বুড়িগঙ্গা-তুরাগ তীরে উচ্ছেদ অভিযান

বছিলায় গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে ১২০ স্থাপনা

১টি চারতলা, ৮টি তিনতলা, ১১টি দোতলা ও ৪২টি একতলা ভবন ভেঙে ফেলা হয়

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অভিযান

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বছিলায় বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর দুই পাড়ে বহুতল ভবনসহ ১২০টি কাঁচা-পাকা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। সোমবার সকাল ৯টায় শুরু হয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে এ উচ্ছেদ অভিযান। অভিযানে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদী এবং এর প্লাবন ভূমি দখল করে গড়ে ওঠা ১টি চারতলা ভবন, ৮টি তিনতলা ভবন, ১১টি দোতলা ভবন, ৪২টি একতলা ভবন এবং ২৫টি টিনের ঘর ও টংঘর গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।

যাদের স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে তারা বলছেন আগে থেকে তাদের কোনো নোটিশ দেয়া হয়নি। তবে বিআইডব্লিউটিএ বলছে, নদী দখল করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদে কোনো নোটিশের প্রয়োজন নেই। নদী ও খাল উদ্ধারে বিআইডব্লিউটিএ’র এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। মঙ্গলবারও বছিলা এলাকায় অভিযান চলবে। এদিকে নদী বাঁচাতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম বছরজুড়ে চলমান রাখার দাবির পাশাপাশি দখলকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনার দাবিও উঠেছে। সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভা থেকে এ দাবি তোলা হয়েছে।

সরেজমিন সোমবার সকালে বছিলার বুড়িগঙ্গার তীরঘেঁষা পশ্চিম ধানমণ্ডি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নদী দখল করে গড়ে তোলা পাকা ও আধাপাকা স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় একটি দোতলা বাড়ি। বাড়িটিতে একটি সাইনবোর্ড ঝুলানো ছিল। এতে লেখা ছিল ওই সম্পত্তির ক্রয় সূত্রে মালিক আনোয়ার হোসেন। তবে খোঁজ নিয়েও আনোয়ার হোসেনকে পাওয়া যায়নি। এদিকে বুড়িগঙ্গার রায়েরবাজার খালেও অভিযান চলে বিআইডব্লিউটিএ’র। বুড়িগঙ্গা তীরে গড়ে ওঠা ১০ তলা ভবনটির পাশে সদ্য নির্মিত পৌনে ৪ কাটা জমির দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।

সেখানে শাহ আলম নামে একজন যুগান্তরকে বলেন, তিনি জমিটি দেড় কোটি টাকায় ক্রয় করেছেন জনৈক পারভেজ হোসেনের কাছ থেকে। সব টাকা এখনও দেয়া হয়নি। তবে বায়নাসূত্রে ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। এর কিছুক্ষণ পর স্থানীয় একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, এসব ভাঁওতাবাজি। শাহআলম জায়গা কিনেনি, এটা নদীর জায়গা। ওরা দখল করেছিল। এদিকে ১০তলা যে ভবনটি ভাঙনের মধ্য দিয়ে চতুর্থ দফা উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেটি উচ্ছেদ করেনি বিআইডব্লিউটিএ। তবে কেন ভাঙা হল না- এ নিয়ে মুখ খুলছেন না সংশ্লিষ্টরা। এতে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত অন্যদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

যাদের জমি উচ্ছেদ করা হয়েছে, তারা অভিযোগ করে বলেছেন, নদীর জমির পাশাপাশি তাদের নিজেদের জমিতে গড়ে তোলা স্থাপনাও গুঁড়িয়ে দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। তবে নদীর জমি দখল করলেন কেন- এমন প্রশ্নের উত্তর দেননি কেউ। এদিকে ১০তলা ভবনটির বিষয়ে বলা হয়েছে, এ ভবনটি গড়ে ওঠা জমির পুরোটা বিআইডব্লিউটিএ’র না। যদিও আইনে বলা আছে, নদীর পিলারের দেড়শ মিটারের মধ্যে যদি কোনো পাকা স্থাপনা থাকে, সেটিও ভেঙে ফেলতে হবে। বিআইডব্লিউটিএ’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, যেহেতু এটি বিআইডব্লিউটিএ’র জমি না, সেহেতু এটি তারা ভাঙেনি। এদিকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ১০ তলা ভবনের মালিককে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ ৭ দিনের সময় দিয়ে গেছেন ভবনের মালামাল সরানোর জন্য। এদিকে কিছু ঘরবাড়ি রেখে দিয়ে ফাঁকে ফাঁকে উচ্ছেদ অভিযান করায় স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়রা বলছেন, কাউকে কাউকে মালামাল সরানোর জন্য সময় দেয়া হলেও অন্যদের কথা শুনছে না বিআইডব্লিউ কর্তৃপক্ষ।

নদীর পাড় ঘেঁষে নীল রঙের টিনশেডের একটি ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্ট প্রতিষ্ঠানের গুদাম ছিল। এটি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। বছিলা ব্রিজ পাড় হয়ে কেরানীগঞ্জের পাশে একটি হলুদ ৩তলা ভবন ভেঙে ফেলা হয়। নদীর অধিকাংশ জায়গায় স্থাপনা করা হয়েছে। বিশেষ করে কেরানীগঞ্জের পাশে নদী দখল করে বড় বড় হাউজিং প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এগুলো উচ্ছেদ করা হবে বলে জানিয়েছে, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ।

এদিকে উচ্ছেদ অভিযানে বছিলা পেরিয়ে তুরাগ নদীর দুই পাড়েও বেশকিছু স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা একেএম আরিফ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, মঙ্গলবারও বছিলা এলাকায় অভিযান চলবে। নদীর সীমানায় যত স্থাপনা আছে, সব গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। তিনি জানান, অভিযানের ১০ দিনে সোমবার পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু বহুতল ভবন রয়েছে।

উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান রাখার দাবি : নদী বাঁচাতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কার্যক্রম বছরজুড়ে চলমান রাখার দাবির পাশাপাশি দখলকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে। সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ) আয়োজিত ‘নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদের বর্তমান-ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ দাবি জানানো হয়। সভায় সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শুধু আজ নয়, অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন নদী দখলমুক্ত করতে হবে।

এছাড়া হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে নদী দখলের ব্যাপারে একটি মামলার রায় সবসময় প্রচলিত থাকবে। কিন্তু রায়ের যে প্রতিফলন এটা আমরা সব ক্ষেত্রে দেখছি না। অনেকে নদী কিংবা খালের মালিকানা দাবি করে। তাই সুনির্দিষ্ট করে নদী ও খাল চিহ্নিত করতে হবে। নদীর কোনো ব্যক্তিমালিকানা নেই। আমি মনে করি, একটি মন্ত্রণালয় হওয়া উচিত শুধু নদী-খাল বাঁচানোর জন্য। যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, নদী দখলের কারণে আমরা নৌপথের সাশ্রয়ী ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×