সীমান্ত পথে আসা রোগাক্রান্ত বীজে হুমকিতে উত্তরের কৃষি

  আনু মোস্তফা, রাজশাহী ব্যুরো ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবাধে আসছে নিম্নমানের ভারতীয় বীজ। এসব বীজের সঙ্গে আসছে বিভিন্ন ধরনের আগাছা, মিলিবার্গ, প্ল্যান্ট হপারসহ ক্ষতিকর পোকামাকড়ও। এতে হুমকি বাড়ছে দেশের অন্যতম শস্যভান্ডার উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকরা দিন দিন আধুনিক চাষাবাদে ঝুঁকছেন। গত এক দশকে বেড়েছে বাণিজ্যিক চাষাবাদ। কিন্তু নেই পর্যাপ্ত উচ্চ ফনশীল বীজের জোগান। চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ উচ্চ ফলনশীল বীজ সরবরাহ করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)। এ সুযোগে অসাধু বীজ সিন্ডিকেট সীমান্ত পথে অপরিশোধিত বীজ এনে প্যাকেটজাত করে দেদার বিক্রি করছে। সিন্ডিকেট পাট, ভুট্টা, গম, ধান ও বিভিন্ন হাইব্রিড সবজি বীজ আনছে ভারত থেকে। ওখান থেকে আসা এসব রোগাক্রান্ত বীজ জমিতে দিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে চাষীরা। চলতি মৌসুমে চোরাই পথে আসা টমেটো বীজ ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ীর কয়েকশ’ চাষী। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি বছরই উত্তরাঞ্চলে বীজ নিয়ে চাষীদের প্রতারিত করছে সক্রিয় বীজ চোরাচালান সিন্ডিকেট।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি মৌসুমেই ভেজাল বীজ আসছে সীমান্ত গলিয়ে। রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১০ থেকে ১২ বীজ ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণ করছে এ চোরাচালান সিন্ডিকেট। সীমান্ত পথে আসা এসব বীজ নতুন নামে মোড়কজাত করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন খুচরা বিক্রেতাদের কাছে। এসব দোকান থেকে বীজ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন শত শত কৃষক। এ বছরও টমেটো ও আলু বীজ কিনে প্রতারিত হয়েছেন কৃষকরা।

বিষয়টি স্বীকার করে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ এসএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষককে ক্ষতিপূরণ আদায় করে দিয়েছে কৃষি দফতর। এছাড়া অসাধু বীজ বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অব্যাহত রয়েছে কঠোর নজরদারিও। কিন্তু তারপরও সীমান্ত পথে বীজ আসা ঠেকানো যাচ্ছে না।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছর থেকে দক্ষিণাঞ্চলের যশোর ও মেহেরপুর অঞ্চলে দেখা দিয়েছে গমের ব্লাস্ট রোগ। স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, এ রোগ এসেছে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেই চোরাই পথে আসা বীজের মাধ্যমে। রাজশাহী অঞ্চলসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে এখনও এ রোগের খবর মেলেনি। কৃষি বিভাগ আরও জানায়, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি বাংলাদেশ থেকেই ব্লাস্ট রোগ ছড়াচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সীমান্ত জেলায়। তা নিয়ন্ত্রণে এ বছর রাজশাহী অঞ্চলের বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, নদীয়া ও মালদহ জেলার সীমান্ত এলাকায় গম চাষ নিষিদ্ধ করেছে দেশটির কৃষি বিভাগ। এজন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ মাঠে সতর্কীকরণ নোটিশও ঝুলিয়েছে তারা।

তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবিকে অযৌক্তিক অ্যাখ্যায়িত করে কৃষিবিদ মোস্তাফিজুর রহমনা বলেন, গমে ব্লান্টব্লাস্ট রোগ ছড়ায় বীজ ছাড়াও বাতাসের মাধ্যমে। ভারত থেকে চোরাচালানে আসা বীজে যশোর অঞ্চলের গমে এ রোগ ছড়িয়েছে- এটি গবেষণা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, বিশেষ করে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলে এখন বিভিন্ন ধরনের আগাছা, মিলিবার্গ ও কিছু প্লান্ট হপার দেখা যাচ্ছে- যা প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেই এসেছে। পোকামাকড়গুলো পাতার রস শোষণ করায় পাতা পোড়া ও স্পট পড়া রোগ হচ্ছে বিভিন্ন ফসলে। এটা দেশের কৃষির জন্য হুমকি বটে।

এসব রোগের প্রতিকার সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, কৃষি নিরাপত্তায় রোগাক্রান্ত বীজের অনুপ্রবেশ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য সীমান্তে উদ্ভিদ সংগনিরোধ কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি। এছাড়া মানসম্মত বীজ ব্যবহারে সচেতন হতে হবে কৃষকদেরই। কারণ ফসলের রোগবালাইয়ে তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

অন্যদিকে সীমান্ত পথে আসা বীজের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সোনামসজিদ স্থলবন্দরে রয়েছে এ অঞ্চলের একমাত্র উদ্ভিদ সংগনিরোধ স্টেশন। তবে এ সংস্থার কাছে নেই বীজ আমদানির কোনো তথ্য। উপ-পরিচালক সহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ভারত থেকে বিভিন্ন স্থলবন্দরের মাধ্যমে ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪৭৪ টন কৃষিজাত পণ্য আমদানি হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও আমদানি হয় ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৬৫৪ টন কৃষিপন্য। এ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে দানা, ফল, মশলা, পশু খাদ্য ও সবজিসহ অন্যান্য পন্য। এর মধ্যে কোনো ধরনের বীজ নেই।

তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলে বীজ আসছে চোরাচালানের মাধ্যমে- যার পুরোটাই আসছে পরীক্ষা-নীরিক্ষা ছাড়াই। এতে সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসছে উদ্ভিদের নতুন নতুন রোগবালাই। বৈধ উপায়ে না আসায় এসব বীজ পরীক্ষার আওতায় নিয়ে আসা যাচ্ছে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাবে, রাজশাহী অঞ্চলে মোট কৃষি জমির পরিমাণ ৯ লাখ ৫২ হাজার ৫৯২ হেক্টর। সর্বশেষ ২০১৭-২০১৮ কৃষি বর্ষে মোট বীজের চাহিদা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৪২ টন। এর মধ্যে ১১ হাজার ৯২২ টন বোরো, ১৭ হাজার ৬৯১ টন গম, ৩৮৪ টন ভুট্টা, ৯৯ হাজার ৬৩০ টন আলু, এক হাজার ৭১৮ টন মসুর এবং ৬২৯ টন সরিষা।

তবে চাহিদামাফিক বিপণন চলছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী বীজ বিপণন অঞ্চলের উপ-পরিচালক আবদুর রহমান বলেন, চুক্তিভিত্তিক চাষীদের কাছ থেকে সংগৃহিত উচ্চ ফলনশীল বীজ বিপণন করছেন তারা। সর্বশেষ ২০১৭-২০১৮ মৌসুমে বিপণন হয়েছে ৯২৮ দশমিক ৮৪ টন বোরো বীজ। এছাড়া এক হাজার ৩২০ দশমিক ৫ টন গম, এক হাজার ১৭৩ টন আলু, ৩২০ দশমিক ৪৭ টন আমন, ৪ দশমিক ৯ টন মাষকলাই, ৪৮ দশমিক ৩০ টন মসুর, ১ দশমিক ২ টন ছোলা, ৩৯ দশমিক ৫ টন খেসারি, দশমিক ৭০০ টন চীনাবাদাম এবং ১ দশমিক ১৮ টন সবজি বীজ।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.