ভৈরবের শতাধিক তরুণকে লিবিয়ায় আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়

  ভৈরব প্রতিনিধি ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভৈরবের শতাধিক তরুণকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় আটকে রেখে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করছে প্রতারক চক্র। পরিবারগুলো সহায়-সম্বল বিক্রি করে তাদের সন্তানদের মুক্তিপণের টাকা দিয়ে প্রতারক দলের জিম্মি থেকে ফিরিয়ে আনছে। এখনও প্রায় অর্ধশত তরুণ লিবিয়ায় প্রতারকের হাতে জিম্মি আছে বলে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাড়ি থেকে মুক্তিপণের টাকা এনে দিতে লিবিয়ায় আটককৃতদের ওপর চলছে অমানবিক নির্যাতন। অনেক পরিবার তাদের সন্তানরা কোথায় আছে তার কোনো খোঁজ জানতে পারছে না। ভৈরবের দালাল মিলন ও সোহাগ এদেরকে লিবিয়া নিয়ে সাগর পথে অবৈধভাবে ইতালি পাঠাবে বলে লোভ দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। দালালরা শতাধিক তরুণের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছে বলে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছে।

উপজেলার রঘনাথপুর এলাকার মস্তো মিয়ার ছেলে ইমরান হোসেন (২০) ও শাহ আলমের ছেলে মো. আলী লোভে পড়ে দু’জনে ৮ লাখ টাকা দালাল মিলনকে দিয়ে লিবিয়া গিয়েছিল এবং পরে তাদের জিম্মি করে আরও ৪ লাখ টাকা দালালকে দেয়। কিন্তু ৮ মাস হয়ে গেছে এখনও দু’জনকে ইতালি পাঠাতে পারেনি। ৪ মাস ধরে তাদের কোনো খোঁজ নেই। এখন বাড়িতে শুধু কান্না চলছে। ইমরানের মা ফিরুজা বেগম এই প্রতিনিধিকে জানান, বাড়ি-ঘর বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম সুখের আশায়, কিন্তু এখন ছেলে নিখোঁজ।

জানা গেছে, ইতালি যাওয়ার লোভে পড়ে ভৈরবের সম্ভুপুর, রঘনাথপুর, জগনাথপুর, গোছামারা, মধ্যেরচর, পঞ্চবটিসহ কয়েকটি গ্রামের শতাধিক তরুণ দালাল মিলন ও সোহাগের খপ্পরে পরে লিবিয়া যায়। এদের মধ্যে পিয়ার হোসেন, আকাশ, জুম্মন, শুভ হোসেন, বাদশা, শাওন, সালমান, মারুফ, সাঈদ, আসিফ ও তৌকির হোসেন দালাল চক্রের খপ্পরে পরে লিবিয়ায় যাওয়ার পর মুক্তিপণের টাকা দিয়ে দেশে ফিরে এসেছে। এরা প্রত্যেকেই ৩-৪ লাখ টাকা দিয়ে লিবিয়া যাওয়ার পর আবার ২-৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে দেশে ফিরে আসে বলে তাদের অভিযোগে জানা গেছে। দেশে ফিরে আসা যুবক তৌকির জানান, আমি প্রথমে ৪ লাখ টাকা দিয়ে লিবিয়ায় যাই। দালাল মিলন বলেছিল ইতালি পৌঁছানোর পর আরও ৪ লাখ টাকা তার বাবা দেবে। কিন্তু ৮ মাস আগে লিবিয়ায় পৌঁছার পরই আমাকে ভৈরবের দালাল সোহাগের কাছে বিক্রি করে দেয় মিলন। তারপর লিবিয়ার দালালচক্র আমাকে একটি গুদামে আটকে জিম্মি করে ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে তারা আমার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো শুরু করে। ইলেকট্রিক শক, লাঠি ও রড দিয়ে প্রতিদিন পেটাত আমাকে। নিয়মিত খাবারও দিত না দালালরা। কয়েক মাস অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটিয়েছি। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দেশে মা-বাবাকে ঘটনা জানাই। পরে আমার পরিবার ৪ লাখ টাকা লিবিয়ায় পাঠালে আমি জিম্মি থেকে উদ্ধার হয়ে দেশে ফিরে আসি।

