খুমেক হাসপাতাল

ইন্টার্ন চিকিৎসকরাই রোগীদের ভরসা

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রাশেদ রাব্বি, খুলনা থেকে ফিরে

চরম অব্যবস্থাপনায় চলছে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল। ন্যূনতম চিকিৎসার জন্য ইন্টার্নদের ওপরই রোগীদের ভরসা করতে হয়। হাসপাতালের পদে পদে অনিয়ম-দুর্ভোগ।

অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) কয়েকটি মামলাও হয়েছে। এসব মামলার তদন্ত চলছে। এতকিছুর পরও উদাসীন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সার্টিফিকেট জাল করাসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৪ ও ২০১১ সালে দুদকে কয়েকটি মামলা হয়। এছাড়া দুদকের ঝটিকা অভিযানে প্যাথলজি বিভাগে অর্থ আদায়, রান্নাঘরে অপরিচ্ছন্নতা, দালালদের দৌরাÍ্য, জরুরি বিভাগে চিকিৎসক না থাকাসহ বিভিন্ন অনিয়ম ধরা পড়ে।

এসব বিষয়ে দুদকের তদন্ত চললেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নির্বাক। এ বিষয়ে খুমেক হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. এবিএম ইকবাল বলেন, অবসরে আছি এখন। এখানে যে অনিয়ম-দুর্নীতি আছে, তা নিয়ে দুদকে একাধিক অভিযোগ ও মামলা করা হয়েছে। একবার তদন্ত হয়েছে, আবার পুনঃতদন্ত হবে বলে শুনেছি। মনে হয় না এ কাজ সম্পাদনের আগে হাসপাতালের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হবে।

১৬ জানুয়ারি সরেজমিন খুমেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতাল ভবনের ভেতর-বাইরে সবখানে নোংরা আবর্জনার স্তূপ। জরুরি বিভাগ লেখা কক্ষে নেই কোনো যন্ত্রপাতি। এমনকি কোনো চেয়ার-টেবিল বা রোগী শয্যাও নেই।

জরুরি বিভাগের সামনের কক্ষে চলছে নির্মাণকাজ। হাসপাতালের ভেতরে যত্রতত্র পড়ে আছে নির্মাণসামগ্রী। প্রবেশের অযোগ্য জরুরি বিভাগের আশপাশের অনেকগুলো কক্ষ খালি পড়ে আছে।

বহির্বিভাগের রোগীদের জন্য নেই কোনো শৌচাগার। বিভাগের শৌচাগারটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় আশপাশের খালি কক্ষগুলোতে রোগী ও বহিরাগতরা প্রস্রাব করেন।

শৌচাগার নয়, এমন একটি কক্ষে কেন প্রস্রাব করলেন জানতে চাইলে ভর্তি রোগীর স্বজন ফাহিম জানান, অনেকটা বাধ্য হয়েই করতে হচ্ছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডে শৌচাগার থাকলেও সেগুলো ব্যবহার উপযোগী নয়।

আবার ব্যবহারযোগ্যগুলো জরুরি ও বহির্বিভাগ থেকে অনেক দূরে। নির্মাণকাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে কর্মরত একজন নির্মাণ শ্রমিক জানান, হাসপাতালে মূলত সংস্কার কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ না করে মাত্র দু-একজন দিয়ে কাজ করানোয় দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ করতে হচ্ছে।

এভাবে চলতে থাকলে কবে শেষ হবে, তা-ও বলা যাচ্ছে না। হাসপাতাল ভবন ঘুরে দেখা গেছে, একটি ব্রেস্টফিডিং কর্নার বা কক্ষ রয়েছে। তালাবদ্ধ কক্ষটির সামনেও ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। দীর্ঘদিন এটি ব্যবহার করা হয় না। একই অবস্থা হাসপাতালের ঔষধাগার। এটিও তালাবদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছু এক ইন্টার্ন ডাক্তার জানান, বাজেটের অর্থ প্রতিনিয়ত আত্মসাৎ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র। তিনি জানান, চিকিৎসক ও অন্য কর্মচারীরা হাসপাতালে ইচ্ছামতো আসেন।

প্রায় তারা অনুপস্থিত থাকেন। চিকিৎসা বা সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে মূলত মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে। হাসপাতালের অবস্থা এতটাই বেহাল যে, দরিদ্র ও একান্ত বাধ্য না হলে কেউ এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন না।

সরেজমিন আরও দেখা গেছে, সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনে রোগী কল্যাণ সমিতির মাসিক আয় ও ব্যয়ের বিবরণী ২০১৭ সালের পর আর হালনাগাদ করা হয়নি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের টিকিট না পেয়ে ফিরে যেত হয়।

টিকিট বিক্রয় কেন্দ্র বা কাউন্টারটি ফাঁকা থাকায় তারা টিকিট পান না। সিটিজেন চার্টারে হাসপাতাল ভবনের বারান্দায় বা ভেতরে বাইসাইকেল বা মোটরসাইকেল না রাখার জন্য কড়া নির্দেশনা থাকলেও প্যাথোলজি ল্যাবের ঠিক সামনের কক্ষেই রাখা হয় মোটরসাইকেল।

হাসপাতালের একজন কর্মচারী জানান, রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে এ ধরনের অনিয়ম এখানে অলিখিত আইনে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালের বেশির ভাগ চিকিৎসক নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না।

যারা আসেন, তারাও রোগীদের কোনো খোঁজখবর নেন না। বাইরে থেকে রোগীদের বেশির ভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। এদিকে ভগ্নদশা লিফটের পাশের বারান্দায় এক রোগীকে মাদুরের ওপর চটের বস্তা জড়িয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।

দুর্ঘটনায় আহত ওই রোগী জানান, এক মাস আগে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে এক মাস পরে আসতে বলা হয়। দু’দিন আগে তিনি এখানে এসেছেন। কিন্তু দু’দিনেও তার চিকিৎসা শুরু হয়নি।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবস্থা সম্পর্কে এক ইন্টার্ন চিকিৎসক বলেন, ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ চিকিৎসক বলেন, এ হাসপাতালের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সমস্যা। চিকিৎসকরা কাজ করেন না। তাদের পাওয়াই যায় না।

রোগীরা হাসপাতালে আসার আগেই দালালরা তাদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অন্যত্র নিয়ে যায়। অপরদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ ব্যস্ত থাকেন সরকারি টাকা আত্মসাৎ করার নানা ফন্দির আঁটতে।

এ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা পাস করে বেরিয়ে যেতে পারলেই যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন। তিনি আরও বলেন, এখানকার বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অনেক অভিযোগ করেছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে এখানে দুর্নীতি হয়। তাই কারও পক্ষে কিছুই করার থাকে না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা বিভাগের (স্বাস্থ্য) পরিচালক ডা. মো. রওশন আনোয়ার বলেন, এ বিষয়ে কিছুই জানি না। তাই মন্তব্য করতে পারছি না।