নবাবগঞ্জে মাটি বিক্রির মহোৎসব প্রশ্নবিদ্ধ পুলিশ ও প্রশাসন

  যুগান্তর রিপোর্ট, নবাবগঞ্জ ৩১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাটি বিক্রি

ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলায় ভূমি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফসলি জমির মাটি বিক্রির মহোৎসবে মেতেছে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছে কৃষিসংশ্লিষ্ট সচেতন মহল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, থানার পুলিশ কর্মকর্তা, উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে সারা বছরই এসব মাটিখেকো তাদের অবৈধ মাটি বিক্রির ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। মাটিখেকোদের উৎপীড়নে দিশাহারা হয়ে উঠেছে ফসলি জমির মালিক ও কৃষি শ্রমিকরা।

উপজেলার কৈলাইল, পশ্চিম ও পূর্ব মেলেং, খালপাড় মাতাপপুর, কাটাখালী, মালিকান্দা, দৌলতপুর, শোল্লার আওনা চক, চক সিংহরা, চক সিংজোর, নয়নশ্রী এলাকার শৈল্যা ও কলাকোপা ইউপির সাহেবখালীসহ শিকারীপাড়া, বাহ্রা ইউনিয়নে কয়েকটি স্পটে মাটি উত্তোলন হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ দফতর সূত্রে জানা যায়, নবাবগঞ্জে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১৭৫১১ হেক্টর। যার মধ্যে এক ফসলি জমি ৬৯৯৩ হেক্টর, দুই ফসলি জমি ৮৬২৮ হেক্টর, তিন ফসলি জমি ২১৮১ হেক্টর। এ ছাড়া তিনের অধিক ফসলি জমির পরিমাণ ২৫ হেক্টর ও আবাদযোগ্য পতিত জমি ২৪৫ হেক্টর। কিন্তু বর্তমানে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ বিষা কৃষিজমি কথিত মাটি ব্যবসায়ীরা বিনষ্ট করছে। পুকুর খনন ও মাছ চাষের কথা বলে মাটি তুলছে তারা- উদ্দেশ্য মাটি বিক্রি করা।

এলাকাবাসীর দাবি, মাছ চাষের কথা বলে পুকুর খনন করে শত শত বিঘা আবাদি কৃষি জমির মাটি ভেকু দিয়ে কেটে বিভিন্ন ইটভাটা ও স্থাপনা নির্মাণকারীদের কাছে বিক্রি করছে মাটি বিক্রেতা সিন্ডিকেট। অন্যদিকে কৃষিকাজের জন্য ভারত থেকে আমদানি করা মাহেন্দ্র দিয়ে মাটি আনা-নেয়ার ফলে অধিকাংশ গ্রামীণ কাঁচাপাকা সড়কের বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে সিংজোর গ্রামের অটোরিকশা (সিএনজি) চালক আবদুস সালাম মোল্লা ও মেলেং গ্রামের রিকশাচালক করিম নবাবগঞ্জের একটি চা স্টলে আলাপকালে বলেন, রাস্তাঘাট যতই ঠিক করা হোক না কেন লাভ নেই, কারণ মাটি বিক্রি বন্ধ না হলে মাহেন্দ্র চলাচল বন্ধ হবে না। মাহেন্দ্রের কারণে পাকা সড়কের পিচ উঠে যায় ও গর্ত সৃষ্টি হয়। কাঁচা সড়ক ভেঙে বড় বড় গর্ত হয়, যা দেখার ও বলার কেউ নেই।

ভুক্তভোগী কৃষক কৈলাইল গ্রামের সোরহাব ও কাটাখালী এলাকার হোসন মিয়া বলেন, ফসলি জমির মাটি বিক্রির ব্যবসা চালাতে প্রশাসনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করতে সদা তৎপর থাকেন একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সে দলের নেতাকর্মী পরিচয় দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতি বছর লাখো কোটি টাকা। থানা পুলিশকে কোথাও প্রতিদিন ও কোথাও সাপ্তাহিক সালামি দিয়েই এসব মাটি কাটা হচ্ছে বলে মাটি বিক্রেতারা জানান। নবাবগঞ্জের মালিকান্দা গ্রামের অধিবাসী দুলাল চান বলেন, আমাদের অঞ্চলের ভূমিখেকো ক্ষুদু মেম্বার, মহরচাঁন, যুবলীগের বাবুল, হাবিব (ডয়েস), মেলেং গ্রামের কথিত আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল ওহাব, কৈলাইল গ্রামের আবুল কাশেম, সহিদ সারা বছর মাটি বিক্রি করলেও প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে না।

