অতিথি পাখির কলতানে মুখর পাবনা শহর

  আখতারুজ্জামান আখতার, পাবনা ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অতিথি পাখি

পাবনা শহরে বিনোদন স্পট নেই বললেই চলে। শহরের বুক চিড়ে প্রবাহিত একসময়ের স্রোতঃস্বিনী ইছামতি নদীও এখন ‘মরা খাল’। আশপাশের বেশির ভাগ পুকুর ও জলাশয় ভরাট করে গড়ে তেলা হয়েছে পাকা দালান।

শহরতলীর দু-একটি নিচু এলাকায় সামান্য পানির আধার বা জলাশয় রয়েছে। তবে সেখানে কখনও দেখা মিলবে শীতের পাখি- এ কথা ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি পাবনাবাসী।

কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে শহরতলীর আরিফপুর এবং চতকছাতিয়ানীর দুটি জলাশয়ে কাকডাকা ভোরে হঠাৎ করেই শ’ শ’ পাখির কিচিরমিচির! কুয়াশা মোড়ানো শীতের সকাল ভেঙে পূর্বাকাশ আলো করে উঠছে রক্তিম সূর্য।

ইট-পাথরের শহরে তখনও শুরু হয়নি যান্ত্রিক কোলাহল। আর এ সময়েই হঠাৎ পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল জলাশয়ের চারপাশ। ওড়াউড়ি, ছোটাছুটি, খুনসুটি আর মনের সুখে সাঁতার কাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল শ’ শ’ পাখি। এটি প্রায় ১৫ দিনের আগের কথা। কিন্তু এখনও তারা নিয়মিতই আসছে। রাতের কোনো একসময় তাদের আগমন ঘটছে। সকাল ১০টার পর এরা আবার একে একে উড়ে যায়। পাবনা শহরে এরা নতুন অতিথি।

পাখিবিশারদরা বলছেন, এই পাখির নাম পাতি সরালি। পৌর শহরের আরিফপুর গোরস্থান সংলগ্ন ঝিল এবং চকছাতিয়ানী এলাকার বিসিক সংলগ্ন অপর ঝিলটি এখন অতিথি পাখির কলতানে মুখর। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, শীতকালে বাংলাদেশে যেসব পাখি দেখা যায়, তার মধ্যে এই পাতি সরালির সংখ্যাই বেশি। এটি ছোট সরালি বা গেছো হাঁস নামেও পরিচিত। এটি মূলত দেশি বা আবাসিক পাখি। তবে শীতকালে লোকালয়ে দলবদ্ধভাবে এদের দেখা মেলে বলে অনেকেই একে পরিযায়ী পাখি ভেবে ভুল করেন। দেশি পাখি হলেও শীতকালে ভারত, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে উড়ে এসে এদেশে আবাস গড়ে তোলে এই পাখি।

পাখি পর্যবেক্ষক এসআই সোহেল বলছেন, পাতি সরালি নিশাচর স্বভাবের আবাসিক পাখি। দিনে জলমগ্ন ধানক্ষেত ও বড জলাশয়ের আশপাশে দলবদ্ধভাবে জলকেলি আর খুনসুটিতে ব্যস্ত থাকলেও রাতে খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। এদের প্রধান খাবার পানিতে থাকা গুল্ম জলজ উদ্ভিদ, নতুন কুঁড়ি, শস্যদানা, ছোট মাছ, ব্যাঙ, শামুক, কেঁচো ইত্যাদি। পাখিটির মাথা, গলা ও বুক বাদামি, কালো পা এবং ঠোঁট ধূসর-কালচে রঙের। পিঠে হালকা বাদামির ওপর নকশা আঁকা ও লেজের তলা সাদা। পুরুষ ও স্ত্রী পাখি দেখতে একই রকম।

প্রজনন মৌসুমসহ অন্য সময় এরা জুটি বেঁধে পৃথকভাবে দুর্গম বিল-হাওরে বসবাস করে। তাই শীত ব্যতীত এদের একত্রে বেশি সংখ্যায় দেখা যায় না। পাতি সরালির ওজন প্রায় ৫০০ গ্রাম, দৈর্ঘ্য ৪৫ সেন্টিমিটার। সাধারণত এদের ডানা ১৮.৭ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ৪ সেন্টিমিটার এবং লেজ ৫.৪ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। রোববার ভোরে সরেজমিন দেখা যায়, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বড় বড় দালান।

মাঝে ছোট্ট একটা জলাশয়। কচুরিপানা পূর্ণ এই জলাশয়েই নির্ভয়ে ঘুরছে পাখি। একটু পর পর ওরা উড়ে গিয়ে জায়গা বদল করছে। সামান্য শব্দ হলেই উড়ে যাচ্ছে দল বেঁধে। ওদের কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত পুরো এলাকা। বাড়ির ছাদ বা বারান্দা থেকেই এলাকাবাসী উপভোগ করছেন সেই দৃশ্য।

পাখি দেখতে আসা হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় অতিথি পাখির সমাগম ঘটলেও পাবনায় এবারই প্রথম এদের বিচরণ দেখলাম। চকছাতিয়ানীর স্বপন জানান, নগরের যান্ত্রিক শব্দের বদলে এখন সকালে ঘুমভাঙে ওদের কোলাহলে। ওরা যেন নিরাপদে এখানে থাকতে পারে, সেজন্য চেষ্টা করছি। পাখি শিকারি বা বাইরের কারও দ্বারা ওদের যেন ক্ষতি না হয়, সেটি নিয়ে এলাকায় সচেতনতা তৈরি হয়েছে।

পাবনা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক ও আলোকচিত্রী এহসান আলী বিশ্বাস জানান, এই পাখি দেশি প্রজাতির হলেও পাবনার জন্য তারা অতিথি ও দেশীয় সম্পদ। পাখি শিকারের বিরুদ্ধে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রচার বৃদ্ধির সঙ্গে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই সম্পদ রক্ষা করতে হবে। এ ব্যাপারে পাবনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান বলেন, শীতের এই সময়ে পাবনার বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর পরিমাণে অতিথিসহ দেশি পাখির বিচরণ ঘটে। তাদের নিরাপত্তায় আমরা রাজশাহী বন্যপ্রাণী বিভাগ পুলিশের সহায়তায় মাঝেমধ্যেই অভিযান চালাই।

তবে লোকবলের অভাবে এটা সবসময় সম্ভব হয় না। পাবনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাংস্কৃতিক সংগঠক প্রফেসর শিবজিত নাগ বলেন, পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা গেলে এবং এসব পাখির নিরাপত্তা দেয়া গেলে এরা হয়তো নিয়মিত আসবে। একই সঙ্গে পাখির বিচরণের জন্য বিল-জলাশয় ভরাট করা থেকেও আমাদের বিরত থাকতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×