‘ওয়েবিল’ অজুহাতে বাসে বেশি ভাড়া আদায়

গাড়িতে উঠলেই ২৫-৩০ টাকা ভাড়া * মাঝখানে তোলা যাত্রীদের টাকা চালক-হেলপারের পকেটে

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মিরাজ মাহবুব ইফতি

নগরীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসে সিটিং সার্ভিস ও ওয়েবিলের নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ভাড়ার নামে যাত্রীদের পকেট কাটা হচ্ছে। গাড়িতে উঠে ওয়েবিল স্বাক্ষর হলে ২৫-৩০ টাকা ভাড়া নেয়া হচ্ছে।

আবার রাস্তার মধ্যখানে যাত্রী তুলে যে ভাড়া নেয়া নেয়া হচ্ছে তা চালক ও হেলপারদের পকেটে চলে যাচ্ছে। অথচ এ ওয়েবিল চালু করা হয়েছিল ওই কোম্পানির বাস নিময়-কানুন মেনে চলে কিনা তা দেখার জন্য।

যাত্রীদের অভিযোগ, যেখানে চেকাররা ওয়েবিল লেখেন সে জায়গা ছাড়া বাস দাঁড়ানোর কথা নয়। কিন্তু যেখানে সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী তুলে চালক-হেলপররা পকেট ভারি করছে।

দুপুর ৩টা। মিরপুর কালশীর মোড় থেকে আরাফাত রহমান নামের এক যাত্রীর গন্তব্য বিশ্বরোডের মোড়। যাত্রী আরাফাত ২০ টাকা ভাড়া দেয়াতে হেলপার ৩০ টাকা ছাড়া যাত্রীকে নামতে দিচ্ছে না।

হেলপার বলেন, ২০ টাকা দিলে শেওড়া নেমে যেতে হবে। এখানে চেকার লিখে দিলে, আপনাকে ৩০ টাকা ভাড়া দিতে হবে। যাত্রী আর হেলপারের মধ্যে চলে বাকবিতণ্ডা।

এ ঘটনার পরে হেলপার মো. সোহেল বলেন, শেওড়াতে ওয়েবিল স্বাক্ষর হওয়ার পরে যেখানেই নামুক ভাড়া ৩০ টাকা দিতে হবে। কোনো যাত্রী কম ভাড়া দিলে, আমার পকেট থেকে দিতে হবে।

যাত্রী আরাফাত রহমানের দাবি, সব বাস লোকাল হিসেবে চলে। অথচ ওয়েবিলের অজুহাত দেখিয়ে বেশি ভাড়া নিচ্ছে। আমি যতটুকু যাব কিলোমিটার হিসাব করে সরকার নির্ধারিত ভাড়া দিয়ে যাব। দূরত্ব কম হলে কম ভাড়া দিয়ে যাব। অতিরিক্ত ভাড়া কেন দেব?

তার মতে, সরকার নির্ধারিত প্রতি কিলোমিটার ১.৭০ পয়সা হিসাবে নেয়ার কথা থাকলেও এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। আরও দেখা যায়, মোহাম্মদপুর থেকে মিরপুর হয়ে আবদুল্লাপুর যাচ্ছে ২ কোম্পানির বাস। প্রজাপতি ও পরিস্থান। এছাড়া গাবতলী থেকে আবদুল্লাপুর যাচ্ছে দুটি কোম্পানির বাস।

                                                পল্লবী সুপার ও বসুমতি (যায় গাজীপুর পর্যন্ত)। মোহাম্মদপুর থেকে আরও দুটি কোম্পানির বাস চলে তেঁতুলিয়া ও ইন্টারসিটি। তেঁতুলিয়া যাচ্ছে কামারপাড়া পর্যন্ত। আর ইন্টারসিটি যাচ্ছে হেমায়েতপুর পর্যন্ত। এ ৬টি কোম্পানির বাস ছাড়াও অন্য কোম্পানির অনেক বাস চলে এ রুটে। রুট ও যাত্রীর তুলনায় বাস বেশি। এ কারণে চালকদের মাঝে সৃষ্টি হয় প্রতিযোগিতা। আর তখনই ঘটছে ভয়ংকর সব দুর্ঘটনা।

