পুলিশকে বোকা বানিয়ে ঘুরে বেড়াত টিকটিকি কামাল

  ইকবাল হাসান ফরিদ ১৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুলিশকে বোকা বানিয়ে ঘুরে বেড়াত টিকটিকি কামাল

অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজা হয়েছিল কামাল হোসেন ওরফে টিকটিকি কামালের। সাড়ে ৪ বছর সাজা খাটার পর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি।

এর এক মাসের মাথায় গুলি করে হত্যা করেন তারই প্রতিপক্ষ ভাগ্নে কবিরকে। টিকটিকি কামাল ভাগ্নে কবির হত্যামামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি। এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও ১০ বছর ধরে তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

তাকে চারবার আটক করেছে পুলিশ ও ডিবি পুলিশ। কিন্তু রাখতে পারেনি। কৌশলে পুলিশকে বোকা বানিয়ে ছাড়া পেয়ে যেতেন তিনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

১০ বছর বীরদর্পে নানা অপকর্ম করার পর ভাগ্নে কবির হত্যা মামলায় তিনি এখন পিবিআইর জালে। তিনি পিবিআইর কাছে স্বীকার করেছেন ভাগ্নে কবির হত্যার কারণ, পুলিশকে বোকা বানানো ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) প্রধান বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, সোমবার বিকালে পিবিআইর ইন্সপেক্টর কামাল হোসেন রাজধানীর কদমতলীর পূর্ব জুরাইন মেডিকেল রোডে টিকটিকি কামালকে ধরতে যান।

এ সময় তাকেও বোকা বানানোর চেষ্টা করেন তিনি। বলেন, আরে ভাই না জেনেশুনে আমাকে অ্যারেস্ট করতে এসেছেন। আমি এ এলাকার ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি। এলাকায় আমার একটা অবস্থান আছে।

ওই ভাগ্নে কবিরকে তো খুন করেছে পিস্তল কামাল। ওই কামালকে ধরেন। আমার কাছে আসছেন কেন? কিন্তু পিবিআইর এ কর্মকর্তা তার কথায় পিছু হটেননি। তাকে ধরে নিয়ে আসেন।

পরে তিনি পিবিআইর কাছে স্বীকার করেন ভাগ্নে কবির হত্যা মামলায় এর আগে পুলিশ ও ডিবি পুলিশ তাকে চারবার আটক করেছিল। ভাগ্নে কবির হত্যা মামলার আসামি আমি নই, পিস্তল কামাল, কখনও মুরগি কামাল এসব কথা বলে তাদেরকে বোকা বানিয়ে ছাড়া পেয়ে যেতেন তিনি।

পিবিআই জানায়, কদমতলী থানার পূর্ব জুরাইন মেডিকেল রোডে শাহজাহান মিয়ার ছেলে কামাল হোসেন ওরফে টিকটিকি কামাল। এলাকায় তার একটা বড় গ্রুপ রয়েছে। সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, কদমতলীসহ আশপাশের এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন বাসা ও ট্রাক টার্মিনালে টিকটিকি কামাল দলবল নিয়ে চাঁদাবাজি করতেন।

২০০৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর র‌্যাবের হাতে দুটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতার হন টিকটিকি কামাল। তার বিরুদ্ধে ডেমরা থানায় একটি অস্ত্র মামলা হয়। আদালত ওই মামলায় তাকে ১০ বছরের সাজা দেন। তিনি ওই মামলায় ৪ বছর ৫ মাস জেল খেটে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে জেল থেকে বেরিয়ে আসেন।

জানতে পারেন তার অবর্তমানে এলাকায় আধিপত্য চলে গেছে ভাগ্নে কবিরের গ্রুপের হাতে। এরপর টিকটিকি কামাল সিদ্ধান্ত নেন ভাগ্নে কামালকে সরিয়ে দেয়ার। জামিনে বেরিয়ে আসার এক মাসের মাথায় ২০০৯ সালের ১৭ জুন রাত সোয়া ৮টায় তার সহযোগীদের মাধ্যমে কবির হোসেন ওরফে ভাগ্নে কবিরকে ডেকে পাঠান কদমতলী শ্যামবাবুর ট্রাকের গ্যারেজের ভেতর। সেখানে টিকটিকি কামাল ভাগ্নে কবিরকে গুলি করে হত্যা করে।

টিকটিকি কামাল পিবিআইকে জানিয়েছেন, তার ডাকে ভাগ্নে কবির শ্যামবাবুর গ্যারেজে গেলে সেখানে টিকটিকি কামাল, রাসেল ওরফে রাজাকার রাসেল, লিটন ও জসিম উদ্দিন তার সঙ্গে চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়। একপর্যায়ে ভাগ্নে কবির ঘটনাস্থল থেকে চলে যেতে চান। এ সময় লিটন তার শার্টের কলার চেপে ধরে শ্যামবাবুর ট্রাকের গ্যারেজের ভেতর নিয়ে যান। এরপর কোমর থেকে পিস্তল বের করে ভাগ্নে কবিরের ঘাড়ে গুলি করেন। এতে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যায়।

পিবিআইর বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, কবির হোসেন ওরফে ভাগ্নে কবিরের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা গ্রামে। তার বাবার নাম আবদুল জলিল।

কদমতলী থানার ২১নং রজ্জব আলী সরদার রোডে থাকতেন তিনি। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তার পরিবারের সদস্যদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। তিনি এলাকায় একটি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করতেন।

ঘটনার রাতে পরিবারের সদস্যরা খবর পান শ্যামবাবুর ট্রাকের গ্যারেজের সামনে কে বা কারা গুলি করে তাকে হত্যা করেছে। এ বিষয়ে ভাগ্নে কামালের বড় ভাই নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে কদমতলী থানায় মামলা করেন।

মামলার তদন্ত শেষে কদমতলী থানা পুলিশ ঘটনায় জড়িত মূল আসামি কামাল ওরফে টিকটিকি কামালকে পলাতক দেখিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। কিন্তু আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য ডিবি পুলিশকে নির্দেশ দেয়।

ডিবিও মামলাটি তদন্ত শেষে অনুরূপ অভিযোগপত্র দাখিল করে। আদালত ওই অভিযোগপত্র অগ্রাহ্য করে অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশে পিবিআই, ঢাকা মেট্রো (উত্তর)-এর পুলিশ পরিদর্শক মো. কামাল হোসেন মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন। পিবিআই প্রধানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধায়ন ও দিকনির্দেশনায় পিবিআইর একটি টিম কদমতলী থানাধীন জুরাইন মেডিকেল রোড থেকে কামাল হোসেন ওরফে টিকটিকি কামালকে গ্রেফতার করে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×