আতঙ্কের জনপদ রোহিঙ্গা ক্যাম্প

প্রকাশ : ১১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  উখিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

উখিয়ার মধুরছড়া, লম্বাশিয়া, বালুখালী, কুতুপালং, ময়নারঘোনা, তাজনিমারখোলা ও শফিউল্লাহকাটা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বেশ কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জেরে স্থানীয় সচেতন মহলসহ দেশি-বিদেশি লোকজনকে ভাবিয়ে তুলেছে।

বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠার কারণে দিন দিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিবেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

এসব নিয়ন্ত্রণ করা না হলে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিদেশি দাতা সংস্থাদের রোহিঙ্গাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন সুশীল সমাজের লোকজন।

রোহিঙ্গাদের জনপ্রিয় নেতা ছিলেন আরিফ উল্লাহ (৩৮)। উচ্চশিক্ষিত এই রোহিঙ্গা নেতা ছিলেন উখিয়ার বালুখালী-২ ক্যাম্পের হেড মাঝি।

২০১৮ সালের ১৮ জুন রাতের আঁধারে তাকে গলা কেটে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। তার পরিবারের সদস্যরা ভয়ে পালিয়ে গেছে টেকনাফের লেদায়।

উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের আরেক শীর্ষ মাঝি আবু ছিদ্দিক। ক্যাম্পের ভেতরেই তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মৃত ভেবে বীরদর্পে চলে যায় সন্ত্রাসী বাহিনী। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। আবু ছিদ্দিক বেঁচে গেলেও দুই হাত হারিয়ে পঙ্গু জীবনযাপন করছেন।

বালুখালী ক্যাম্পের ডি-ব্লকের নূর আলম (৪৫), খালেক (২২) ও কুতুপালং ই-ব্লকের আনোয়ারকে (৩৩) ২ সেপ্টেম্বর ক্যাম্প থেকে ধরে নিয়ে যায় সন্ত্রাসী বাহিনী। পরের দিন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পারিয়াপাড়ার পাহাড়ি এলাকা থেকে গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় এই তিন রোহিঙ্গাকে।

উখিয়ার এমএসএফ ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে দু’জন সুস্থ হয়ে উঠলেও মারা গেছেন আনোয়ার। যে দু’জন বেঁচে আছেন আতঙ্কে তারাও ক্যাম্প ছেড়ে অজ্ঞাত স্থানে পালিয়ে গেছেন।

২০১৭ সালের ২৯ অক্টোবর বালুখালী ১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের যশোর থেকে আসা নলকূপ মিস্ত্রিদের ওপর হামলা চালিয়ে চারজনকে রক্তাক্ত জখম করেন।

তাদের ছেলে ধরার গুজব ছড়িয়ে রোহিঙ্গারা হামলা চালায়। পুলিশ তাদের মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে। সর্বশেষ ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি বালুখালী ক্যাম্পের রফিক ও আলমের লাশ উদ্ধার করেন তার স্বজনরা। রফিকের লাশ টেকনাফের চাকমারকূল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অদূরে গভীর জঙ্গলে আর আলমের লাশ বালুখালী থেকে উদ্ধার করা হয়।

স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করে জানান, লম্বাশিয়া ও মধুরছড়া ক্যাম্পের হেড মাঝি জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে কয়েকশ’ রোহিঙ্গা যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে ক্যাম্পের পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে।

১৯ ফেব্রুয়ারি মধুরছড়া ক্যাম্পের পাশে স্থানীয় দিলদার আলম ও আনোয়ারের বাড়িতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হামলা চালিয়ে তাকে গুরুতর আহত করে।

এভাবে প্রতিনিয়ত ছোট-খাটো ঘটনা ঘটছে বিভিন্ন ক্যাম্পে। এ ছাড়াও গুজব ছড়িয়ে রোহিঙ্গারা তিনজন জার্মান সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করেন।

এরা হলেন ইয়োরিকো লিওবি (৪৪), এস্টিপেইন্স এ্যাপল (৪৯) ও গ্রার্ডার স্টেইনার (৬১)। আহত হন তাদের দোভাষী সিহাবউদ্দিন (৪১), গাড়িচালক নবীউল আলম (৩০) এবং পুলিশ সদস্য জাকির হোসেন (৩৩)।

অনেককে মন্তব্য করতে দেখা গেছে, এমন পরিস্থিতির শিকার হলে হয়তো আগামীতে বিদেশি ভিআইপিরা ক্যাম্প পরিদর্শনের ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তে পারেন। এর ফলে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

কুতুপালং ক্যাম্পের অদূরে নৌকার মাঠ এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের বেশ কিছু ছবি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেলে আরও আতঙ্ক সৃষ্টি হয় সাধারণ রোহিঙ্গা ও রোহিঙ্গা সেবায় নিয়োজিত বিভিন্ন এনজিও সংস্থা এবং স্থানীয়দের মাঝে।

উখিয়া ও টেকনাফে ৩০টি ক্যাম্পে এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। সূত্রমতে, প্রতি ক্যাম্পে একজন করে হেড মাঝির অধীনে ৪ শতাধিক মাঝির মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা চলছে।

ত্রাণ তৎপরতাও চালানো হচ্ছে তাদের সহযোগিতায়। তবে বিশাল এই ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ মাঝি ও হেড মাঝিদের হাতে যেমন নেই, তেমনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও এখানে অসহায়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝিদের সন্ত্রাসী গ্রুপের নির্দেশ মতো চলতে হয়। নিয়মিতভাবে তাদের দিতে হয় চাঁদা। তাদের কথার হেরফের হলেই গলায় ছুরি চালানো হয়। কুপিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয়া হয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সভাপতি সাংবাদিক নূর মুহাম্মদ সিকদার জানান, রোহিঙ্গারা নানা অপরাধ করলেও তাদের পুলিশে দেয়া যায় না।

বিশাল ক্যাম্পে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, দিনের বেলায় যেমন তেমন। রাত নামলেই রোহিঙ্গা ক্যাম্প যেন এক আতঙ্কের জনপদ। এমন পরিস্থিতি বিরাজমান থাকলে ভবিষ্যতে চরম মাশুল দিতে হবে সরকার এবং দেশের মানুষকে।