ইয়াবার ‘সদর দরজা’য় চতুর্মুখী অভিযান

সম্পদ ক্রোকের আবেদন * নতুন তালিকায় অর্ধশত গডফাদার * ৭৮টি সুরম্য অট্টালিকা চূর্ণবিচূর্ণ * সেফহোমে ছুটছে মাদক ব্যবসায়ীরা

  ইকবাল হাসান ফরিদ ২৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অভিযান

কক্সবাজারের টেকনাফকে বলা হয়ে থাকে ইয়াবার ‘সদর দরজা’। কারণ মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান টেকনাফ হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে যায়। আর ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ হল এখানকার বাসিন্দা।

এবার ইয়াবার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চতুর্মুখী তৎপরতা শুরু করেছেন। এদিকে, নতুন বছরের শুরু থেকে আবার মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। র‌্যাবের অস্থায়ী ক্যাম্প তুলে নিলেও নতুন ব্যাটালিয়ন স্থাপনের কাজ চলছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একদিকে যেমন ইয়াবা কারবারি ও গডফাদারদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে অভিযান চালানো হচ্ছে। তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ইয়াবা ব্যবসার টাকায় গড়া সুরম্য অট্টালিকাও গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ৭৮টি পাকা বাড়ি চূর্ণবিচূর্ণ করা হয়েছে। পুলিশের একটি সূত্র যুগান্তরকে জানায়, এতদিন যারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গোপনে ইয়াবা কারবার করছিল তাদের আড়াইশ’ নামের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অর্ধশত বড় ব্যবসায়ী ও প্রায় দেড় ডজন হুন্ডি ব্যবসায়ী। র‌্যাব-পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চতুর্মুখী তৎপরতায় এখন ইয়াবা কারবারিরা আত্মরক্ষার পথ খুঁজছে। কেউ কেউ স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেফহোমে হাজির হচ্ছে।

ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বাড়ি বাড়ি অভিযান চালানো হচ্ছে। তাদের না পেয়ে বুলডোজার দিয়ে বাড়ি ভেঙে দেয়া হচ্ছে। চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়া হচ্ছে তাদের বিলাসবহুল বাড়িঘর। স্থানীয় সূত্র বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরা সদস্যরা এসব বাড়িঘর ভেঙে দিচ্ছেন। অবশ্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা বলছেন, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এলাকায় জনরোষ তৈরি হয়েছে। ক্ষুব্ধ মানুষজন গডফাদারদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন।

ভুট্টোর সম্পত্তি ক্রোকে আদালতে সিআইডির আবেদন : ইয়াবার ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে রিকশাচালক নুরুল হক ভুট্টো (৩২) ও তার ভাই নুর মোহাম্মদ (৩৫)। ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত তাদের পরিবারের ৯ সদস্য। ২০০৯ সাল থেকে তারা মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছে। অবশ্য ইয়াবার কারণেই নিঃস্ব হতে চলেছে ভুট্টোরা। মানি লন্ডারিং ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ অনুসারে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি ২২ জানুয়ারি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে (বিশেষ জজ) ভুট্টোদের স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করার আবেদন জানিয়েছে।

সিআইডির এডিশনাল এসপি নাজিম আল আজাদ যুগান্তরকে বলেন, নতুন মাদক আইন কার্যকর হওয়ার পর কোনো মাদক ব্যবসায়ীর সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন এটাই প্রথম। আদালতের রায় পেলে তা কার্যকর করা হবে। তিনি বলেন, ২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার ১২ নম্বর মামলার তদন্তে বেরিয়ে আসে ভুট্টো, তার ভাই নূর এবং বাবা আজাহার মিয়ার ইয়াবা ব্যবসার ভয়ঙ্কর কাহিনী। ভুট্টোর ইয়াবা সিন্ডিকেটের সদস্যরা সবাই তার আত্মীয়।

বন্দুকযুদ্ধে নিহত ১৪ : মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসে কক্সবাজারে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১৪ জন নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জন টেকনাফের। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে চারজন, র‌্যাবের সঙ্গে চারজন, বিজিবির সঙ্গে দু’জন এবং পুলিশ ও বিজিবির যৌথ অভিযানে একজন নিহত হয়েছে। পুলিশের দাবি, মাদক ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দু’জন নিহত হয়েছে।

গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে ৭৮টি বাড়ি : নাজিরপাড়ায় ইয়াবা গডফাদার ভুট্টোর বাড়িটি অনেকটা প্রাসাদসম। সেখানে অভিযানে যাওয়া সিআইডির এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ওই বাড়িতে ঢুকে মনে হল এটি কোনো শিল্পপতির বাড়ি। নাজিরপাড়ায় পাঁচ তলা ফাউন্ডেশনের তিন তলা বাড়িটিতে পাশ্চাত্য নির্মাণশৈলী। আসবাবপত্র থেকে শুরু করে সব কিছুতেই বিলাসিতার ছাপ। তিনি বলেন, বাড়ির সীমানা প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে ঢুকতেই আমাদের লেগেছিল প্রায় আধা ঘণ্টা। জানা গেছে, ভুট্টোর সেই বাড়িটিও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

টেকনাফের নাজিরপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় আলিশান বাড়ি ভেঙে চুরমার করে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল- সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বাদির বেয়াই নাজিরপাড়ার সৈয়দ হোসেনের বাড়ি, পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়া জিয়াউর রহমানের বাড়ি, শিলবুনিয়াপাড়ায় সাইফুল করিমের বাড়ির সীমানা প্রাচীর, মৌলভীপাড়ার আবদুর রহমান, তার ভাই একরাম, জালিয়ারপাড়ার ইয়াবা ব্যবসায়ী জুবায়ের, জিয়াউল ও মোজাম্মেল, ডেলপাড়া গ্রামের শফিক, টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও লেদা গ্রামের নুরুল হুদা মেম্বার ও বাবুল মেম্বারের বাড়ি, হোয়াখং গ্রামের জুনায়েদ আলী শিকদারের বাড়িসহ টেকনাফ এলাকার ইয়াবা ব্যবসায়ী ও তাদের গডফাদারদের ৭৮টি বাড়ি।

সেফহোমে ছুটছে টাকার কুমিররা : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে সেফহোমকে নিরাপদ মনে করছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। বিত্তবৈভবের চেয়ে নিজের জীবনটাকে এখন তারা বড় করে দেখছে। এরই মধ্যে সেফহোমে চলে গেছে ৬৬ জন। তাদের মধ্যে ২৫ গডফাদার রয়েছে। আরও শতাধিক ব্যক্তি আত্মসমর্পণের উদ্দেশ্যে যোগাযোগ করছে। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে লিয়াজোঁ করছেন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের সাংবাদিক এমএম আকরাম হোসেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, প্রতিদিনই নতুন ব্যবসায়ী যোগাযোগ করছে।

নতুন আড়াইশ’ ব্যবসায়ী ও গডফাদারের তালিকা পুলিশের হাতে : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় কক্সবাজারের ১ হাজার ১৫১ মাদক বিক্রেতার তালিকায় ৯১২ জন টেকনাফের। তবে এ তালিকার বাইরে অনেক ব্যবসায়ী দিনের পর দিন গোপনে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। তাদের তালিকাও চূড়ান্ত করেছে পুলিশ প্রশাসন। নতুন তালিকায় ২৫২ জনের নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে অর্ধশত ইয়াবার গডফাদার। এ তালিকায় একাধিক জনপ্রতিনিধিসহ প্রভাবশালীদের নাম রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য : কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একটা জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষুব্ধ মানুষজন তাদের বাড়িঘর ভাংচুর করছে। তিনি বলেন, শুধু বাড়িঘর ভাংচুর নয়, ১৬টির মতো নৌকায়ও আগুন দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এসব কারা করেছে, বিষয়টি পুলিশের নজরে নেই। এছাড়া কেউ এসব বিষয়ে অভিযোগ নিয়েও আসেনি। তিনি আরও বলেন, টেকনাফে এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যারা মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিল তাদেরও তালিকা তৈরি হয়েছে।

শুধু মাদক ব্যবসায়ীই নয়, হুন্ডির মাধ্যমে যারা মাদকের টাকা আদান-প্রদান করছে এমন বেশ কয়েকজনের নামও রয়েছে পুলিশের কাছে। তিনি বলেন, এ তালিকা ধরে এখন অভিযান চালানো হবে। র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান যুগান্তরকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে র‌্যাব জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×