পাহাড়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত বাঙালিদের মৃত্যুহার বেশি

জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্যমতে, রাঙ্গামাটিতে ২০১৭ সালে ১৩ জন মৃত্যুবরণ করেন। যার মধ্যে পাহাড়ি এক ও ১২ বাঙালি

  রাশেদ রাব্বি, রাঙ্গামাটি থেকে ২১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ম্যালেরিয়া

দেশের পার্বত্য অঞ্চল বিশেষ করে রাঙ্গমাটিতে ম্যালেরিয়ায় পাহাড়িদের চেয়ে বাঙালিদের মৃত্যুহার বেশি। এ ছাড়া অধিক পরিমাণ ম্যালেরিয়ার ওষুধ (অ্যান্টিপ্যারাসাইটিক) সেবনের ফলে রোগীরা সুস্থ হওয়ার পর হালকা করে হলেও মানসিক বিকৃতিসহ অন্যান্য রোগে ভুগে থাকে।

রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অডিটোরিয়ামে শনিবার উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও এনজিও কর্মীদের উপস্থিতিতে অ্যাডভোকেসি সভায় এসব কথা বলেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি সভাটির আয়োজন করে।

সভায় বক্তারা বলেন, আগে ম্যালেরিয়ার ওষুধ জনমনে আতঙ্কের বিষয় ছিল। কেননা ৪টা ইনজেকশন শেষ করে আবার ২১টা ট্যাবলেট খাওয়া লাগত। যা খেতে অনেক তেতো ছিল এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি ছিল। তাই জ্বর এলেও চিকিৎসা নিতে চাইত না। এমনকি মানুষ ম্যালেরিয়ার ফলে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে মারা যেত। এরপর বর্তমানে যে ওষুধটা আছে সেটার তেমন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া না থাকলেও অনেকবার ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। রাঙ্গামাটিতে অনেক রোগীকে ১০ থেকে ১৫ বার ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। মোদ্দা কথা ম্যালেরিয়া হয়নি এমন লোক পাওয়া দুষ্কর ছিল। ওষুধের ফলে মানুষের মস্তিষ্ক আগের মতো কাজ করে না। তা ছাড়া অন্যান্য রোগেও ভোগে।

বক্তারা বলেন, পাহাড়ি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের শারীরিক গঠন অনুসারে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। তাই তাদের ম্যালেরিয়া কম হয়। তারা পাহাড়ের উপরে থেকে অভ্যস্ত। তা ছাড়া পাহাড়ের উপরে পানি জমে থাকার সুযোগ কম। তাই মশার উৎপাদন সুযোগ কম। আবার তাদের খাবারের অভ্যাসটাও অনেক স্বাস্থ্যকর বা তারা মসলা কম খায়। এদিকে বাঙালিরা সাধারণত তুলনামূলকভাবে সমতল এলাকায় বসবাস করে। যেখানে পানি জমার সুযোগ বেশি, মশা উৎপন্ন হয়ও বেশি। মূলত এসব কারণেই ম্যালেরিয়ায় বাঙালিরা বেশি আক্রান্ত হয়।

জাতীয় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্যমতে, রাঙ্গামাটিতে ২০১৬ সালে মোট ১৭ রোগী ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুবরণ করে। এর মধ্যে পাঁচ পাহাড়ি ও ১২ বাঙালি। এরপর ২০১৭ সালে ১৩ জন মৃত্যুবরণ করেন। যার মধ্যে পাহাড়ি এক ও ১২ বাঙালি।

বর্তমানে সরকার প্রদত্ত কীটনাশকযুক্ত মশারি অনেক উপকারী হলেও মশা মারার স্প্রে করা বন্ধ উল্লেখ করে বক্তারা আরও বলেন, সরকার যে মশারি দিচ্ছে তা যথেষ্ট উপকারী। ঘরে এই মশারিগুলো টাঙানো থাকলে মশা আসে না। এটা ভালো কিন্তু মশারির আকারটা ঠিক হলে আরও ভালো হতো। মশারিগুলো স্কয়ার সাইজের হওয়ায় লম্বায় ছোট ও চওড়ায় বড় হয়। সাইজটা ঠিক হলে মশারি টাঙানোর আগ্রহ বাড়বে। আর প্রতি পরিবারে একটি করে মশারি দেয়ায় পরিবারের সবার জন্য সেটা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া আগে গায়ে মাখার একটি মলম ছিল, যেটা লাগালে আর মশায় কামড়ায় না এবং আগে নিয়মিত মশার ওষুধ স্প্রে করা হতো, সেটা এখন আর দেখি না।

বক্তারা বলেন, ম্যালেরিয়ার মশা সাধারণত সন্ধ্যার পর কামড়ায়। তাই এ সময়টায় বেশি খেয়াল রাখা উচিত। পুরুষদের চেয়ে নারীরা এ রোগে কম আক্রান্ত হয়। কেননা নারীরা বেশি সচেতন থাকে এবং পুরুষদের মতো নারীদের বাইরে বিচরণ কম থাকে। আর পাহাড়ে পুরুষরা জুম চাষ ও কাঠ কাটার কাজে নিয়োজিত থাকে। ফলে সেখানে মশা কামড়ানোর ঝুঁকি বেশি। যেখানে মশা কামড়ানো থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের এ রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বেশি।

কাপ্তাই উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাসুদ আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অ্যাডভোকেসি সভায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এমএম আখতারুজ্জামান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা পরীক্ষিত চৌধুরী, জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির বিশেষজ্ঞ মো. নজরুল ইসলাম, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব এমকে হাসান মোরশেদ, কাপ্তাই উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা খোরশেদ আলম, হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নিখিল মানকিন প্রমুখ।

এদিকে ম্যালেরিয়ায় রাঙ্গামাটির পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন রাঙ্গামাটির ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. এন্ড্র বিশ্বাস। তিনি বলেন, সবচেয়ে ম্যালেরিয়াপ্রবণ জেলা রাঙ্গামাটিতে গত তিন বছরে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ২০০২ সালে এই জেলায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৪৩ রোগী মৃত্যুবরণ করে। ১০ বছর পর ২০১২ সালে মৃত্যু নেমে আসে একজনে। ২০১৩ সালে দু’জন ও ২০১৬ সালে একজনের মৃত্যু হলেও ২০১৭-২০১৯ পর্যন্ত কোনো মৃতের ঘটনা ঘটেনি। জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় ৯২৬ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। যেখানে ২০১৭ সালে আক্রান্ত হয়েছিল তিন হাজার ১৫৫ জন। অন্য দিকে আক্রান্তের দিক থেকে সবচেয়ে কম রয়েছে সদর উপজেলায়। এখানে মাত্র ২৫ জন ম্যালেরিয়ার আক্রান্ত হয়েছে। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩ জনে।

আক্রান্তের দিক থেকে নারীদের চেয়ে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। ২০১৭ সালে রাঙ্গামাটিতে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল চার হাজার ৯৫০ পুরুষ। একই সময়ে নারী আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার ৮৮০। বয়সের দিক থেকে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বদের আক্রান্তের সবচেয়ে বেশি। ২০১৭ সালে এ বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছিল চার হাজার ৫৯৩ জন। ২০১৮ সালে এক হাজার ৬৭৯ জন। রাঙ্গামাটি জেলায় এক বছরের নিচে শিশুদের আক্রান্তের হার সবচেয়ে কম। ২০১৭ সালে আক্রান্ত হয়েছিল মাত্র ১৬ জন। ২০১৮ যা ১৪ জনে নেমে এসেছিল।

জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলার ১০টি উপজেলার ৪৯টি ইউনিয়নে এক হাজার ৫৫৫টি গ্রামে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের হার কমছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×