দুই কিলারের স্বীকারোক্তি

এক চুক্তিতে দুই খুনের মিশন

খুন হয় রাসেল, প্রাণে বেঁচে যায় পারভেজ * পিবিআই’র তদন্তে রহস্য উদ্ঘাটন * চুক্তি হয় ৫ লাখ টাকায়

  ইকবাল হাসান ফরিদ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এক চুক্তিতে দুই খুনের মিশন

কদমতলী এলাকার মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ী পিংকী প্রতিপক্ষ পারভেজকে সরিয়ে দিতে ৫ লাখ টাকায় চুক্তিতে কিলার ভাড়া করেছিলেন।

আর কিলার গ্রুপের প্রধান সজল ওরফে পিচ্চি সজলের গলার কাঁটা ছিল রাসেল। সজল সুযোগ খুঁজছিল রাসেলকে এমনভাবে খুন করবে, যে খুনের ঘটনা ক্লুলেস থেকে যাবে। যেই কথা সেই কাজ।

২০১৫ সালের ১০ অক্টোবর রাতে বড়ইতলা মোড়ে ছুরিকাঘাত করে পারভেজ ও রাসেলকে ক্ষতবিক্ষত করে ভাড়াটে কিলাররা। এতে রাসেল মারা গেলেও প্রাণে বেঁচে যায় মাদক ব্যবসায়ী পারভেজ।

চতুর পারভেজ প্রতিপক্ষের হাতে নিজে আহত হওয়ার ঘটনায় মামলা করলেও রাসেল হত্যার বিষয়ে টুঁ শব্দটিও করেনি। তবে রাসেল হত্যার ঘটনায় তার মা রাশিলা বেগম বাদী হয়ে একটি মামলা করেন।

কিন্তু এ হত্যাকাণ্ডের কোনো ক্লু উদ্ঘাটন করতে না পেরে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশ। অবশ্য পুলিশের ধারণা ছিল রাসেল ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন।

রাসেলের মায়ের না-রাজির পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি পুনঃতদন্ত করতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআইকে নির্দেশ দেন।

পিবিআই তদন্তে নেমে ঘটনার প্রায় তিন বছরে পর মূল হোতা সজল ওরফে পিচ্ছি সজল (২২) ও মোহাম্মদ হোসেন বাবু ওরফে হুন্ডা বাবুকে (২৫) গ্রেফতার করে। রোববার তারা দু’জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়েছে। স্বীকারোক্তিতে তারা হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে।

যে কারণে খুনের শিকার রাসেল : পিবিআইর ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, নিহত রাসেলের বাড়ি খুলনার রূপসা থানার শিরগতি গ্রামে। ওই গ্রামে বিয়ে করেছে সজল ওরফে পিচ্ছি সজল।

বাগেরহাটের সজল ঢাকার কদমতলীতেই থাকত। সে বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামি হওয়ায় শশুরবাড়িতে অবস্থান করত। আর রাসেল গ্রামে কৃষিকাজ করত। ২০১৫ সালে রাসেলের সঙ্গে পিচ্ছি সজলের সখ্য গড়ে ওঠে।

সজল রাসেলকে একটি টায়ার কোম্পানিতে চাকরি দেবে বলে জানালে ২০১৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সে ঢাকায় আসে। ওই বছরের ১১ অক্টোবর রাত ১১টায় রাসেলের মা মোবাইল ফোনে খবর পান তার ছেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে মারা গেছেন।

পরদিন তিনি ঢামেক মর্গে গিয়ে ডান পাঁজরে পিঠের দিকে ব্যান্ডেজ অবস্থায় তার ছেলের লাশ শনাক্ত করেন। স্থানীয়ভাবে তিনি জানতে পারেন, রাত ১১টায় কদমতলীর বড়ইতলা মোড়ে কে বা কারা ছুরিকাঘাত করে রাসেলকে হত্যা করেছে।

তবে রাসেলের ঘাতক কারা, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি তিনি। এলাকার লোকজন তখন ধারণা করে ছিনতাইকারীরা রাসেলকে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় রাশিলা বেগম বাদী হয়ে কদমতলী থানায় মামলা করেন।

যেভাবে গ্রেফতার : পিবিআই জানায়, ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় মামলাটির তদন্ত শুরু করেন এসআই আল-আমিন শেখ। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারসহ নানাভাবে তদন্তকাজ চলতে থাকে।

একপর্যায়ে তিনি ঘাতকদের সন্ধান পান। এরপর আল-আমিন শেখের নেতৃত্বে পিবিআই’র একটি দল শনিবার সকাল সাড়ে ৭টায় বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ থানার আমতলী এলাকা থেকে সজল ওরফে পিচ্ছি সজলকে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদে সে রাসেল হত্যার দায় স্বীকার করে। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওইদিন সন্ধ্যা ৭টায় হোসেন বাবু ওরফে হুন্ডা বাবুকে শ্যামপুর থানাধীন হাজীগেট ব্যাংক কলোনি থেকে আটক করে পিবিআই। তাদের কাছ থেকে ২টি চাকু উদ্ধার করেছে পিবিআই।

যেভাবে হত্যাকাণ্ড : রোববার ঢাকার মহানগর মুখ্য হাকিম মো. তফাজ্জল হোসেনের আদালতে সজল ওরফে পিচ্ছি সজল এবং মোহাম্মদ হোসেন বাবু ওরফে হোন্ডা বাবুকে হাজির করা হলে বিচারকের কাছে তারা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সজল জানিয়েছে, কদমতদলী এলাকায় মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার একটি বড় সিন্ডিকেট পরিচালনা করে পিংকী। একই এলাকায় অস্ত্র ও মাদকের আরেক সিন্ডিকেট রয়েছে পারভেজ ও তার ভাই সবুজের।

পিংকী পারভেজকে তার অন্যতম প্রতিপক্ষ মনে করে। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বও দীর্ঘদিনের। এ অবস্থায় পিংকী সিদ্ধান্ত নেয় পারভেজকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার। এজন্য সজল ওরফে পিচ্ছি সজল এবং মোহাম্মদ হোসেন বাবু ওরফে হুন্ডা বাবুর সঙ্গে ৫ লাখ টাকায় চুক্তি করে পিংকী।

অগ্রিম দেয় ১৭ হাজার টাকা। বাকি টাকা অপারেশন সাকসেসের পর দেয়া হয়। এদিকে চাকরির জন্য ঢাকায় নিয়ে এলেও চাকরি দিতে না পাওয়ায় সজলের সঙ্গে বিরোধ চলছিল রাসেলের। সজল সিদ্ধান্ত নেয় পারভেজকে হত্যা করার সময় কৌশলে রাসেলকেও হত্যার।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সজল ওরফে পিচ্ছি সজল, বাবু ওরফে হুন্ডা বাবু, জুয়েল, আল-আমিন একত্রিত হয়। তারা সেখানে রাসেলকে ডেকে নেয়। ডেকে নিয়ে আসে পারভেজকেও। এক জায়গায় বসে তারা সবাই ইয়াবা সেবন করে।

একপর্যায়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পারভেজ ও রাসেলের ওপর এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত শুরু করে সজল ও হুন্ডা বাবু। তাদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে কিলাররা পালিয়ে যায়। পরে তাদের দু’জনকেই চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসারত অবস্থায় রাসেল মারা যান। তবে অনেক ছুরিকাঘাতের পরও বেঁচে যায় পারভেজ।

পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া সজল ওরফে পিচ্চি সজল ও হোসেন বাবু ওরফে হুন্ডা বাবুর বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি, হত্যাচেষ্টা ও অস্ত্রসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এদিকে পারভেজ অপর একটি মামলায় কারাগারে রয়েছে। পিবিআই জানিয়েছে, তাকে মামলায় সাক্ষী করা হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×