ডেমরায় দুই শিশু হত্যা

নির্যাতনের পর শ্বাসরোধ করে প্রতিবেশী

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডেমরায় দুই শিশু হত্যা

সকালে স্কুলে ভর্তি করা হয় সাড়ে চার বয়সী শিশু নুসরাত জাহান ফারিহাকে। তাকে ক্লাসে রেখে বাসায় ফেরেন মা ফাহিমা বেগম।

কিছুক্ষণ পর নতুন বই নিয়ে বাসায় ফিরেই ফারিহা মাকে বলেছিল, ‘এই দেখো মা নতুন বই। কী সুন্দর ঘ্রাণ। বাবা কোথায়, কখন আসবে। বাবাকে বই দেখাব। বাবাকে ফোন করে বলো, স্কুল ব্যাগ নিয়ে আসতে।’

অন্যদিকে ফারিহার সহপাঠী পাঁচ বছর বয়সী ফারিহা আক্তার দোলা নতুন বই নিয়ে মা পারভীন আক্তার ও বাবা ফরিদুল ইসলামের বাসায় ফেরার অপেক্ষা করছিল। মাকে ফোন করে বলেছিল, ‘বাবাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় আসো। অনেক নতুন বই পেয়েছি।’ এরপর নতুন বই পাওয়ার আনন্দে বাসার সামনে খেলছিল দু’জন। সেখান থেকে কৌশলে তাদের বাসায় ডেকে নিয়ে নির্যাতনের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে প্রতিবেশী গোলাম মোস্তফা। নতুন বই নিয়ে তাদের আর স্কুলে যাওয়া হল না।

সোমবার রাতে ডেমরার কোনাপাড়া এলাকার শাহজালাল রোডের আবুল হোসেনের বাড়ির ভাড়াটিয়া গোলাম মোস্তফার ঘরের খাটের নিচ থেকে শিশু দুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই দিন দুপুর আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে তাদের সে হত্যা করে। গোলাম মোস্তফা বর্তমানে পলাতক।

ফারিহার বাবা পলাশ মিয়া যাত্রাবাড়ীতে কাঁচাবাজারের আড়তে কাজ করেন। ডেমরার শাহজালাল রোডে আবদুর রশীদের টিনশেড বাড়ির ছোট্ট একটি কক্ষে তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করছিলেন। মঙ্গলবার দুপুরে ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, নুসরাতের মা ফাহিমা বেগম নতুন বই নিয়ে বিলাপ করছিলেন। প্রতিবেশীদের বলছিলেন, ‘সকালে এ কে মডেল একাডেমিতে ফারিহাকে নার্সারিতে ভর্তি করি। নতুন বই নিয়ে এসেই মেয়ে বলেছিল, আব্বুকে ফোন করে বলো স্কুল ব্যাগ নিয়ে আসতে। নতুন পোশাক কিনে দেয়ার বায়নাও ধরেছিল। ওকে বলেছিলাম, বাবা ফেরার সময় স্কুল ব্যাগ নিয়ে আসবে। ওর খুশি তখন দেখে কে? একটু পর খেলতে গিয়েছিল সে। তারপর আর মা আমার ফিরে আসেনি। আমি খুনি মোস্তফার ফাঁসি চাই।’

ফারিহাদের বাসা থেকে ৫০ গজ দূরেই দোলাদের বাসা। হাবীব মঞ্জিল নামে একটি বাড়ির নিচতলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত সে। দোলার বাবা ফরিদুল ইসলাম একটি ওয়ার্কশপে কাজ করেন। মা পারভীন বেগম গার্মেন্টস কর্মী। দুপুরে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দোলার মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাকে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছিলেন না। বারবার তিনি বলছিলেন, ‘আমার মেয়ের নতুন স্কুল ড্রেসের অর্ডার দিয়েছিলাম। ১০ তারিখে (১০ জানুয়ারি) বেতন পাওয়ার পর ড্রেস আনার কথা ছিল।

