সরকারি দুই সংস্থার হাউজিং প্রকল্প

বাউনিয়া খালের মৃত্যুঘণ্টা

মানা হচ্ছে না আদালতের নির্দেশনা * এ খাল অস্তিত্ব হারালে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে মিরপুরে

  মতিন আব্দুল্লাহ ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মৃত্যুঘণ্টা

রাজধানীর প্রবাহমান বাউনিয়া খাল দখল করে হাউজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকারি দুটি সংস্থা।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ঢাকা ওয়াসা দখলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও দখল ঠেকানো যাচ্ছে না। উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও আমলে নিচ্ছে না সংস্থা দুটি। বিষয়টি রাজধানীবাসীর মধ্যে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।

সংস্থা দুটি হল- জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও ভূমি মন্ত্রণালয়। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ জয়নগর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এবং ভূমি মন্ত্রণালয়-ভাষানটেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

মিরপুরের ১৪ নম্বর পেট্রল পাম্প থেকে গোরান চটবাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত বাউনিয়া খাল। মিরপুর এলাকার বড় অংশের পানি নিষ্কাশন হয় এ খালের মাধ্যমে। এলাকাবাসী মনে করছেন, খালটি রক্ষা না হলে, মিরপুর এলাকা জলাবদ্ধতাজনিত কারণে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

দুই সংস্থার দখলে খালটি সংকুচি এবং পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভারী বৃষ্টি হলেও এখনও অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা বাধাগ্রস্ত হবে।

সরকারি দুটি সংস্থার বিরুদ্ধে খাল দখলের অভিযোগ শুধু এলাকাবাসীর নয়, এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসাও। এ দুটি সংস্থা বলছে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ খালটি দখল করেছে। খাল উদ্ধারের জন্য পাঁচ বছর ধরে তারা চিঠি চালাচালি করলেও দখল বন্ধ হয়নি। বরং খালে দখলদারিত্ব বেড়েছে।

বাউনিয়া খাল সংলগ্ন পুলিশ কনভেনশন হলের পেছনে ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। ওই পয়েন্টে খালের প্রশস্ততা থাকার কথা ৬০ ফুট। কিন্তু, পুরো খালজুড়েই পুনর্বাসন প্রকল্পের বহুতল ভবনের কলাম গড়ে তোলা হয়েছে। কিছু দূর সামনে বক্স কালভার্টের সামনে জয়নগর ফ্ল্যাট স্কিমও নেয়া হয়েছে খালের জায়গায়।

এ প্রকল্পে ভবন নির্মাণে প্রায় ৪০ ফুট খাল ভরাট করেছে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এতে করে একটি নালায় পরিণত হয়েছে খালটি। এ নিয়ে ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও ভূমি মন্ত্রণালয়কে বারবার অবহিত করলেও কোনো সমাধান মিলছে না।

২০১৬ সালের ১৬ জুন বাউনিয়া খালের দখলের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট মামলা করেন অ্যাডভোকেট পলাশ বৈদ্য। ওই রিট মামলায় বলা হয়, রাজধানীর পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় বাউনিয়া খাল রক্ষা করা জরুরি।

রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ঢাকার ডিসি অফিস, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, গণপূর্ত অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট ১০ জন কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেন।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ উচ্চ আদালতের নির্দেশা পুরোপুরি অনুসরণ না করে নিজেদের মতো করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করিয়ে উচ্চ আদালতে জমা দেয়। এ কারণে আদালত পুনরায় পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

রিটকারী আইনজীবীর মতে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রতিবেদনে সত্য বেরিয়ে আসবে। কেননা, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের এক তরফা প্রতিবেদনে খালের দখলের বিষয় অস্বীকার করা হয়েছে। একইসঙ্গে সেখানে কোনো হাউজিং প্রকল্প গড়ে তুলছে না বলেও দাবি করা হয়েছে।

যদিও বাস্তবতা ভিন্ন। দখল প্রতিরোধে উচ্চ আদালতে রিটকারী আইনজীবী পলাশ বৈদ্য যুগান্তরকে বলেন, বাউনিয়া খাল দখল বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ১০ জন প্রতিনিধির সমন্বয়ে উচ্চ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। কিন্তু জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ নিজেদের মতো করে ঢাকা ডিসি অফিসের সার্ভেয়ারের স্বাক্ষর নিয়ে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। উচ্চ আদালত সে প্রতিবেদন গ্রহণ না করে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী কামরুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, মিরপুর বাউনিয়া খালের প্রবাহ বন্ধ করে দুটি সরকারি সংস্থা যে হাউজিং প্রকল্প গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, সেটা রুখে দেয়া হবে। বাউনিয়া খাল প্রবাহমানই থাকবে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে খাল উদ্ধারের লক্ষ্যে দুটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দিয়েছে। পরবর্তীতে আরও প্রকল্প পাস হবে। খাল প্রবাহমান রাখতে প্রয়োজনে জমি বা স্থাপনাসহ জমিও অধিগ্রহণ করা হবে। এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।