বরং থানার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসব ব্যক্তি উপস্থিত থাকেন, তাদের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদের রয়েছে সুসম্পর্ক। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালায় পুলিশ। ইছামতি নদীর পাড়ের শাইলকা গ্রামের আজাদ খান বলেন, মাটিখেকো ক্ষুদু মেম্বারের কারণে কৈলাইল ও বাহ্রা ইউনিয়নের শত শত বিঘা কৃষিজমি নষ্ট হলেও ক্ষুদু মেম্বারের কিছুই হয় না।

কারণ পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে ক্ষুদু মেম্বারের রয়েছে হটলাইন। প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা মাঝে মাঝে বেড়াতে আসেন তার বাড়িতে এমন তথ্যও জানান তিনি। উপজেলার রাজপাড়ার বাসিন্দা কালাম মিয়া বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দোহার উপজেলার সীমান্তবর্তী ইসলামপুর এলাকার সাহেবখালীর ইটভাটার কারণে সড়ক ও কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ভেকু দিয়ে ফসলি জমির মাটি কেটে মাহেন্দ্র দিয়ে ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে নেয়ার কারণে সড়কগুলো যাতায়াতের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে তারা স্থানীয় প্রশাসনের নিরবতাকে দায়ী করেন।

সমরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার শিকারীপাড়া এলাকার ডিএনবি ও চুনাকাটিবিল এলাকায় অবস্থিত জেবিসি, সাহেবখালীর জেবিসি, জেপিবি, মাঝিরকান্দা এলাকায় ডিএনবি ও শোল্লা পালিঝাপের এসএসবি ব্রিকস (এএবি), কৈলাইল ইউনিয়নে জেবিসি (এনডিএস) ব্রিকস, এনবিএস, কেএইচবি, জেবিসি (এনডিএস) নামের ইটাভাটা মালিকরা শত শত বিঘা কৃষিজমির মাটি তুলে কৃষি অধ্যুষিত এ অঞ্চলের কৃষককে ভাবিয়ে তুলেছে।

নবাবগঞ্জ উপজেলা জাতীয় কৃষক সমিতির নেতা আসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, কৈলাইল, সাহেবখালী, শিকারীপাড়াসহ উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটা সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকরা জমি হারানোর দুশ্চিন্তায় আছেন। আর এসব আবাদযোগ্য কৃষিজমি বিভিন্ন কৌশলে খরিদ করে বছরের পর বছর মাটি বিক্রির ব্যবসা চালাচ্ছেন।

মাটিখেকো নামে বহুল পরিচিত বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গ্রুপ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী পরিচয়ে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সারা বছর মাটি বিক্রি করছে বিভিন্ন ইউনিয়নের বিক্রেতা সিন্ডিকেট। উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর কতিপয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের রয়েছে মহরম-দহরম সম্পর্ক।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি। বরং হামলা, মামলার শঙ্কায় পড়তে হয় তাদের। নয়নশ্রী ইউনিয়নের শৈল্যার চকে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ে যুবলীগ নেতা খৈমদ্দিনসহ কয়েক নেতাকর্মী মাটি বিক্রির ব্যবসা চালাচ্ছে। স্পটগুলোতে গিয়ে মাটি ব্যবসায়ীদের কাছে ফসলি জমির মাটি কাটার অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে নবাবগঞ্জ থানা পুলিশের কথা বলেন তারা। তবে অনুমোদনের কাগজ দেখতে চাইলে দেখাতে পারেননি। মৌখিকভাবে তাদের কাছে বিষয়টি জানিয়েই আমরা মাটি কাটছি বলে জানান তারা।

এ বিষয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মনজুর হোসেনের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শরীফ রায়হান কবির মুঠোফোনে যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেনকে জানানো হবে এবং তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। নবাবগঞ্জ থানার ওসি মোস্তফা কামাল বলেন, কারা মাটি কাটে তাদের নাম বলুন। কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×