বাসের সুপারভাইজার ও চেকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাত্রা থেকে গন্তব্যে পৌঁছানের আগে বাসগুলোর কয়েক স্থানে ওয়েবিল লেখা হয়। কোনো স্টপেজ থেকে কতজন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে গেল তা গুনে লিখে দেন দায়িত্বরত চেকার। এক স্থনের ওয়েবিল স্বাক্ষর হওয়ার পর আরেক স্থানের ওয়েবিল পর্যন্ত যেখানেই যাত্রী নামুক তাকে পুরো ভাড়া দিতে হচ্ছে। এ কারণে অনেক সময় যাত্রী ১-২ কিলোমিটার গিয়েই ভাড়া দিতে হচ্ছে ২৫-৩০ টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উত্তরার এক সার্জেন্ট যুগান্তরকে বলেন, ওয়েবিল বাস মালিকদের এক ধরনের ব্যবসা। বাস মালিক কোম্পানির কাছ থেকে টাকা দিয়ে ওয়েবিলের কাগজ নিতে হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এমন কোনো সার্জেন্ট নেই বিট ভিত্তিকভাবে বাস কোম্পানির থেকে টাকা নেয় না।

তেঁতুলিয়ার বাসের মালিক ইবাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, যে কোনো ধরেন একটি বাস সকাল ৯টায় মোহাম্মদপুর জাপান গার্ডেন সিটি থেকে ছেড়ে গেল। তখন ওয়েবিলে একটি সিরিয়াল নাম্বার দিয়ে দেয়া হয়।

আগারগাঁও রেডিও সেন্টারে পরে কালশীর মোড় ওয়েবিল স্বাক্ষর হয়। আসার সময় কামারপাড়া থেকে ছেড়ে আসে। বিশ্বরোডের মোড় ও আগারগাঁও রেডিও সেন্টারের এখানে স্বাক্ষর হয়। স্বাক্ষর হওয়ার মাঝপথে যাত্রী ওঠানামা করলে এ ভাড়া মালিক পায় না। চালক আর হেলপার নিয়ে নেয়।

তিনি আরও বলেন, বাস কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে মালিকরা টাকা দিয়ে ওয়েবিলের কাগজ নেয়। কোম্পানির লোকের মাধ্যমে রাস্তায় বাসের তদারকি করা হয়। দিন শেষে ওয়েবিলের হিসাব করে মালিক বাস ভাড়া বুঝে পায়।

এতে টাকা কম চুরি হয়। চালক বা হেলপার যদি রাস্তায় কোনো অন্যয় করে, ওয়েবিলের গায়ে লিখে দেয়া হয়। বাসটিকে জরিমানা করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, চেকারদের টাকা দিলে তারা আর জরিমানা করে না।

প্রজাপতি বাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কেএম রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, পথের আয় লেখার জন্য ওয়েবিল। মোট যাত্রীদের একটা হিসাব নেয়া। কিন্তু আমাদের একটা খরচ আছে।

একটা টিম রাস্তায় থাকে। এ টিমকে বেতন দিতে হয়। তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে রাস্তায় বাস স্টপেজ সাইনবোর্ড লাগানো হবে। তখন আর জায়গায়, জায়গায় দাঁড়িয়ে বাসে যাত্রী তোলা হবে না। বাসের গেট সব সময় লাগানো থাকবে।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অফিস খরচ, কর্মকর্তা, ম্যানেজার সুপারভাইজারদের বেতন দিতে হয়। ওয়েবিল বাবদ টাকা না নিলে কীভাবে তাদের বেতন দেব। চালক ও হেলপারের চুরি কমানোর জন্য এ ওয়েবিলের ব্যবস্থা। ওয়েবিল লেখার পরে লোক ওঠানো হয়। এটা সত্য। এগুলো মেনে নিয়েই মালিক রাস্তায় বাস নামাচ্ছেন। আশা করি রাস্তার অনিময় ঠিক হয়ে যাবে।