তৌকির জানায়, লিবিয়াতে ভৈরবের আরও অর্ধশত তরুণকে দালালরা গুদামে জিম্মি করে আটকে রেখেছে। যারা মুক্তিপণের টাকা দিতে পারছে তারাই দেশে আসছে এবং যারা টাকা না দিতে পারে তাদের দালালরা লিবিয়ায় আটক করে অমানসিক নির্যাতন করছে বলে জানায় সে। ভৈরবের রঘনাথপুর এলাকার শাহ আলম জানান, আমার ছেলে মো. আলীকে (২৩) ৩ লাখ টাকা দিয়ে লিবিয়ায় পাঠাই। পরে ছেলেকে জিম্মি করে আরও ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে দালাল চক্র। ছেলেকে নির্যাতন করায় আরও ২ লাখ টাকা দালালকে দিয়েছি, কিন্তু তাকে ৮ মাসেও ইতালি পাঠায়নি। এখন আমার ছেলে কোথায় আছে তাও জানতে পারছি না।

লিবিয়া থেকে ফেরত আসা শুভ হোসেনের মা পঞ্চবটি এলাকার ঝুমুর বেগম জানান, আমি বিধবা নারী। চার সন্তান নিয়ে সেলাই কাজ করে সংসার চালাই। আমার স্বর্ণালংকার বিক্রিসহ ধারদেনা করে দালাল জুয়েলের কথায় ছেলেকে লিবিয়া পাঠিয়েছিলাম। সেখানে ছেলে পৌঁছার পর দালাল শহীদ আরও দেড় লাখ টাকা দাবি করে। ছেলেকে জিম্মি করে নির্যাতন করার ভিডিও দেখালে আমি বাড়ি বিক্রি করে আরও দেড় লাখ টাকা দেয়ার পর ইতালি পাঠাতে সাগরের বোটে তুলে দেয়। পরে বোট ডুবে গেলে তাকে ইতালি না পাঠিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়। এখন আমি নিঃস্ব ও দিশেহারা হয়ে দালালকে খুঁজছি। ভৈরবে এমন আরও অসংখ্য পরিবার ও ভুক্তভোগী সুখের আশায় সন্তানদের অবৈধপথে ইতালি পাঠাতে গিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে পথে পথে ঘুরছে। ভুক্তভোগীরা দালালকে টাকা দেয়ার কোনো চুক্তি বা রশিদ নেয়নি। ফলে তারা কোনোরকম আইনি সহায়তাও নিতে পারছে না। অনেকেই বিচার পাওয়াসহ টাকা উদ্ধার করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ এলাকার চেয়ারম্যান ও মেম্বারের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, কিন্তু কোনো ফল পাচ্ছে না তারা।

উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম জানান, আমার এলাকার প্রায় অর্ধশত তরুণ ইতালি যেতে দালালের খপ্পরে পরে আজ নিঃস্ব হয়ে গেছে। অনেক গরিব পরিবার বাড়িঘর, স্বর্ণালংকার বিক্রি ও ধারদেনা করে এখন পথে পথে ঘুরছে বলে জানান তিনি। শিমুলকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জুবায়ের আলম দানিছ জানান, তার ইউনিয়নের গোছামারা গ্রামের ১৫-২০ জন একই ঘটনার স্বীকার হয়েছে। ভুক্তভোগীরা দালালদের টাকা দেয়ার কোনো রশিদ বা প্রমাণ না থাকায় বিচার করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি। ভৈরবের দালাল মিলন মিয়া জানান, আমি ঢাকা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনেককে লিবিয়ায় পাঠিয়েছি। তাদের সঙ্গে কথা ছিল আমি লিবিয়া পাঠাব এবং পরে সোহাগ নামের দালাল তাদের সাগরপথে ইতালি পাঠাবে। সে যদি ইতালি না পাঠিয়ে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে তবে তার দোষ বলে জানান তিনি। ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত সাদমীন জানান, অবৈধ পথে মানব পাচার বেআইনি কাজ। আমি বিষয়টি অবগত নই। তবে কেউ অভিযোগ দিলে তা তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×