এই ড্রেস দিয়ে এখন আমি কী করব?’ ঘরের খাটের ওপর একটি পুরাতন স্কুল ব্যাগ দেখিয়ে বলছিলেন, ৬ মাস আগে এই ব্যাগটি কিনে দিয়েছিলাম। নতুন বছরে একটি নতুন ব্যাগের বায়না ধরেছিল। আমি বলেছিলাম, বেতন পেয়ে কিনে দেব।’ খাটের এক পাশে দোলার নতুন বইগুলো ছড়িয়ে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। বারবার বইগুলো বুকে নিয়ে বিলাপ করতে করতে পারভীন বলছিলেন, ‘সকালে আমি বাসায় ছিলাম না। আমারে ফোন করে বলেছিল, নতুন বই পেয়েছে সে।

তাড়াতাড়ি বাসায় আসতে বলেছিল। দুপুরের পর বাসায় ফিরে ওকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। রাতে ওর লাশ পেলাম।’

তিনি আরও বলছিলেন, ‘বড় আশা ছিল মেয়েকে ডাক্তার বানাব। ওর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একটি ডিপিএস করেছিলাম। আমার সব শেষ হয়ে গেল।’ শিশু ফারিহার গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠি সদরে। সে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। দোলার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীতে। সেও বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।

ঘটনার পর খুনি মোস্তফা ছিল নির্বিকার : শিশু দোলার চাচা সাইদুল ইসলাম জানান, দুপুর ২টার দিকে দোলার বাসার সামনে ফারিহাসহ দু’জন খেলছিল। সোয়া ২টার দিকে আর ওদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও ওদের পাওয়া যাচ্ছিল না। এলাকার বিভিন্ন মসজিদে মাইকিংও করা হয়। বিকেলে শাহজালাল রোডের বিভিন্ন বাসায় তল্লাশিও করা হয়। আবুল হোসেনের বাড়ির নিচতলায় তল্লাশি করতে গিয়ে দেখা যায়, খুনি গোলাম মোস্তফা বড় বড় চোখ করে দরজার সামনে বসে আছে। তল্লাশি করতে চাইলে সে বলে, ‘দেখতেইতো পাচ্ছিস, এখানে নেই।’ তখন আমরা সেখান থেকে চলে আসি।

তিনি আরও বলেন, ওই সময় মোস্তফা বাসায় একাই ছিল। ওর স্ত্রী আঁখি খানম একটি গার্মেন্টেসে চাকরি করে। বিকেল ৫টায় তিনি বাসায় ফিরে দেখেন, খাটে তোশক নেই। তারপর খাটের নিচে দেখেন, তোশক দিয়ে মোড়ানো দুটি শিশুর লাশ। তিনি তখন বিষয়টি তার ভাইকে জানান। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ওই বাসায় চিৎকার-চেঁচামেচি হচ্ছিল। তখন সন্দেহ হলে আমরা বাসায় তল্লাশি করি। ওই সময় মোস্তফা পালিয়ে যায়। তল্লাশির সময় শিশু দুটির লাশ খাটের নিচে পড়ে থাকতে দেখি। পরে পুলিশ এসে লাশ দুটি উদ্ধার করে।

ওই বাড়ির মালিকের স্ত্রী নাছিমা বেগম যুগান্তরকে বলেন, চার মাস আগে আড়াই হাজার টাকায় বাড়ির নিচতলায় মোস্তফাকে একটি কক্ষ ভাড়া দিই। সে কিছুই করত না। সারা দিন বাসায় একা একা থাকত। কোনো কাজ করত না।

পুলিশ বলছে, শিশু দুটিকে কৌশলে বাসায় নিয়ে যায় গোলাম মোস্তফা। তখন বাসায় কেউ ছিল না। পরে নির্যাতনের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সে। শিশু দুটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। লাশের ময়নাতদন্ত হয় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে লাশ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পুলিশের ডেমরা জোনের এডিসি ইফতেখায়রুল ইসলাম মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে যুগান্তরকে বলেন, শিশু দুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এখন পর্যন্ত খুনিকে ধরতে পারেনি পুলিশ। তাকে ধরা গেলে হত্যার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। খুনিকে ধরার চেষ্টা চলছে। আশা করছি শিগগিরই সে ধরা পড়বে।

খুনির ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন : দুই শিশুর হত্যাকারী গোলাম মোস্তফার ফাঁসির দাবিতে মঙ্গলবার ১১টায় কোনাপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় এলাকাবাসী গোলাম মোস্তফার ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেন। মানবন্ধনে শিশু দোলার মা পারভীন ও নুসরাতের মা ফাহিমা বেগম অংশ নেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×