এ প্রসঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) তৌফিকুল আলম যুগান্তরকে বলেন, এখানে আমি নতুন। এ প্রকল্প সম্পর্কে আমার পরিষ্কার ধারণা নেই। তাছাড়া এখন ওই প্রকল্পের কোনো প্রকল্প পরিচালকও নেই। প্রকল্পের নতুন করে কোনো অগ্রগতিও নেই। এ কারণে খাল দখল সংক্রান্ত বিষয়ে পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারছি না। জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্যানেল মেয়র জামাল মোস্তফা যুগান্তরকে বলেন, বাউনিয়া খাল দখল করে ভূমি মন্ত্রণালয় ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ হাউজিং প্রকল্প গড়ে তুলছে। পরিবেশ-প্রতিবেশ বিধ্বংসী এ কার্যক্রম বন্ধে এলাকাবাসীকে নিয়ে বারবার প্রতিবাদ জানালেও তারা কর্ণপাত করছে না।

তিনি বলেন, বাউনিয়া খালের দখল বন্ধ করতে ঢাকা ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অবহিত করা হয়েছে। এরপরও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা থেমে নেই। অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান খন্দকার মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘মিরপুর জয়নগরে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব জায়গায় প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। তারপও যদি সেখানে খালের কোনো অংশ পড়ে থাকে, সেটা ছেড়ে দেয়া হবে।’

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বাউনিয়া খাল ভরাট বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে ২৮ অক্টোবর ২০১৫ সালের এক চিঠিতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করেন।

সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, বাউনিয়া খালের আপস্ট্রিম অংশ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০০০ সালে ঢাকা ওয়াসাকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। কেন্দ্রীয় ভূমি বরাদ্দ কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেমতে, খালের আপস্ট্রিমের জায়গা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ২০০৭ সালে মিরপুর ১৪ নম্বর বাসস্ট্যান্ড থেকে জয়নগর পর্যন্ত ১০৬৭ মিটার (৬০ ফুট প্রসস্থ) খাল ঢাকা ওয়াসাকে বুঝিয়ে দিয়েছে। এরপর থেকে ঢাকা ওয়াসা ওই খাল সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করছে। মিরপুর সেকশন-১৫ এর জয়নগর অংশে প্রায় ১১৫ মিটার দৈর্ঘ্য খালটির জায়গা নির্ধারণ করা নেই।

ওই জায়গা একটি নালা দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এর ফলে আপস্ট্রিম এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে। ওই অংশের খালের জায়গা চিহ্নিত করে দিলে খালটি প্রবাহমান রাখা সম্ভব হবে।

অন্যথায় চলমান প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে মিরপুর, কাফরুল, ক্যান্টনমেন্ট ও পুরাতন এয়ারপোর্ট এলাকায় অদূর ভবিষ্যতে ভয়াবহ জলজটের সৃষ্টি হবে। এ অবস্থায় খালের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, এমন কোনো বক্সকালভার্ট বা খালের ওপর অবকাঠামো নির্মাণ করা বাঞ্চনীয় হবে না।

ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘বাউনিয়া খালের জয়নগর অংশে প্রবাহ বন্ধ করে পাইলিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। এতে খালের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারি উভয় সংস্থার সুনাম রক্ষার স্বার্থে যৌথ জরিপের মাধ্যমে খালের সীমানা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।’ কিন্তু ঢাকা ওয়াসার এ আহ্বানের কোনো সাড়া দেয়নি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।

এছাড়া বাউনিয়া খালের প্রবাহ ঠিক রাখার দাবি জানিয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, ভূমি মন্ত্রণালয় ও ঢাকা ওয়াসাকে পত্রযোগে অবহিত করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে সংশ্লিষ্ট এলাকার কাউন্সিলর ও বর্তমান প্যানেল মেয়র জামাল মোস্তফা, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অঞ্চল-২ এর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুবুল ইসলাম।

আর ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ আলম খাল প্রবাহ বজায় রাখার দাবি জানিয়ে পত্র লেখেন ভাষানটেক পুনবার্সন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter