২০০ টাকায়।

সেখানে এক ঘণ্টা সময় কাটানোর পর তিনি বলেন, আপনাদের এখন চলে যেতে হবে। এরপর সেলিম ২০০ টাকা দিলে ওই নারী তার কাছে আরও ১ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার হুমকি দেন তিনি। পরে আরও ৫শ’ টাকা দিয়ে মুক্তি পান তিনি।

শনিবার সন্ধ্যায় হাতিরঝিলে ঘুরতে এসেছিলেন মোহাম্মদপুরের আলামিন, রবিউল ও রাহুল নামে তিন বন্ধু। রাত সাড়ে ৯টায় হাতিরঝিলে তেজগাঁও অংশে লেকের পাড়ে তাদের ঠেক দিয়ে তিনটি মোবাইল সেট নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

এক প্রশ্নের জবাবে ভুক্তভোগী আলামিন বলেন, থানায় অভিযোগ করে লাভ কি? আরও বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হবে। হাতিরঝিল ঘিরে সাত-আটটি ছিনতাই চক্র সক্রিয় রয়েছে। চক্রের অধিকাংশই কিশোর ও যুবক।

তেজগাঁও, কুনিপাড়া, মধুবাগ ও আশপাশের বস্তি এলাকার উঠতি বখাটেরা ছিনতাইয়ে জড়িত। গত বছর ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে এক সবজি ব্যবসায়ী ও এক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছিলেন হাতিরঝিলে।

নিহত হয়েছিলেন সিরাজুল ইসলাম নামের এক তরুণ। এদিকে সন্ধ্যার পর হাতিরঝিলের ব্রিজগুলোর ওপর বসে গাঁজা, ইয়াবা ও হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক সেবন করা হয় এবং চলে বেচাকেনাও। রাত একটু বাড়লে ছিনতাইকারী ও বখাটেদের পাশাপাশি বেপরোয়া বাইক ও গাড়ি চালায় কিছু কিশোর-তরুণ। হাতিরঝিলের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রাম্যমাণ ও স্থায়ী মিলে ২৯টি দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে স্থায়ী দোকান ১১টি।

হাতিরঝিলের মূল নকশায় প্রকল্প এলাকায় দোকান বরাদ্দের উল্লেখ ছিল না। হাতিরঝিলে ব্রিজ ও ওভার ব্রিজগুলোতে মধ্যরাত পর্যন্ত উচ্ছৃঙ্খল তরুণ-তরুণীদের বেলেল্লাপনা চলে।

ইয়াবার নেশায় বুঁদ হয়ে এদের অনেকেই অশালীন নৃত্যে নেচে ওঠে। ফাঁকে ফাঁকে চলে বাইক রেসিংয়ের প্রতিযোগিতা। ধনীর নেশাখোর ছেলেমেয়েরা এসে আড্ডা জমায় হাতিরঝিলে। এছাড়া ব্রিজগুলোর রেলিং ঘেঁষে বসে চলে মাদকসেবনসহ অসামাজিক কার্যকলাপ।

ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটে ব্রিজগুলোতে। মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও একমুখী সড়কে (ওয়ানওয়ে রোড) উল্টোপথে চলাচল করছে হাতিরঝিলে। এ কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা। কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা নেই।

২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি উদ্বোধনের পর হাতিরঝিলে সড়ক দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েকশ’। আত্মহত্যা করেছেন অন্তত ১০ জন। কয়েকটি গাড়ি সড়ক থেকে ছিটকে পড়েছে লেকের পানিতে।

কথিত বন্দুকযুদ্ধের কয়েকটি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৬ জন। তাছাড়া প্রতিদিনই কোনো না কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে হাতিরঝিলে। গত দেড় বছরে হাতিরঝিলে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অনন্ত ২০ জন।

এদের মধ্যে বেশিরভাগই পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী। সর্বশেষ ১ মে হাতিরঝিলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন মোটরসাইকেলের আরোহী দুই বন্ধু হেদায়েত উল্লাহ (২৬) ও হাবিবুল্লাহ (২৫)। ওইদিন ভোরের দিকে হাতিরঝিলের ৪নং ব্রিজের কাছে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া হাতিরঝিল থেকে একই সময়ে অন্তত ১০টি ভাসমান লাশ উদ্ধার করেছে তেজগাঁও, রমনা, রামপুরা ও বাড্ডা থানা পুলিশ।

হাতিরঝিল প্রকল্প পরিচালক জামাল আখতার ভূঁইয়া বলেন, হাতিরঝিলের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিরাপত্তাকর্মীরা কাজ করছেন। তিনি বলেন, ছিনতাই, দুর্ঘটনাসহ নানা ঘটনার অভিযোগ আসার পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের আপত্তিকর আড্ডার বিষয়টি নিয়ে অনেকেই অভিযোগ করছেন।

আমরাও বিষয়টি খতিয়ে দেখেছি। রেলিং ঘেঁষে বসে কেউ যেন অযথা আড্ডা দিতে না পারে, এ জন্যই কাঁটাতার বসানো হচ্ছে। আরও বিভিন্ন পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মো. মাসুদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, প্রথম কথা হল হাতিরঝিলে নতুন থানা হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা এখনও পুরোমাত্রায় কাজ শুরু করতে পারিনি।

এছাড়া আমরা অপরাধ দমনের লক্ষ্যে অনেক বড় এলাকাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এলাকায় বিভক্ত করে অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করে থাকি। ঠিক তেমনিভাবে হাতিরঝিলেও আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর নজরদারি রয়েছে। আপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter