সড়কে নিরাপত্তা

আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষিত

‘নির্দেশ বাস্তবায়ন না করা আদালত অবমাননার শামিল’

  আলমগীর হোসেন ২১ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিরাপত্তা

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে উচ্চ আদালত প্রতিটি গাড়িতে গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র স্থাপন, হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধ, ফুটপাত দখলমুক্ত করাসহ বেশকিছু নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এসব নির্দেশনার অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা, উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে বছরের পর বছর ধরে তা উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।

গত বছর ঢাকা বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামলে প্রায় অচল হয়ে পড়ে দেশ। এ পরিপ্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ ৫ বছরের সাজা ও ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সংসদে পাস হয়। গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর প্রগতি সরণিতে বিইউপি শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাসে ওঠার সময় পেছন থেকে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস তাকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন। এ দুর্ঘটনার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আবার রাস্তায় নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশে গত বছর ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ২২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। সমিতির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, সড়ক-মহাসড়ক ও রাস্তাঘাটের নির্মাণ ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, রেলক্রসিংয়ে ফিডার রোডের যানবাহন উঠে পড়া, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা, ফুটপাত বেদখলে থাকায় রাস্তার মাঝপথে পথচারীদের যাতায়াত প্রভৃতি কারণে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হলেও কর্তৃপক্ষ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা পালন করছে না।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ আইন বাতিল : ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ আমলের তিন বছরের শাস্তির বিধান-সংবলিত ‘সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ আইন-১৯৮৫’ বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। আদালতের এ রায়ের ফলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দায়ীদের সাজার মেয়াদ সর্বোচ্চ সাত বছরের বিধানটি বহাল থাকে। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি আরও বাড়ানো উচিত বলে মত দেন আদালত।

এক রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আদালতের নির্দেশনা প্রসঙ্গে বলেন, উচ্চ আদালত জনস্বার্থে বেশকিছু রায় দিয়েছেন। অধিকাংশ সময়ে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা পার হওয়া সত্ত্বেও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোয় আদালতের রায় বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাই এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হওয়া দরকার। কারণ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়িত না হলে তা আদালত অবমাননার শামিল।

গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র ছাড়াই চলছে গাড়ি : ২০০৭ সালের ১১ ডিসেম্বর রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ঢাকা সিটি কলেজের ছাত্রী সাদিয়া আফরিন সূচি (২২)। ‘অকালেই ঝরে গেল সূচি’ শিরোনামে পরের দিন একটি প্রতিবেদন দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত হলে স্বপ্রণোদিত হয়ে হাইকোর্ট প্রথমে রুল এবং পরে শুনানি শেষে রায় দেন।

রায়ে সারা দেশে প্রতিটি গাড়িতে গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র স্থাপনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। কিন্তু সেই রায় ঘোষণার ১০ বছরেও নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রায় প্রদানকারী সাবেক প্রধান বিচারপতি (আইন কমিশনের চেয়ারম্যান) এবিএম খায়রুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘২০০৭ সালে দৈনিক যুগান্তরের একটি রিপোর্ট আমলে নিয়ে সুয়োমটো রুল দিই। সেই রুলের রায়ে দেশের প্রতিটি গাড়িতে গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র স্থাপনের নির্দেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু তা অদ্যাবধি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।’

হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধ হয়নি : সারা দেশে বিভিন্ন যানবাহনে থাকা পরিবেশ দূষণকারী হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ঢাকার পাঁচটি এলাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকার যেসব স্থানে শব্দদূষণ বেশি হয় সেসব স্থানে পর্যবেক্ষণ টিম গঠন করে শব্দদূষণের মাত্রা নির্ধারণ ও শব্দ যাতে বেশি না হয় সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এখনও রাজধানীসহ সারা দেশে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ফুটপাত দখলমুক্ত হয়নি : ২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও বিচারকদের ট্রাফিক জ্যামের ভোগান্তি দূর করতে জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। আদালতের আদেশে জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ফুটপাত বা রাস্তার ওপর বালু, রড বা যে কোনো পণ্য রাখা বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়। পাশাপাশি ভ্যান এবং ঠেলাগাড়ি পার্কিং বন্ধ, রাস্তার পাশের ফুটপাত বা রাস্তায় দোকানের পণ্য রাখা বন্ধ, রাস্তায় ও ফুটপাতে যেন ফেরিওয়ালা, ফলের দোকান বসতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়। কিন্তু সে নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি।

এছাড়া ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ হয়নি। রাজধানীর ফুটপাতে প্রায়ই উঠে পড়ে মোটরসাইকেল। কখনও আবার পথচারীদের জায়গা ছেড়ে দিতে বিকট শব্দে হর্ন বাজাতেও দেখা যায়। এমনকি পুলিশের কোনো কোনো সদস্যকে একই কাজ করতে দেখা যায়। ২০১২ সালে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানো অবৈধ ঘোষণা করেন। সে সময় চালকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত। মোটরযান আইন ১৯৮৮ (সংশোধনী) অনুসারে, মোটরসাইকেল চালক ও যাত্রী দু’জনের মাথায় অবশ্যই হেলমেট থাকার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান, সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল বাসেত মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, উচ্চ আদালতের রায় যারা বাস্তবায়ন করছেন না তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার। তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আইন মেনে না চললে দেশে আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার বলেন, ‘নিজের জন্য হলেও আইন মেনে চলা উচিত সবার। মোটরসাইকেল চালানোর আগে অবশ্যই বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন সনদের সঙ্গে পাওয়া আইনগুলো পড়ে নেয়া উচিত। কারণ রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে জরিমানা গুনতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করা বিষয়টি আসলে মাছি তাড়ানোর মতো। সকালে দখলমুক্ত করলে বিকালে আবার দখলে চলে যায়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×