একাত্তরের গণহত্যা

ঢাবিতে হত্যাযজ্ঞ নজিরবিহীন

শহীদ চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারীর সন্তানরা প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চান

  শিপন হাবীব ২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাত্তরের গণহত্যা

একাত্তরে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী দেশজুড়ে নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী যে গণহত্যা চলেছে তার মধ্যে বাংলাদেশের গণহত্যার পরিধি ও মাত্রিকতা নজিরবিহীন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় তা ছিল চরম নির্মম, বর্বর ও পাশবিক। ওই রাতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা আজও হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় ১৯৫ জনের নাম আছে; যাদের মধ্যে জগন্নাথ হলের ৬৬ জন। এদের পরিচয় পাওয়া গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওয়্যারলেসের সংলাপেও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনশ’ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের ওই অভিযান চলেছে ২৫ মার্চ (দিবাগত) মধ্যরাত থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত। এ অভিযানের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মানুষ হত্যা। তাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ সব আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ত্যাগ আর নেই। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, তাদের অনেকে যথাযথ মূল্যায়ন ও সাহায্য সহযোগিতা পায়নি।

জগন্নাথ হলে সেদিন যারা শহীদ হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ৬৬ জনের পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের নামের তালিকা উৎকীর্ণ আছে হলের মাঠে গণকবরের জায়গায় তৈরি একটি নামফলকে। সম্প্রতি এ গণকবরটি আধুনিকায়ন করে অত্যাধুনিক একটি ‘গণকবর স্মৃতিসৌধ’ তৈরি করা হচ্ছে। এর আগে অবহেলিত একটি গণকবর ছিল এটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক রতন লাল চক্রবর্তীর সম্পাদনায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা : ১৯৭১ জগন্নাথ হল’ বইতে বলা হয়েছে- ওই রাতে সেখানে গণহত্যার শিকার হন চারজন শিক্ষক, ৩৬ জন ছাত্র এবং ২১ জন কর্মচারী ও অতিথি।

জগন্নাথ হলে হত্যাযজ্ঞের সময় মাঠের দক্ষিণ কোণে এক প্রকার ঝুঁপরি ঘরে বাস করতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী মনভরণ রায়। ২৫ মার্চ সকালে ৩০-৩৫ জনের সঙ্গে মনভরণ রায়কেও ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে পাকিস্তানি আর্মিরা। রোববার তার স্ত্রী রাজকুমারী রায়ের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। রাজকুমারী রায় জানান, ১৯৭১ সালে তার বয়স প্রায় ২৫ বছর। স্বামীর সঙ্গে জগন্নাথ হলের কর্মচারী কলোনিতেই থাকতেন। ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টা, ১১টার দিকে বিকট শব্দে গোলাগুলির শব্দে পুরো হল কাঁপছিল।

রাত আড়াইটার দিকে ১০-১২ জন আর্মি তাদের ঘরে ঢুকে সবাইকে সারা রাত জিম্মি করে রাখে। ভোরে স্বামী মনভরণ রায়কে মারধর করে বের করে নেয়। সকাল পর্যন্ত স্বামীসহ অনেককে দিয়ে লাশ কুড়ানো হয়। সকাল ১০টার দিকে স্বামীসহ ৩০-৩৫ জনকে লাশের স্তূপের পাশে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়।

শহীদ মনভরণ রায়ের ছেলে বিন্দু রায় জানান, বাবা শহীদ হয়েছেন, আমরা গর্ব করি। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই অনেক কষ্টে আমাদের জীবন যাচ্ছে। শহীদ পরিবার হিসেবে যে রকম সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার কথা, তার কিছুই মেলেনি। দুই মাস আগে জীর্ণ জগন্নাথ কর্মচারী কোয়ার্টার থেকেও তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। এখন পুরান ঢাকায় ভাড়া বাসায় মা, স্ত্রী-সন্তান, বোনদের নিয়ে থাকছেন। স্বাধীনতার এত বছর পরও তাদের একটি মাথাগোঁজার ঠাঁই হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিন্দু রায়।

অরুণ কুমার দে জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স প্রায় ১১ বছর। ২৫ মার্চ রাতে তারা ঘুমিয়েছিলেন হলের আবাসিক কোয়ার্টারে। রাত ১২টার দিকে প্রচণ্ড গুলি ও গোলার শব্দে জেগে উঠেন। একের পর এক আগুন লাগাচ্ছিল আর্মিরা। মানুষের আর্তচিৎকার, বাঁচাও বাঁচাও করছিল। ভোরবেলা তাদের বাসায় ঢুকে ১২-১৩ জন পাকিস্তানি আর্মি। তারপর এক-এক করে ভাই-ভাবিদের নির্মমভাবে হত্যা করার পর বাবাকে ব্রাশফায়ার করে। কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন অরুণ কুমার।

তিনি জানান, ওই দিন ভোরে পাকিস্তানিদের গুলিতে তার চোখের সামনেই মা যোগমায়া, সদ্যবিবাহিত বড় ভাই রণজিৎ ও ভাবি রীনা রানীকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে লাশ রেখে চলে যায়। অসুস্থ বাবা (মধুসূদন দে) তখন লুকিয়ে ছিলেন। ঘণ্টাখানেক পর পাকিস্তানিরা আবার ফিরে এসে বাবাকে ধরে নিয়ে জগন্নাথ হলের মাঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী, শিক্ষক অনেকের সঙ্গে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে।

হত্যাযজ্ঞের প্রতক্ষ্যদর্শী সুনীল কুমার দাস। ওই সময় তিনি জগন্নাথ হলের ক্যান্টিনে কাজ করতেন। তিনি জানান, ওই রাতের পরদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞের কথা স্মরণ হলেই তিনি ঠিক থাকতে পারেন না। ভয় আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে উঠেন। ২৫ মার্চ রাতে হত্যাযজ্ঞের সময় প্রাণ বাঁচাতে তিনিসহ আরও ৪-৫ জন কর্মচারী একটি মলমূত্রের ড্রেনে লুকিয়ে ছিলেন। পরদিন ভোরে তারা পালিয়ে যান। ভোরে দেখতে পেয়েছেন, হলজুড়ে যেন মানুষের লাশ আর লাশ। এসব লাশ একত্রে করে কবর দেয়া হয়।

এ গণহত্যা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক দেলোয়ার হোসেন জানান, রাতে পাকবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল, রোকেয়া হলে ঢুকে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়।

শহীদ পরিবারের সন্তান রাম চন্দ্র রায় জানান, তার বাবা দাসু রায় উপাচার্য ভবনের বাগানে মালির কাজ করতেন। পরিবার নিয়ে থাকতেন জগন্নাথ হল কর্মচারী কোয়ার্টারে। ওই রাতে তার বাবাকে দিয়েও শহীদদের লাশ একত্রিত করা হয়েছিল। পরে ব্রাশফায়ারে তার বাবাকেও হত্যা করা হয়। তিনিসহ দুই বোন রয়েছেন। মা লক্ষী রায় ১৯৮৫ সালে মারা যান। এখন তাদের মাথাগোঁজার ঠাঁই নেই। তিনি বলেন, আমরা শুধু একটিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাই।

শহীদ সুশীল চন্দ্র দে’র ভাই কানাই রঞ্জন দে শহীদ ভাইয়ের ছবি নিয়ে প্রায়ই কাঁদেন। রোববার জগন্নাথ হল মাঠে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, তার ভাই এ হলের কোয়ার্টারে মামার সঙ্গে থাকতেন। ২৫ মার্চ ভোরে তার ভাইকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। তিনিসহ পরিবারের সদস্যরা ওই দিন দুপুরের দিকে লাশের স্তূপে ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করতে পারেননি। শহীদ সুনীল চন্দ্র দাশের স্ত্রী বকুল রানী দাশ জানান, তার স্বামী জগন্নাথ হলের দারোয়ান ছিলেন। ২৬ মার্চ তার স্বামীকে মাঠে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়েছে।

২৫ মার্চ রাতে গোলাগুলি শুনে তাকেসহ দুই সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন একটি হলরুমে। ভোরে পাকিস্তানি আর্মি হলরুমে ঢুকে স্বামীকে ছিনিয়ে নেয়। সকালে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। ওই রাতে প্রাণে বেঁচে যাওয়া যুদ্ধাহত রবীন্দ্র মোহন দাশ জানান, ২৬ মার্চ সকালে তার সামনে ২৫ জনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। তাকে রাইফেল দিয়ে মারাত্মক আঘাত করে। পরে তাকেসহ আরও ৩-৪ জনকে বেঁধে একই ঝুঁপরিতে রেখে দেয়। ওখান থেকে সে পালিয়ে যায়। এক সঙ্গে ওঠা-বসা শহীদ সহকর্মীদের মৃত্যু তাকে তাড়া করে বেড়ায় এখনও।

ওই রাতে শুধু জগন্নাথ হলেই নয়, ইকবাল হল, রোকেয়া হলে ঢুকেও নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি আর্মি। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে নির্বিচারে ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক-কর্মচারীদের গণহত্যার ঘটনার নজির নেই। রঙ্গলাল সেনসহ তিনজনের সম্পাদিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান বইটিতে বলা হয়েছে, ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত পাকিস্তান আর্মি হত্যাযজ্ঞ চালায়।

ওই সময় জহুরুল হক হলের মূল ভবনের সিঁড়িতে নিহত ছাত্র যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে ৯ জন রয়েছে। রোকেয়া হলের একটি কক্ষে ছয়টি মেয়ের লাশ পা বাঁধা ও নগ্ন অবস্থায় পাওয়া যায়। এছাড়া রোকেয়া হল চত্বরে সপরিবারে হত্যা করা হয় হলের কর্মচারী আহমেদ আলী, আবদুল খালেক, নমি, মো. সোলায়মান খান, মো. নুরুল ইসলাম, মো. হাফিজুদ্দিন ও মো. চুন্নু মিয়াকে।

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে ঢুকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেখানকার চার কর্মচারী, সলিমুল্লাহ হলে ঢুকে সেখানকার ১২ জন ছাত্র, ফজলুল হক হলের সাতজন, সূর্য সেন হলের সাতজন এবং মুহসীন হলের ১০ জন ছাত্রকে হত্যা করে। এর বাইরে ২৬ মার্চ সকালে গুরুদুয়ারা নানক শাহী, শিব ও কালীমন্দিরে ঢুকে সেখানকার পুরোহিতদের গুলি করে হত্যা করা হয়। ২৭ মার্চ রমনা কালীমন্দিরে ২৭ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ পরিবার কল্যাণ সমিতির সভাপতি আলহাজ মিন্নত আলী যুগান্তরকে জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীর প্রায় ২শ’ শহীদ পরিবারের সদস্য রয়েছেন এ সমিতিতে। চতুর্থ শ্রেণীর ২০-২৫ জন শহীদ পরিবারের সন্তান খুবই কষ্টে জীবন চালাচ্ছেন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে বহুবার পত্রের মাধ্যমে বলেছি- আমাদের দুঃখ-কষ্টের কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে শেয়ার করতে চাই, দেখা করতে চাই। তারা প্রতিবারই আশ্বাস দিয়েছে, প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কিন্তু আজও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়নি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×