ইলেকট্রিক বার্নে পঙ্গু হচ্ছে শত শত শিশু

বিদ্যুতের ঝাঁকুনিতে চুরমার হয়ে যায় হাড় * বার্ন ইউনিটের ২৫ শতাংশ ইলেকট্রিক বার্নের রোগী

  শিপন হাবীব ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক লাইন, ত্রুটিযুক্ত বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা ও বাড়ি-ঘরে অনিরাপদ বিদ্যুৎ সংযোগে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। অসাবধানতায় ঘটছে ইলেকট্রিক বার্ন (বৈদ্যুতিক শক)। কোমলমতি শিশুরা না বুঝে বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে গিয়ে হারাচ্ছে মূল্যবান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। সচেতনতার অভাবে ইলেকট্রিক বার্নে প্রতি বছর দেশে শত শত শিশু পঙ্গু হচ্ছে।

শৈশব পার হওয়ার আগেই অঙ্গহীন হয়ে পড়া শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ ঢেকে যাচ্ছে নিকষ কালো অন্ধকারে। বেঁচে থাকা পঙ্গু শিশু পরিবার তথা সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে গোটা পরিবার। কখনও প্রিয় সন্তানের মুখ চেয়ে বসতভিটাও তারা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল বার্ন ইউনিটিতে গিয়ে ইলেকট্রিক বার্নে জ্বলসে যাওয়া অর্ধশতাধিক শিশু ও তাদের পরিবারের করুণ চিত্র চোখে পড়ে। অঙ্গহীন শিশুদের চিকিৎসা নিয়ে তাদের পরিবারের সামনে এখন শুধুই অন্ধকার। বুকচাঁপা কান্না যেন তাদের একমাত্র সম্বল।

চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা জানান, বার্ন ইউনিটে আসা মোট রোগীর ২৫ শতাংশ হচ্ছে ইলেকট্রিক বার্নের রোগী। জাতীয় বার্ন ইউনিটের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. সামন্তলাল সেন জানান, ইলেকট্রিক বার্নের শিকার ব্যক্তিদের বিশেষ করে শিশুদের অবস্থা ভয়াবহ হয়। বিদ্যুতের ঝাঁকুনিতে শিশুদের হাড় চুরমার হয়ে যায়। বিশেষ করে হাতের হাড় গুঁড়া হয়ে যায়। কখনও কখনও হাড়গুলো পুড়ে পাউডারের মতো হয়ে যায়। ফলে, চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকেরই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলতে হয়। রোগীকে বাঁচাতে গিয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কেটে ফেলতে হয়। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবহার ও বিতরণ ব্যবস্থা সম্পর্কে আরও সচেতন হতে হবে। এজন্য আরও সচেতনতামূলক প্রচারের প্রয়োজন। কোনো অবস্থাতেই লোকালয়ের ভেতরে ও বাড়ি-ঘরের খুব কাছ দিয়ে ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক তার থাকা ঠিক নয়। বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বহীনতা আর সাধারণ মানুষের অসচেতনতায় ইলেকট্রিক বার্নের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রায় দুই মাস ধরে বার্ন ইউনিটের পঞ্চম তলার বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছে ১২ বছর বয়সী মো. রিয়াদ হোসেন। ইলেকট্রিক বার্নে তার স্বপ্ন আজ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত। ইতিমধ্যে তার দুটি হাত কনুইয়ের উপর থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। তার স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে বড় আলেম হবেন। ওয়াজ করবেন। নিজে আলোকিত হবেন, অন্যদের মাঝে ইসলামের আলো ছড়াবেন। শুক্রবার কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বাসিন্দা শিশু রিয়াদ ও তার মায়ের সঙ্গে কথা হয়। মা ডলি বেগম জানান, স্থানীয় মাদ্রাসার ছাদ ঘেঁষা বিদ্যুতিক তার একমাত্র সন্তান রিয়াদের জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। শুধু হাত নয়, ছেলের পায়ের অবস্থাও খারাপের দিকে যাচ্ছে।

