স্বপ্নতরী এগ্রোর প্রতারণা

অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে লাপাত্তা এমডি ও জিএম

১২শ’ খামারি এখন নিঃস্ব

  মাহবুব রহমান, রংপুর ব্যুরো ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতারণা

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার খামারি খালিদ মাহামুদ। টার্কি মুরগির আদর্শ খামারি প্যাকেজে ‘স্বপ্নতরী এগ্রো সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেন ১৭ লাখ টাকা।

তার মতো এই উপজেলার অন্তত ৩০ জন বিভিন্ন প্যাকেজে কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। রংপুর বিভাগের রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও জয়পুরহাটের সহস্রাধিক খামারি টার্কি মুরগির প্রজেক্টে অর্ধশত কোটির মতো বিনিয়োগ করেছেন। প্রায় ১২শ’ খামারি এখন বিনিয়োগের মূলধন ও লভ্যাংশের টাকার অংশ ফেরত না পেয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। টাকা নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন স্বপ্নতরীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মানিক চন্দ্র বর্মণ ও মহাব্যবস্থাপক শরিফুল আলম।

খামারিদের তথ্য মতে, চুক্তি অনুযায়ী বিনিয়োগকারীর শুধু খামার থাকলেই চলবে। বাকি সব দায়িত্ব নেবে স্বপ্নতরী এগ্রো সার্ভিসেস লিমিটেড। মুরগির দেখাশুনা থেকে খাবার সরবরাহ এবং কোনো কারণে মুরগি মারা গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না খামারিরা। বরং ৯০ দিন পর শর্ত অনুযায়ী খামারিদের কাছ থেকে মুরগি ফেরত নিয়ে মূলধন ও লভ্যাংশ বুঝিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত মূলধন কিংবা লভ্যাংশ কোনো টাকাই পাননি খামারিরা। বিভিন্ন অজুহাতে বিনিয়োগের টাকা না দিয়ে লাপাত্তা প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এতে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর খামারিরা এখন নিঃস্ব হতে চলেছে। ডেসটিনির আদলে ব্যবসার ফাঁদে ফেলে খামারিদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি দিনাজপুরের বীরগঞ্জে স্লুইসগেট রোডসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত।

খামারিদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, স্বপ্নতরীর টার্কি মুরগির প্রথম প্যাকেজে ২৪ হাজার ৮০০ টাকা বিনিয়োগে ৯০ দিন পর বিক্রয় মূল্য হবে ৩৩ হাজার ৩০০ টাকা। দ্বিতীয়টিতে ৯৯ হাজার ২০০ টাকা বিনিয়োগে বিক্রয় মূল্য ১ লাখ ৩৩ হাজার ২০০ টাকা, তৃতীয় প্যাকেজে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ টাকা বিনিয়োগে বিক্রয় মূল্য ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৬০০ টাকা। চতুর্থ প্যাকেজে ৫ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ টাকা বিনিয়োগে বিক্রয় মূল্য ৭ লাখ ৯৯ হাজার ২০০ টাকা, পঞ্চম প্যাকেজে ৯ লাখ ৯৯ হাজার ২০০ টাকা বিনিয়োগে ১৩ লাখ ৩২ হাজার টাকা এবং ষষ্ঠ প্যাকেজে ১৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলে ৯০ দিন পর লভ্যাংশসহ ফেরত পাবে ১৯ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। প্রতিটি প্যাকেজেই আলাদা করে খাবার ও বিদ্যুৎ বিলের টাকা জমা দিতে হবে খামারিদের। মুরগির খাবার ও দেখাশুনার জন্য স্বপ্নতরী থেকেই প্রত্যেক উপজেলায় রয়েছে একজন করে মাঠ পরিদর্শক।

প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মানিক চন্দ্র বর্মণ একসময় ডেসটিনির পিএসডি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। ৮ সদস্যের নির্বাহী কমিটি দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি- যার চেয়ারম্যান মানিক চন্দ্র বর্মণ নিজেই। আর বাকিদের মধ্যে মানিক চন্দ্রের স্ত্রীসহ তার নিকটাত্মীয়রা রয়েছেন। তারা মানিক চন্দ্রের স্বপ্নতরীর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে দাবি করছেন। স্বপ্নতরী এগ্রো সার্ভিসেস লিমিটেডের উপদেষ্টা মানিক চন্দ্র বর্মণের স্ত্রী মিনতি রানী সাহা বলেন, ‘আমরা কাউকে হয়রানি করছি না। কিছু সমস্যার কারণে টাকা দিতে দেরি হচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ পার হয়েছে সত্য। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি।’ নীলফামারীর ডোমার উপজেলার জয়নাল আবেদীন, সালিম জাবির ও আল-আমিন বলেন, ‘আমরা অনেক আশা নিয়ে স্বপ্নতরীতে বিনিয়োগ করেছিলাম। কিন্তু প্রতারণার ফাঁদে পড়ে আজ আমরা নিঃস্ব। বিনিয়োগ করা টাকা বা লভ্যাংশ কোনোটাই পাচ্ছি না। স্থানীয় প্রশাসনও এ প্রতারণার বিষয়ে কিছুই জানে না।’

স্বপ্নতরী এগ্রোর হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা শুভ সরকার বলেন, ‘আমরা কারও সঙ্গে প্রতারণা করছি না- যারা বিনিয়োগ করেছে, সবাই টাকা ফেরত পাবে। আমাদের জিএম শরিফুল আলম মোটা অংকের টাকা ও গাড়ি নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন। এছাড়াও বেশ কিছু সমস্যার কারণে খামারিদের টাকা দিতে বিলম্ব হচ্ছে।’

বীরগঞ্জ থানার ওসি সাকিলা পারভীন জানান, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়ামিন হোসেন বলেন, ‘আমার কাছে অনেকেই মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। তবে এ বিষয়ে ইতিমধ্যে দিনাজপুর পুলিশ সুপার দফতরে অভিযোগ করেছেন অনেকে।

এ বিষয়ে অভিযোগ তদন্ত করছেন বীরগঞ্জ সার্কেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। তিনি ছুটিতে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ওসি সাকিলা পারভীন বলেন, ‘আমি যতদূর জানি ওই প্রতিষ্ঠানটির মালিক কোনো অনুমতি ছাড়াই মাইক্রো ক্রেডিট ব্যবসা ও স্বপ্নতরী মেধা ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। অভিযুক্ত স্বপ্নতরী এগ্রো সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মানিক চন্দ্র বর্মণের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি। স্বপ্নতরী এগ্রো সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান উত্তম কুমার রায়কে এ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান তা আমি নিজেই জানি না।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×