ভালোবাসার অশ্রু আর ফুলে সুরস্রষ্টাকে চিরবিদায়

  সাংস্কৃতিক রিপোর্টার ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চিরবিদায়

প্রিয়জন, বন্ধু আর অগণিত সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন কালজয়ী সুরস্রষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। বুধবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় মুক্তিযোদ্ধা এই শিল্পীকে।

শ্রদ্ধা জানানোর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও এফডিসিতে দুই দফা জানাজা হয়। এরপর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় দাফন করা হয় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে।

মঙ্গলবার ভোররাতে রাজধানীর আফতাবনগরে নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। রাতে তার মরদেহ রাখা হয় বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে। বুধবার সকাল ১১টায় মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হয়। সেখানে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় নাগরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান চলে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত।

শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বের শুরুতেই আওয়ামী লীগের পক্ষে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিলের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সহকারী সামরিক সচিব ইফতেখারুল আলম।

শ্রদ্ধা জানায় বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, নজরুল সঙ্গীতশিল্পী পরিষদ, ওয়েস্ট অ্যান্ড হাই স্কুল, এলআরবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, জাসাস, অ্যাডাব, উদীচী, স্রোত আবৃত্তি সংসদ, বাংলাদেশ বৌদ্ধ যুব পরিষদ, দেশ টিভি, আনন ফাউন্ডেশন, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড, আজিমপুরের গেরিলাবাহিনী সজীব গ্রুপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু ঐক্যজোট, গণসংহতি আন্দোলন, চারুশিল্পী সংসদ, জাতীয় কবিতা পরিষদ, শিশু একাডেমি, প্রাচ্যনাট, বাংলাদেশ বেতারসহ অসংখ্য সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।

শ্রদ্ধা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মো. আখতারুজ্জামান ও প্রো-ভিসি মুহাম্মদ সামাদ, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপু, শংকর সাঁওজাল, শিল্পী সুমনা হক, শফিক তুহিন, ম. হামিদ, মনির খান, এসডি রুবেল, শুভ্র দেব, রিজিয়া পারভীন, শাহেদ, ফুয়াদ নাসের বাবু প্রমুখ। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদেন পর্ব শেষে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ছেলে সামির আহমেদ বলেন, তিনি দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তারাই তার গানকে বাঁচিয়ে রাখবেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে আর কিছু চাওয়ার নেই। তিনি বলেন, আমাদের পরিবারের দাবি ছিল- মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফনের। প্রধানমন্ত্রী সে দাবি পূরণ করেছেন। এজন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা। সামির বলেন, আমার বাবাকে যে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে, তিনি তার যোগ্য দাবিদার। গীতিকার সুরকারের চেয়ে বড় কথা তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।

সে হিসেবে দেশের জন্য যা করা প্রয়োজন তিনি তা করেছেন। এবার দেশের মানুষদের কাজ করতে হবে। তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, তার চলে যাওয়া এ দেশের জন্য বড় ক্ষতি। তার সকল সৃষ্টিকর্ম সরকারের পক্ষ থেকে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হবে।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ বলেন, তার মৃত্যুতে শুধু দেশের সঙ্গীতাঙ্গন নয়, সমগ্র জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার সৃজনকর্ম সংরক্ষণের জন্য যা যা পদক্ষেপ দরকার, তা নেয়া হবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, তিনি শুধু গানের জন্য নয়, দেশের প্রতি যে অবিস্মরণীয় ভালোবাসা দেখিয়েছেন তা ভোলার নয়।

২০১২ সালে গঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাক্ষ্য দেন তিনি। যে কারণে তার ভাইকে প্রাণ দিতে হয়েছে। সৈয়দ আবদুল হাদী বলেন, সঙ্গীত সম্পর্কে আধুনিক চিন্তাভাবনা ছিল তার। স্বাধীনতার পর নতুন সঙ্গীত চিন্তা নিয়ে যারা কাজ শুরু করেছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তাদের অন্যতম। গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, তার গুণকীর্তন করার প্রয়োজন পড়ে না। তার গান তার পরিচয়।

যে অবদান কোনোদিন মোছা যাবে না। তিনি চলে গেলেন কিন্তু তাকে মূল্যায়ন সম্মান করার দায়িত্ব আমাদের, রাষ্ট্রের। কারণ এমন শিল্পীরা দেশের সম্পদ।

শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, দেশের গান যে এভাবে প্রাণ ছুঁয়ে যেতে পারে- তা বুলবুলের গান গাওয়ার সুযোগ না হলে উপলব্ধি করা সম্ভব হতো না। তিনি পৃথিবীর নিয়মে চলে গেছেন, কিন্তু আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায় বলেন, তিনি ছিলেন দেশের সঙ্গীতাঙ্গনের অনন্যসাধারণ এক প্রতিভা। যতদিন বাংলাদেশ, বাংলা গান ও সংস্কৃতি থাকবে, ততদিন বুলবুল বেঁচে থাকবেন।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বলেন, যে বিশ্বাস নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, সেই বিশ্বাসে আমৃত্যু অটল ছিলেন। সেই বিশ্বাস তার কর্মে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। দেশের সঙ্গীতাঙ্গনে তিনি চির অক্ষয় হয়ে থাকবেন। নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধপরবর্তীকালে দেশের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিলেন বুলবুল। তার শূন্যতা অনেক দিন পরও পূরণ হবে না।

শিল্পী অ্যান্ড্রু কিশোর বলেন, যারা এখনও বেঁচে আছি, যারা ভবিষ্যতে আসবেন; তাদের দায়িত্ব হল আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সৃষ্টিকর্মকে বাঁচিয়ে রাখা। কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, সঙ্গীতের একজন মহীরুহ, একজন মহাজন হারিয়ে গেলেন। শত জনমেও সঙ্গীতের এ শূন্যতা পূরণ হবে না।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ মিনার থেকে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। সেখানে বাদ আসর তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর এফডিসি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জানাজা।

তাতে অংশ নেন চিত্রনায়ক আলমগীর, রিয়াজ, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব মুশফিকুর রহমান গুলজার, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান প্রমুখ। এরপর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত স্থানে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে সমাহিত করা হয়।

ঘটনাপ্রবাহ : আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আর নেই

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×