বার্ন ইউনিটের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে দেখা গেছে, রিয়াদের মতো আরও অনেক শিশু ইলেকট্রিক বার্নের শিকার হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। অনেক শিশু যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। অনেক শিশু শুধু নীরবে কাঁদছে। কারও এক হাত, কারও দুই হাত কাটা। কারও আবার পায়ের কব্জি পর্যন্ত কাটা। এখানে কেউ ৬-৭ মাস ধরে চিকিৎসা নিচ্ছে। কারও ব্যান্ডেজ ভিজে গাঢ় কালচে হয়ে পড়েছে।

মাদারীপুর থেকে আসা রাজুর বাম হাত কেটে ফেলা হয়েছে। ডান হাতটি রক্ষা করতে পেটের সঙ্গে সেটি ব্যান্ডেজ করে রাখা হয়েছে। যন্ত্রণার ছাপ তার চোখেমুখে। শিশু সামিরকে (৮) নিয়ে মা সুমি আক্তারের হতাশায় দিন কাটছে। তিনি শুধুই হা হুতাশ করছেন। সামিরের দুই হাত, পা ও বুক পুড়ে গেছে। কোন অঙ্গ কাটতে হবে তা তিনি জানেন না।

১২ বছর বয়সী অভির মা আক্তারী বেগম জানান, চোখের সামনে তিনি ইলেকট্রিক বার্নের রোগীদের দেখছেন। শিশুদের বাঁচিয়ে রাখতে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে ফেলা হচ্ছে। নিজের সন্তানের কোনো অঙ্গ কাটতে দেবেন না বলে জানিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। শিশু রোগীদের স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যুতের তার কেন ঝুলে থাকে এবং আবাসিক ভবনের ছাদ ঘেঁষে লাইন টানা হয়। এ ব্যাপারে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের সতর্ক হওয়া উচিত। শত শত মানুষ বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা যাচ্ছেন কিন্তু কর্তৃপক্ষ কিছুই করছে না।

বার্ন ইউনিটের পরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম জানান, ইলেকট্রিক বার্নে প্রতিদিনই রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। যাদের মধ্যে শিশু ও শ্রমিক শ্রেণীর লোক বেশি। ইলেকট্রিক বার্নে মারাÍক মাংস ও পেশিসহ কখনও কখনও হাড় পর্যন্ত এবড়ো-খেবড়ো হয়ে যায়। ফলে বিশেষ করে শিশুদের আক্রান্ত স্থান, হাত কিংবা পা কেটে ফেলতে হয়। তিনি বলেন, যারা বেঁচে থাকে তাদের দুঃখের শেষ নেই।

ডা. আবুল কালাম আরও বলেন, পল্লী বিদ্যুৎসহ বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বহীনতা আর সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে ইলেকট্রিক বার্ন দিন দিন বাড়ছে। বাসাবাড়ি, কলকারখায় হরহামেশাই এ রকম দুর্ঘটনা ঘটছে। বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও বাসাবাড়ি কিংবা কল-কারখানার বৈদ্যুতিক লাইন সংস্কার কিংবা পরীক্ষা করা হচ্ছে না। অথচ প্রতি বছরই পরিবারের কারও না কারও জন্মদিনে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে আনন্দ উল্লাস করা হচ্ছে। অন্তত ওইদিন উপলক্ষে বৈদ্যুতিক লাইনগুলো মেরামত, সংস্কার করার পণ করুন। এ অনুরোধ সবার কাছে।

বার্ন ইউনিটের প্লাস্টিক সার্জন প্রফেসর সাজ্জাদ খন্দকার বলেন, সাধারণ আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষত চিকিৎসায় অনেকটা ভালো হয়। কিন্তু ইলেকট্রিক বার্নে অধিকাংশ রোগীর হাত পা কেটে ফেলতে হয়। আমাদের দেশে বার্ন রোগীর প্রায় ২৫ শতাংশ ইলেকট্রিক বার্ন রোগী। উন্নত রাষ্ট্রে বার্নে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ১ কিংবা ২ শতাংশ ইলেকট্রিক বার্ন রোগী মেলে। পাঠ্যবইসহ জনপ্রতিনিধি, অভিভাবকবৃন্দ, সর্বস্তরের লোকজন সচেতন হলে এমন ভয়াবহ ইলেকট্রিক বার্ন থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে বলে তিনি মনে করেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter