১০৭ কারণে সড়কে ঝরছে তাজা প্রাণ

১৩ বছরে নিহত ৬৮ হাজারের বেশি * নিরাপদ নয় ফুটপাতও

  ইকবাল হাসান ফরিদ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন নতুন নাম। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে পঙ্গুর সংখ্যাও কম নয়। মহাসড়কের পাশে ফুটপাত নির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেই। আর শহরের ফুটপাতগুলোর অধিকাংশই বেদখল। তাছাড়া ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়াও নিরাপদ নয়। সড়ক থেকে গাড়ি উঠে যাচ্ছে ফুটপাতে। মারা যাচ্ছেন পথচারীরা। যাত্রীকল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন সংস্থার জরিপে জানা গেছে, গত ১৩ বছরে সড়কে ৫৯ হাজার ৯৪১টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬৮ হাজার ৪০৪ জন। ওই সময়ে আহত হয়েছেন ২ লাখ ১৪ হাজার ৮৭০ জন। যাদের ৬০ ভাগই হাত-পা বা অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হারিয়েছেন। এর কারণ হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে ১০৭টি কারণকে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালটির জরুরি বিভাগের মোট রোগীর ৫৬ শতাংশই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। হাসপাতালের শয্যাগুলোর ২৫ থেকে ৩০ শতাংশই সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত রোগী থাকেন। এছাড়া দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ৬০ শতাংশই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। যাদের বয়স ১৬ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। এর ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু ব্যক্তির জীবনহানিই ঘটে না বরং পারিবারিক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। সমাজ ও প্রতিষ্ঠান তার অবদান থেকে বঞ্চিত হয়। ২০ শতাংশের বয়স ১৬ বছরের নিচে।

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের জরিপ বলছে, সারা দেশে শহরাঞ্চলে মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৭৪ শতাংশই ঘটে রাজধানীতে। চালকের বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন এবং যাত্রী সাধারণের অসচেতনতাই দুর্ঘটনার মূল কারণ বলে মনে করেন দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞরা। বুয়েটের জরিপ বলছে, সারা দেশে যত দুর্ঘটনা ঘটে এর মধ্যে শুধু রাজধানীতেই ঘটে ২০ শতাংশ। আর শহরাঞ্চলের দুর্ঘটনার মধ্যে ৭৪ শতাংশই ঘটে ঢাকায়। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ যুগান্তরকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ঢাকা শহরটা খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। পথচারীরা ফুটপাত ব্যবহার করতে পারছেন না। তারা রাস্তায় নেমে হাঁটছেন। রাস্তায় অতিরিক্ত গাড়ির চাপও রয়েছে। এতে দুর্ঘটনা ঘটে যায়। নিরাপদ চালক তৈরির পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বেপরোয়া চালানোর কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে।

এর কারণ হিসেবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আমরা সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে ১০৭টি কারণকে চিহ্নিত করেছি। এর মধ্যে অন্যতম হল- ফুটপাত দখল, ওভারটেকিং, ওভারস্পিড ও ওভারলোড, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, রাস্তাঘাটের নির্মাণ ত্রুটি, গাড়ির ত্রুটি, অসতর্কতা, ট্রাফিক আইন না মানা, গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ক্রসিংয়ে জেব্রা ক্রসিং না থাকা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলা, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো এবং মহাসড়ক ক্রসিংয়ে ফিডার রোডের যানবাহন উঠে যাওয়া, চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, বাসের ছাদে ও পণ্যবাহী ট্রাকের ওপর যাত্রী বহন উল্লেখযোগ্য। নিরাপদ সড়ক চাই-নিসচা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার হার কমাতে হলে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। আমরা স্কুল-কলেজে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি।

সড়কে ১৩ বছরে নিহত ৬৮ সহস্রাধিক : দেশের বিভিন্ন সড়কে দুর্ঘটনায় গত ১৩ বছরে ৬৮ হাজারেরও বেশি লোকের প্রাণহানি হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী- ২০১৭ সালে সারা দেশে চার হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৯৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ১৯৩ জন। তাদের মধ্যে হাত, পা বা অন্য কোনো অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন এক হাজার ৭২২ জন। ২০১৬ সালে সারা দেশে চার হাজার ৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ছয় হাজার ৭ জন। আহত হয়েছেন এক লাখ পাঁচ হাজার ৯১৪ জন। দেশের বিভিন্ন সড়কে ২০১৫ সালে ৬ হাজার ৫৮১টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৮ হাজার ৬৪২ জন নিহত হন। আহত হন ২১ হাজার ৮৫৫ জন। এর আগে ২০১৪ সালে সড়কে ৫ হাজার ৯২৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৮ হাজার ৫৮৯ জন। আহত হন ১৭ হাজার ৫২৪ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম গাড়ি ব্যবহার করেন বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশের প্রতি হাজার মানুষের বিপরীতে যান্ত্রিক যানের সংখ্যা মাত্র দু’টি। অথচ সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি গাড়ি ব্যবহার করেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। প্রতি ১ হাজার মার্কিন নাগরিকের মধ্যে গাড়ির সংখ্যা ৭৬৫টি। অথচ ওই দেশে বছরে প্রতি ১০ হাজার গাড়িতে মৃত্যুর হার মাত্র দু’জন। গাড়ির সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নিউজিল্যান্ড। সেখানে প্রতি ১ হাজার নাগরিকের মধ্যে গাড়ির সংখ্যা ৫৬০টি আর প্রতি ১০ হাজার গাড়িতে বছরে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ৩ দশমিক ৩ জন। বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার সবচেয়ে কম যুক্তরাজ্যে। সেখানে প্রতি ১০ হাজার গাড়িতে বছরে মারা যান মাত্র ১ দশমিক ৪ জন। আর প্রতি হাজার নাগরিকের গাড়ির সংখ্যা ৪২৬টি।

pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

mans-world

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter