পরিবার-পরিকল্পনা অধিদফতর

নিয়োগবিধিতেই পদোন্নতি আটকা

দাবি আদায়ে মাঠকর্মীদের আলটিমেটাম * ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী হয়েও বেতন পান ৪র্থ শ্রেণীর!

  ইয়াহ্ইয়া মারুফ, সিলেট ব্যুরো ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পদোন্নতি আটকা

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের কর্মচারীদের পদোন্নতি হচ্ছে না, গ্রেড পরিবর্তনও হচ্ছে না। একই পদে থেকে তাদের চাকরিজীবনের ইতি টানতে হচ্ছে। নিয়োগবিধি না থাকার অজুহাতে তারা নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এমনকি তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী হয়েও তারা চতুর্থ শ্রেণীর বেতন পাচ্ছেন! এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে নজিরবিহীন দাবি করে কর্মচারীরা আন্দোলনে যাওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের কথা থাকলেও তা এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি। নিয়োগবিধি ও পদোন্নতি হালনাগাদ করার কথা থাকলেও নিয়োগবিধি নেই। অথচ নতুন নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে নজিরবিহীন দাবি করে কর্মচারীরা আন্দোলনে যাওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছে। শুক্রবার রাজধানীতে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে এ হুশিয়ারি দেয়া হয়। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে নিয়োগবিধি বাস্তবায়ন, ১১ ও ১২তম গ্রেড প্রদান এবং দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা করা না হলে ১ জুলাই থেকে কর্মবিরতিসহ কঠোর আন্দোলনে যাবেন তারা।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সিলেট বিভাগের চার জেলায় এ অধিদফতরের এফপিআই ও এফডব্লিউএসহ প্রায় দেড় হাজার কর্মচারী আছেন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৪৫০, সুনামগঞ্জে ৩৮০, মৌলভীবাজারে ২৭০ এবং হবিগঞ্জে ৪৭৮ জন কর্মরত আছেন। কিন্তু তাদের নিয়োগবিধি হালনাগাদ করা হচ্ছে না। কবে এ নিয়োগবিধি হালনাগাদ করা হবে কর্মচারীরা তাও জানেন না। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার আবেদন ও স্মারকলিপি দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।

ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মচারীরা বলেন, একই মন্ত্রণালয়ের অধীন মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য বিভাগসহ অন্য সব বিভাগের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদের পদোন্নতির ব্যবস্থা থাকলেও তাদের নিয়োগবিধির ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের লাল ফিতায় আটকে আছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মতো তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কারণেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। কিন্তু এ কাজের মূল কারিগর এফপিআই ও এফডব্লিউওরা চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন। পরিবার কল্যাণ সহকারীদের শূন্যপদে এনজিও কর্মীদের নিয়োগ ও পরিদর্শক পদ বিলুপ্তির ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এতে কর্মচারীদের দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না বলেও তাদের অভিযোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর পরিচালক (প্রশাসন) এক চিঠির মাধ্যমে এফডব্লিউএদের ১৭তম গ্রেডে তালিকাভুক্তিকরণের উদ্যোগ নেয়ায় মাঠ পর্যায়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে। স্বাস্থ্য সহকারী (এইচএ) ১৬তম গ্রেড, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক (এএইচআই) ১৫তম গ্রেড, স্বাস্থ্য পরিদর্শক (এইচআই) ১৪তম গ্রেড, কমিউনিটি হেলথ প্রোপাইটর (সিএইচসিপি) ১৪তম গ্রেড, কৃষি বিভাগের ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মরত ব্লক সুপারভাইজাররা পদোন্নতি পেয়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (১১তম) হয়েছেন। অথচ পরিবার কল্যাণ সহকারী (এফডব্লিউএ) ১৭তম গ্রেড এবং পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক (এফপিআই) ১৬তম গ্রেডে অবস্থান করছেন। লক্ষণীয় বিষয় হল- এফডব্লিউএরা সরকারি ঘোষণামতে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী হলেও বেতন পাচ্ছেন চতুর্থ শ্রেণীর স্কেলে ১৭তম গ্রেডে। কর্মচারীদের দাবি, এফপিআইদের ১১তম গ্রেড এবং এফডব্লিউএদের ১২তম গ্রেডে পদোন্নতি দেয়া হোক। এ পদোন্নতির ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ করা না হলে তারা কঠোর আন্দোলনে যাবেন। এ ব্যাপারে প্রতিটি উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় কমিটি আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে জানা গেছে।

পরিবার পরিকল্পনা সিলেট জেলা মাঠ কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আমরা তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী হিসেবে যোগদান করলেও বেতন পাচ্ছি চতুর্থ শ্রেণীর। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবিগুলো তুলে ধরেছি। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। মাঠ কর্মচারী সমিতির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি লিয়াকত আলী যুগান্তরকে বলেন, আমরা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য অর্জন করেছি। কিন্তু আমাদের ন্যায্য দাবি আদায় হচ্ছে না। আমাদের সঙ্গে অবিচার করা হচ্ছে। দাবি আদায়ে আমরা চূড়ান্ত আন্দোলনে যেতে প্রস্তুত। সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ফিরোজ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের নিয়োগবিধি হালনাগাদ করা হচ্ছে না। পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক ও পরিবার কল্যাণ সহকারী পদের প্রায় ৩০ হাজার কর্মচারীর পদোন্নতি, বেতন গ্রেড ও সিলেকশন গ্রেড আটকে আছে। নিয়োগবিধির ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পড়ে রয়েছে। তিনি বলেন, এমন বৈষম্য অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে নেই।

সিলেট বিভাগের দায়িত্বে থাকা পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের যুগ্মসচিব মো. কুতুব উদ্দিন বলেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের কর্মরতদের নিয়োগবিধি বাস্তবায়নের কাজ চলছে। উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে নিয়োগ হওয়ায় শুরুতে বিধিমালা তৈরি হয়নি। এখন একসঙ্গে ৫০-৬০টি পদের নিয়োগবিধি তৈরি হচ্ছে। এজন্য একটু সময় লাগছে। খুব শিগগিরই নিয়োগবিধি তৈরি হবে এবং সব জটিলতার অবসান হবে।

জানা গেছে, ১৯৫২ সাল থেকে বেসরকারিভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ১৯৭৬ সালে মাঠপর্যায়ে রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে দম্পতি রেজিস্ট্রেশনের প্রচার ও কার্যক্রম শুরু হয়। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৯০ দশক পর্যন্ত কর্মচারীদের মাঠপর্যায়ে অনেক অপমান ও লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সমাজের স্রোতের বিপরীতে থাকায় অনেক কর্মীর মৃত্যুর পর একশ্রেণীর লোক জানাজায়ও আপত্তি করতেন। দেশে ১৯৭৫ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ছয় দশমিক ৩৪ শতাংশ, ২০১১ সালে নেমে দাঁড়ায় এক দশমিক তিন শতাংশ। ১৯৯০ সালে প্রতি হাজারে শিশুমৃত্যু ছিল ১৪৯ জন, ২০১৪ সালে ৩০ জন এবং বর্তমানে মাতৃমৃত্যু প্রতি হাজারে এক দশমিক ৯৪ জন। ১৯৮০ সালে শতকরা এক শতাংশ শিশু যক্ষ্মা, দুই শতাংশ শিশু হামের প্রতিষেধক গ্রহণ করত। অপুষ্টির কারণে বছরে পাঁচ লাখ শিশুর মৃত্যু এবং ভিটামিনের অভাবে বছরে ৩০ হাজার শিশু অন্ধ হতো। কিন্তু দীর্ঘ আড়াই যুগ পর স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা বিভাগের কর্মচারীদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে এমন সাফল্য এসেছে। প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি ২০০৯ সালে ৩০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×