দু’পা হারিয়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর রুবিনা

স্বপ্ন ছিল শিক্ষা ক্যাডার হওয়ার

  শিপন হাবীব ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রুবিনা আক্তার। বয়স ২২ বছর। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সমাজকর্ম বিভাগের চতুর্থ বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারে পড়াশোনা করছেন। মেধাবী এ শিক্ষার্থী বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মৃত্যু শয্যায়। ২৮ জানুয়ারি কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের ইঞ্জিনের নিচে পড়ে দু’পা হারান। রুবিনার স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস দিয়ে নামকরা শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা হবেন। আলোকিত করবেন নিজের জীবনকে। আলো ছড়াবেন মানুষের মাঝে। হাসি ফোটাবেন মা-ভাই ও প্রতিবন্ধী বোনটির মুখে। রুবিনা খুব মেধাবী ছাত্রী। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় প্রথম সারিতে ছিলেন। এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ (গোল্ডেন) পেয়েছেন। কিন্তু ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তার জীবন প্রদীপ হারিয়ে যেতে বসছে। আলোর বদলে শুধুই অন্ধকার দেখছে দরিদ্র পরিবারের এ মেয়েটি। একটু উপশমের জন্য হাসপাতাল বেডে হা-হুতাশ করছেন।

দরিদ্র পরিবারের এ শিক্ষার্থী রুবিনা আক্তারের স্বপ্ন পূরণ করতে রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদানসহ তার চিকিৎসা ও কৃত্রিম পা লাগানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন। অন্যদিকে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ জন শিক্ষক। প্রতি মাসে কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা করে এক একজন শিক্ষক দেবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, রুবিনাকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দেবেন। তার সহযোগিতায় ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর দরখাস্ত করবেন। রেলমন্ত্রীর সহযোগিতা, শিক্ষকদের উদ্যোগ আর শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার কথা শুনে রুবি শুধু কাঁদেন। কাতর কণ্ঠে বারবার বলে ওঠেন, ‘তোমরা আমাকে বাঁচাও, আমি শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হব।’ আবার কিছুক্ষণ পরপর বলছেন, তার কিছু হয়ে গেলে দুঃখী মা, প্রতিবন্ধী বোন আর ছোট ভাইটির কি হবে। এমন আকুতি আর প্রশ্ন করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েন রুবিনা আক্তার। রুবিনার বাবা ২০১৪ সালে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। হতদরিদ্র রুবিনা আক্তার রাজধানীর সদরঘাট এলাকার একটি জরাজীর্ণ মেসে থেকে পড়াশোনা করছিলেন। তার গ্রামের বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই, নেই একটি টিউবওয়েলও। চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে তার পরিবার। রুবিনা তার জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার জন্য প্রতিদিন ৩-৪টি প্রাইভেট পড়াতেন। মেস ভাড়া, খাবার ও পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে মা ও প্রতিবন্ধী বোনের খরচ প্রতি মাসে বাড়িতে পাঠাতেন। একমাত্র ছোট ভাই রুবেল রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। রুবেলের খরচ রুবিনা আক্তারই দিচ্ছেন।

রোববার দুপুরে ঢামেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পা হারা রুবিনা আক্তার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। স্বপ্ন পূরণ আর পরিবারের চিন্তায় এদিক-ওদিক তাকিয়ে কি যেন বলতে চাচ্ছেন। বেডের পাশেই দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা আর সাহস জোগাতে নানা গল্প বলছিলেন তার মা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। এক শিক্ষার্থী বলেন, রংপুর থেকে তার ভাই রুবেল তাকে দেখতে আসতে চাচ্ছে। ওখানে তার ভাই তার জন্য কাঁদছে। এমনটা শুনে রুবিনা আক্তার বলে ‘না না, এখন আসার দরকার নেই, সামনে রুবেলের পরীক্ষা। পড়াশোনার ক্ষতি হবে। প্লিজ তোমরা রুবেলকে আসতে দিও না। আমার এ অবস্থা দেখলে সে খুব কষ্ট পাবে। পড়াশোনায় মন বসবে না। জানি না, আমার কি হয়। আমার স্বপ্ন তো এখন আমার ভাই (রুবেল) পূরণ করবে। এরপর রুবিনা কাঁদতে শুরু করেন। রুবিনাকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রতি মাসে বৃত্তি হিসেবে ২৫০০ টাকা করে দিত। কিন্তু গত ডিসেম্বর মাস থেকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক বৃক্তি দেয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর রুবিনা সংসার ও লেখাপড়া চালিয়ে যেতে আরও টিউশনি খুঁজতে শুরু করেন। মেসে থাকা তার রুমমেট হিমা আক্তার বলেন, এমন এক মেধাবী ছাত্রী শুধু অর্থের জন্য সারাদিন টেনশন করতেন। মা-বোন আর ভাইয়ের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠতেন। সংসারের খরচ চালিয়ে যেতে সে প্রায়ই না খেয়ে থাকতেন।

রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এমন মেধাবী ছাত্রীর জীবন ধ্বংস হতে পারে না। ধ্বংস হতে দেয়া যায় না। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ট্রেনের ইঞ্জিনের নিচে দু’পা হারানো রুবিনাকে সাধ্যমতো সবই সাহায্য করব। তাকে সুস্থ করে কৃত্রিম পা লাগানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি তাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছি, খুব কষ্ট হয়েছে আমার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে, তার সব ধরনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে। আশা করি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সব ধরনের সহযোগিতা করবে। এছাড়া তার চিকিৎসার জন্য নগদ ২ লাখ টাকাও দিয়েছেন রেলপথমন্ত্রী। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, রুবিনা খুব মেধাবী ছাত্রী। সে পড়াশোনা দিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মন জয় করেছে। তার দুর্ঘটনায় আমরা মর্মাহত। ইতিমধ্যে তাকে সহযোগিতা ও উন্নত চিকিৎসায় একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। অ্যাকাউন্টটি হল এমডি আবুল হোসেন ও রুবিনা আক্তার, হিসাব নং-১৩৬১৫১৭৪৩৮৮ ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, পুরান ঢাকা নয়াবাজার শাখা, ঢাকা। তার পরিবার তার উপার্জনে চলত, ভাইয়ের পড়াশোনা চলত জানিয়ে অধ্যাপক আবুল হোসেন বলেন, তাকে আর্থিক সহযোগিতার জন্য এ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। তিনি বলেন, তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ জন শিক্ষক দেড় বছর ৫ হাজার টাকা করে দেবেন। রেলপথমন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রুবিনা আক্তারের মা রহিমা বেগম বলেন, আমার মেয়েই আমাদের অভিভাবক। হে আল্লাহ আমি ভিক্ষা করে খাব, তুমি আমার মেয়েকে ভালো করে দাও। আমার মেয়ে কুপির আলোতে পড়েছে, বাড়িতে একটি টিউবওয়েলও নেই। খেয়ে না খেয়ে পড়া আমার মেয়ে আজ জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। মানুষের সহযোগিতায় আমার মেয়ে বাঁচবে, পড়াশোনা করবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter