কক্সবাজারে পাসপোর্ট পুলিশ ভেরিফিকেশনে নাজেহাল

  শফিউল্লাহ শফি, কক্সবাজার ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাসপোর্ট তদন্ত ও ভিসা নিয়ে বিদেশ যাওয়ার আগে পুলিশের তদন্ত রিপোর্টের নামে গ্রাহকদের চরমভাবে আর্থিক হয়রানি করছে ডিএসবি পুলিশ। তাদের রোষানলে পড়ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাসপোর্টের তদন্ত রিপোর্ট ও পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রার্থীরা। এছাড়াও কনস্টেবল দিয়ে পাসপোর্ট ও পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট তদন্ত করানোর কারণে গ্রাহকরা নানাভাবে নাজেহাল হচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের মতে, বর্তমান ডিএসবির কার্যক্রম অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। পুরো জেলায় ডিএসবির ধান্ধাবাজি নিয়ে চলছে সমালোচনা।

সরেজমিন ডিএসবি অফিসে গিয়ে এবং একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি পাসপোর্ট কিংবা পুলিশ প্রতিবেদনের জন্য প্রথম দফায় নিজ নিজ উপজেলায় কর্মরত পাসপোর্ট তদন্তকারী ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স প্রদানকারী কর্মকর্তা কনস্টেবলরা গ্রাহক/রিপোর্ট প্রার্থীদের কাছ থেকে ন্যূনতম ৩ হাজার থেকে শুরু করে ১০-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করার অভিযোগ উঠেছে। যদি কেউ টাকা দিতে একটু গড়িমসি করে তাহলে তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করে পুলিশ। নানা অজুহাত ধরে বসে। ওই কনস্টেবল কখনও হয়ে যায় বয়স নির্ধারণের বিশেষজ্ঞ। চেয়ারম্যান কিংবা মেয়রের জাতীয় সনদ বা জন্ম নিবন্ধন কার্ডে সঠিক জন্ম তারিখটা নিয়েও সৃষ্টি করে নানা ঝামেলা। কখনও বলে বয়স কমিয়ে দিয়েছ, পাসপোর্ট হবে না। আবার কখনও বলে ৬০ কেজি ওজন, বয়স দিয়েছ ৩০; পাসপোর্ট হবে না। তবে সব কথার শেষ কথা হল ‘আপস’ করতে হবে। কাগজপত্র যাই থাকুক না কেন। কয় টাকা দেবেন বলেন? যারা কনস্টেবল নামে তদন্তকারী বড়কর্তার চাহিদা পূরণ করতে পারছেন, তারা প্রথম দফায় রক্ষা পাচ্ছেন। তবে নগদ টাকায় প্রথম দফায় রক্ষা পেলেও দ্বিতীয় দফায় পুনরায় পড়তে হয় ডিএসবি অফিসের আরেকজনের হাতে। সেখানেও রফাদফা শেষ করে প্রতি রিপোর্টে দিতে হয় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ।

এদিকে ডিএসবির পাসপোর্ট তদন্ত ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের নামে বেপরোয়া বাণিজ্যের ব্যাপারে শহরতলীতে দায়িত্বরত পাসপোর্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা কনস্টেবল মতিউল জানান, পাসপোর্ট তদন্তের জন্য যে টাকা আমরা গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করি ওই টাকার আংশিক ভাগ আমরা পাই। সিংহভাগ কোথায় যায় এটা ডিআইওয়ান সাহেব জানেন। এমন বক্তব্য শুনে মতিউলের বরাত দিয়ে ডিআইওয়ানের কাছ থেকে বিষয়টি জানব কিনা- জানতে চাইলে মতিউল বলেন, জানলে কোনো সমস্যা নেই। কারণ উনি তো টাকা ছাড়া পাসপোর্ট তদন্ত রিপোর্টে স্বাক্ষরই করেন না। জানলে অসুবিধা কোথায়। মতিউলের মতো যারা মাঠে-ময়দানে পাসপোর্ট কিংবা পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে কাজ করে তাদের অধিকাংশের বক্তব্যই একই রকম। কনস্টেবল মতিউলের বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। শহরতলীর জানারঘোনার সুলতান আহমদের ছেলে ছালামত উল্লাহ বাদশার পাসপোর্ট তদন্ত রিপোর্টয়ের জন্য তার কাছ থেকে আদায় করা হয় নগদ সাড়ে ৪ হাজার টাকা।

সরেজমিন গেলে মহেশখালীর নুরুল আলম অভিযোগ করেন, কাগজপত্র সব কিছু ঠিক থাকলেও ডিএসবি পুলিশ কামরুলকে ৩ হাজার টাকা দিয়ে নিতে হয়েছে পুলিশ তদন্ত রিপোর্ট। একই অভিযোগ মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা রহমত উল্লাহর ছেলে মোহাম্মদ আরমান উদ্দিনের। তিনি ৫ সেপ্টেম্বর একটি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। যার সিরিয়াল নং-১৮০০৯৮। কিন্তু সরকারি নির্ধারিত টাকা ব্যাংকে জমা দেয়ার পর তদন্তের নামে শুরু হয় পুলিশি হয়রানি। তদন্ত কর্মকর্তার নানা হয়রানির পর শেষ পর্যন্ত তাকে ঘুষ দিয়ে পাওয়া গেছে পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট। একই অভিযোগ করেন টেকনাফ উত্তর লঙ্গার বিলের ২নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মিয়া হোছনের ছেলে জাফর আলম। পাসপোর্ট আবেদনের নাম্বার ১৭৮৮৬৩। চকরিয়া উপজেলার বানিয়াছড়ার ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছালে আহম্মদের ছেলে আবদুস ছামাদ ১৪ আগস্ট একটি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করে, যার নাম্বার ৪৭২৩১৭। চকরিয়া ডিএসবি পুলিশকে আড়াই হাজার টাকা দেয়ার পর পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেয়া হয়। ৪ সেপ্টেম্বর পুলিশ সুপার কার্যালয়ে জমা পড়ে। সেখানে ফাইল জমা হয়েছে কিনা, তা দেখতেও নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

জরুরিভিত্তিতে (৭২ ঘণ্টা) পাসপোর্ট আবেদনকারীরও এ হয়রানি থেকে পরিত্রাণ নেই। এক্ষেত্রে পুলিশের রিপোর্ট ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেয়ার কথা বলা থাকলেও ১০ দিনেও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় নজরানার কাছে ফাইল বন্দি হয়ে থাকে মাসের পর মাস। পাসপোর্ট করতে গিয়ে এসব ঘুষ বাণিজ্যের প্রতিকার চেয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

ডিএসবির দায়িত্বরত ডিআইওয়ান কাজী দিদারুল ইসলাম বলেন, মূলত পাসপোর্ট কনস্টেবল তদন্ত করে না। তারা বাসাবাড়িতে গিয়ে তথ্য আনে। পরে অফিসাররা তদন্ত করে। টাকা আদায়ের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে ডিআইওয়ানের বরাত দিয়ে প্রত্যেক পাসপোর্ট গ্রাহক থেকে কনস্টেবল কর্তৃক টাকা আদায়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটাও তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা করা হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

E-mail: [email protected], [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter