আতঙ্কে আত্মসমর্পণের পথে দেড়শ’ ইয়াবা ব্যবসায়ী

দেশে ফিরেছেন মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া দুবাই ও ভারতে পলাতক ২০ ইয়াবা কারবারি

  ইকবাল হাসান ফরিদ ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আইনশৃঙ্খলা

কক্সবাজারের ইয়াবা ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে রয়েছেন। এ মাসের শেষের দিকে তালিকাভুক্ত প্রায় দেড়শ’ ব্যবসায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। গ্রেফতার এড়াতে যারা দেশ ছেড়েছিলেন, তাদের মধ্যে দুবাই, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ভারত থেকে ২০ জন আত্মসমর্পণ করতে এরই মধ্যে দেশে ফিরেছেন।

মাদক নির্মূলে র‌্যাব-পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্সে। এদিকে ইয়াবার সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেয়ার টার্গেটে কক্সবাজারে স্থাপিত হয়েছে র‌্যাবের ১৫তম ব্যাটালিয়ন। ফেব্র“য়ারির প্রথম সপ্তাহে যাত্রা শুরু করবে এ ব্যাটালিয়ন। এ অবস্থায় কক্সবাজার ও এর আশপাশের ইয়াবার কারবারি এবং তাদের মদদদাতারা আতঙ্কে দিন পার করছেন।

তাদের কেউ কেউ ইয়াবার কারবার ছেড়ে সুপথে আসতে আত্মসমর্পণে রাজি হয়েছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, র‌্যাব-১৫ ব্যাটালিয়নের যাত্রা শুরুর আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করবেন কক্সবাজার ও টেকনাফের তালিকাভুক্ত প্রায় দেড়শ’ ইয়াবা ব্যবসায়ী।

বিদেশে পালিয়ে থাকা ইয়াবা ব্যবসায়ীর মধ্যেও অনেকেই আত্মসমর্পণ করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। তাছাড়া দুবাই, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়ায় পালিয়ে থাকা ২০ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী এরই মধ্যে দেশে ফিরেছেন আত্মসমর্পণের উদ্দেশ্যে। সূত্র জানিয়েছে, এ মাসের শেষ সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা আত্মসমর্পণ করবেন। এ অনুষ্ঠানে অতিথি থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী।

জানা গেছে, কক্সবাজার ও টেকনাফের প্রায় ৬০ কিলোমিটার জলসীমা দিয়ে প্রবেশ করে ইয়াবার চালান। বলতে গেলে ইয়াবার কারবার শতভাগ নিয়ন্ত্রণ হয় কক্সবাজার ও টেকনাফ থেকে। এদিকে ইয়াবার বিস্তার রোধে জিরো টলারেন্স নীতিতে হাঁটছে র‌্যাব- পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র‌্যাব টেকনাফের শাপলাপুর, বটতলী, সাবরাং, হোয়াইকং ও শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় ৫টি অস্থায়ী ক্যাম্প বসায়। নজরদারিতে ইয়াবার বড় বড় চালান ধরা পড়ে। তাছাড়া বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ী।

আড়াই মাসে টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ২৩ জন চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ১৯ জন। এ অবস্থায় তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। কেউ কেউ পালিয়ে যান দুবাই, মালয়েশিয়া, ভারত, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। এদিকে সরকার কক্সবাজারে র‌্যাবের স্থায়ী ব্যাটালিয়ন স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ে। ইয়াবা ব্যবসার টাকায় গড়া বিশাল বিত্তবৈভব ছেড়ে বনে-বাদাড়ে পালিয়ে থাকা ইয়াবা ব্যবসায়ীরাও চোখে শর্ষে ফুল দেখতে থাকেন। এ অবস্থায় তাদের কেউ কেউ ইয়াবা ব্যবসা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।

এর আগে জলদস্যুদের আত্মসমর্পণে সহযোগিতা করেছিলেন একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিবেদক এমএম আকরাম হোসেন। তারা তার নম্বর জোগাড় করে যোগাযোগ করেন। আকরাম হোসেনের মাধ্যমে সরকার ও প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহল জানতে পেরে সম্মতি দেয়। আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়াটি সফল করতে মাঠে কাজ শুরু করে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের বিশেষ একটি দল। শুরু হয় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাওয়াদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ। এরই মধ্যে ৫০ জনের অধিক ইয়াবা ব্যবসায়ী তাদের হেফাজতে চলে এসেছেন।

এমএম আকরাম হোসেন যুগান্তরকে জানান, তার মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করা জলদস্যুদের সঙ্গে কারাগারে থাকা ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দেখা হয়। তাদের কাছ থেকে নম্বর সংগ্রহ করে বাইরে থাকা আত্মীয়স্বজনদের দেন ওই ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। তারা আকরাম হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন। এরই মধ্যে শীর্ষ মানের অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ীসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক স্বেচ্ছায় পুলিশের বিশেষ দলটির হেফাজতে চলে এসেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিনের ব্যবসার মায়া ভুলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন প্রায় দেড়শ’ ব্যবসায়ী। তাদের মধ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ছাড়াও সংশ্লিষ্ট জেলার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা তালিকায় ৭৩ জন মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে অন্তত ৫০ জন রয়েছেন। তাছাড়া কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সর্বশেষ করা ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকার ১ হাজার ১৫১ জনের মধ্যে তালিকার মধ্যেও এদের সবারই নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা স্বেচ্ছায় মাদক ব্যবসা ছেড়ে আত্মসমর্পণ করার জন্য যোগাযোগ করেছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর পুলিশ কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিও ব্যবসায়ীদের ইয়াবার ব্যবসা ছেড়ে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। তার আহ্বানে যদি আরও কেউ সাড়া দেয় তবে আমরা তাদের স্বাগত জানাব।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আত্মসমর্পণ করা মাদক ব্যবসায়ীদের মাদক বিক্রির অর্থ বাজেয়াপ্ত করবে সরকার। প্রথমে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃপক্ষ আত্মসমর্পণ করা এই ব্যবসায়ীদের সম্পদের তদন্ত করবে। তদন্তের পর ইয়াবা ব্যবসা থেকে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করবে তারা।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান যুগান্তরকে বলেন, শিগগির র‌্যাব-১৫ ব্যাটালিয়ন আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করবে। এরই মধ্যে ওই ব্যাটালিয়নের কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। কক্সবাজার ও বান্দরবানের ১৫টি উপজেলা থাকবে র‌্যাব-১৫ ব্যাটালিয়নের অধীন। ফেব্র“য়ারির প্রথম সপ্তাহে ব্যাটালিয়নের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে শুরু হবে সাঁড়াশি অভিযান।

এর আগে র‌্যাব ডিজি বেনজীর আহমেদ ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, নতুন বছরে পূর্ণ উদ্যমে মাদক ও জঙ্গি নির্মূলে কাজ করবে র‌্যাব। এ জন্য নতুন বছরের জানুয়ারির শেষে কক্সবাজারে র‌্যাবের একটি স্থায়ী ব্যাটালিয়ন গঠন করা হবে। সূত্র জানিয়েছে, র‌্যাব ডিজির এ ঘোষণার পর থেকেই ইয়াবার কারবারিদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েও ইয়াবার কারবার ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কথা জানান। প্রশাসনও তাদের আলোর পথে ফেরার বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×