ক্ষোভে ফুঁসছেন উপকূলীয় জেলেরা

বছরজুড়ে নিষেধাজ্ঞায় নাভিশ্বাস জেলেদের

সাময়িক অসুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল মিলবে -মৎস্য কর্মকর্তা

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো ০১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জেলে

একের পর এক নিষেধাজ্ঞার জালে আটকা জেলেরা। মাছ ধরাই প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ইলিশের ভরা মৌসুম ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত সমুদ্রে মাছ শিকার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সবশেষ এ ঘোষণায় ক্ষুব্ধ সাগর পাড়ের জেলেরা। উপকূলীয় প্রায় সব উপজেলায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ শেষে ডিসিদের কাছে দেয়া হচ্ছে স্মারকলিপি।

একই সমুদ্রে মাছ ধরার ওপর ভারতের নিষেধাজ্ঞা শেষে বাংলাদেশের নিষেধাজ্ঞা আরোপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। জেলেদের এখন একটাই প্রশ্ন, ‘বছরজুড়ে যদি একের পর এক নিষেধাজ্ঞা থাকে, তাহলে জেলেরা মাছ ধরবেন কখন?’ তবে বরিশালের মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল কুমার দাস বলেন, ‘সরকার যা করছে দেশের মৎস্য সম্পদের উন্নয়নের জন্যই করছে। এতে সাময়িক অসুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল মিলবে।’

নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল : প্রায় সারা বছরই কোনো না কোনো এলাকায় বন্ধ থাকে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ শিকার। প্রজনন মৌসুমে ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত টানা ৮ মাস দেশের নদ-নদীতে বন্ধ থাকে জাটকা ধরা। জাটকা বলতে লেজের শেষাংশ থেকে মাথা পর্যন্ত ১০ ইঞ্চির ইলিশকে বোঝানো হয়। একই সঙ্গে দেশের ৬টি মাছের অভয়াশ্রমে বছরে ২ মাস বন্ধ রাখা হয় মাছ শিকার। এছাড়া প্রজনন মৌসুমে টানা ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে। ৩ দফায় প্রায় ১১ মাস ইলিশ এবং অন্য মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকছে।

নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে জেলেরা : কথা হয় বরিশাল ইলিশ মোকামের মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুলের সঙ্গে। চলমান নিষেধাজ্ঞার কারণে শূন্য আড়ত এবং বেকার শ্রমিকদের বেঁচে থাকার চেষ্টায় আড়ত বোঝাই তরমুজ দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এ হচ্ছে আমাদের অবস্থা। বরিশাল মোকামে শুধু শ্রমিকই রয়েছেন ৩ হাজারের বেশি। আড়তদার জেলে মিলিয়ে ৫ হাজারের বেশি পরিবার নির্ভরশীল এ মোকামের ওপর। সরকারি নিষেধাজ্ঞায় আমাদের ক্ষোভ নেই, প্রশ্ন হচ্ছে এর যৌক্তিকতা নিয়ে। ১০ ইঞ্চি দৈর্ঘের ইলিশকে বলা হচ্ছে জাটকা। মজার ব্যাপার হচ্ছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ জাটকার ওজন ৬শ’ থেকে ৭শ’ গ্রাম। এগুলোর পেটে মিলছে ডিম। তাহলে এগুলো অপরিণত ইলিশ হল কি করে? তাছাড়া সারা বছরই যদি ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে তাহলে জেলেরা মাছ ধরবেন কখন?’

বরিশাল মোকামের ব্যবসায়ী জহির সিকদার বলেন, ‘তিন দফা নিষেধাজ্ঞার ফলে দাঁড়াচ্ছে কি? আমরা মাছের লালন-পালন করে বড় করব আর মাছ ধরবে পাশের দেশ? ইলিশ যখন বড় হল, শিকারের সময় এলো তখনই নিষেধাজ্ঞা! খেয়াল করলে দেখবেন আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার, ভারত এবং থাইল্যান্ডে মাছ ধরা নিয়ে এত নিষেধাজ্ঞা নেই। গত কয়েক বছরে ওই সব দেশের ইলিশ উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে।’ বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশে ইলিশের বড় মৌসুম ১৫ মে থেকে ১৫ অক্টোবর।

মোট ইলিশের প্রায় ৮১ ভাগই ধরা পড়ে এ সময়ে। অথচ জারি হল ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা। ভরা মৌসুমে যদি সাগরে মাছ ধরতে যেতে না পারি তাহলে খাব কি?’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাসুম আকন বলেন, ‘বিভিন্ন প্রজাতির ছোট ছোট মাছের প্রজনন মৌসুম হিসাব করে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা যারা ইলিশ ধরি আমাদের জালের ফাঁস ৪ বর্গ ইঞ্চি। এ ফাঁসে রেনু পোনা তো নয়ই, ছোট মাছও ধরা পড়ার কথা নয়। অথচ মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার।’

পাথরঘাটা মাঝিমাল্লা সমিতির সভাপতি সিদ্দিক জমাদ্দার বলেন, ‘১৯৮৩ সালে এ আইনটি হয়। তখন শুধু এটি ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট ফিশিং ট্রলির আওতায় ছিল। কেননা এসব ট্রলির জালের ফাঁস আধা ইঞ্চি থেকে পৌনে ১ ইঞ্চি। ২০১৫ সালের সংশোধনীতে আমাদের ফিশিং বোটসহ মাছ ধরা নৌকাও এর আওতায় আনা হয়। আমরা যারা ৪ ইঞ্চি ফাঁসের জাল দিয়ে শুধু ইলিশ ধরি তাদের এ আইনের আওতায় আনা হল কোন যুক্তিতে?’ সমিতির সাধারণ সম্পাদক এনামুল হোসেন বলেন, ‘একই সমুদ্রে মাছ ধরে বাংলাদেশ এবং ভারতীয় জেলেরা। ভারতে ছোট ছোট মাছের প্রজনন মৌসুমের জন্য বৈশাখ এবং জ্যৈষ্ঠকে নির্ধারণ করে এ ২ মাস বন্ধ রাখা হয় মাছ ধরা। অথচ আমাদের জন্য এ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে জ্যৈষ্ঠ এবং আষাঢ়। তাহলে কি আমাদের সমুদ্রসীমায় এসে মাছের প্রজনন মৌসুম বদলে যায়?’ জেলেরা বলছেন, ‘নিষেধাজ্ঞা তাহলে ভারতের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া হোক।’

আন্দোলনে জেলেরা : বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘বাগেরহাট, পিরোজপুর, পটুয়াখালীর মহিপুর-আলিপুর, বরগুনা এবং বরগুনার তালতলী ও পাথরঘাটায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছেন জেলেরা। তারা ডিসিদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। তিনি বলেন, একই সমুদ্রে দু’ধরনের আইন চলতে পারে না।

নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার অর্থ হচ্ছে- নদ-নদী সমুদ্রে নামতে না পারা মানে অন্য দেশের মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করা।’ বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্র্তা (ইলিশ) বিমল কুমার দাস বলেন, ‘যখন আইন করা হয় তখন আলাদা করে কারও কথা ভেবে হয় না। প্রয়োগ ক্ষেত্রে গিয়ে যেসব জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে তা অবশ্যই সরকার বিবেচনা করবে বলে আমার বিশ্বাস।’ জেলেদের দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক যে তারা বড় ফাঁসের জাল দিয়ে শুধু ইলিশ ধরছেন। আশা করি সরকার এটি নিয়ে ভাববে।’ জাটকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পেটে ডিম কিংবা ওজন দেখে এ নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি।

আমরা চাইছি যে ১০ ইঞ্চি দৈর্ঘের নিচে কেউ ইলিশ ধরবে না। এতে করে ইলিশের আকার এবং বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে।’ বছরজুড়ে নানা নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জাটকা নিধন যখন বন্ধ থাকে তখন বড় ইলিশ ধরায় কিন্তু নিষেধ থাকে না। তাছাড়া প্রতিটি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদেই কোনো না কোনো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। তবে ইলিশের ভরা মৌসুমে ছোট ছোট মাছের প্রজনন মৌসুম নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে সেটা নিয়ে গবেষণা চলছে। মৎস্য অধিদফতরের বহরে যোগ হওয়া অত্যাধুনিক একটি রিসার্চ ভেসেল গত কিছুদিন ধরে বঙ্গোপসাগরে গবেষণা চালাচ্ছে। আশা করি প্রজনন মৌসুম নির্ধারণসংক্রান্ত জটিলতাও আর ভবিষ্যতে থাকবে না।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×