ভুয়া কাজীর হাতে ৩০ হাজার বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি

নজরদারির অভাবেই এমনটা হচ্ছে, দুশ্চিন্তায় নিবন্ধিতরা

  ইকবাল হাসান ফরিদ ১৯ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকায় ১৬ বছর ধরে নিকাহ রেজিস্ট্রির কাজ করে আসছেন বাহাউদ্দিন। এ সময় তিনি ৩০ হাজারেরও বেশি নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রি করেছেন। সম্প্রতি জানা গেছে, তিনি ভুয়া কাজী। এরফলে যারা তার মাধ্যমে বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রি করিয়েছে মহাচিন্তায় পড়েছেন তারা। আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভুয়া কাজীর মাধ্যমে করা রেজিস্ট্রিও ভুয়া। তদের মতে নজরদারির অভাবে এরকম ভুয়া কাজীরা বিয়ে ও তালাক নিবন্ধনের ফাঁদ পেতে বসছেন। এদের কারণেই বিয়ে বিচ্ছেদ, বিদেশে যাওয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে আইনি জটিলতায় পড়েন সাধারণ মানুষ।

আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট এলিনা খান যুগান্তরকে বলেন, কাজী যদি ভুয়া হয় তার দ্বারা নিবন্ধিত বিয়ে এবং তালাকও ভুয়া। ভুয়া কাজীর দ্বারা যারা বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন করিয়েছেন জরুরি মুহূর্তে তারা জটিলতায় পড়বেন। তাই সংশ্লিষ্টরা ভুয়া কাজীর দায় এড়াতে পারেন না। তিনি বলেন, ভুয়া কাজীর দৌরাত্ম্য কমাতে হলে কাজীর সাইনবোর্ডে নিবন্ধন নাম্বার লেখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। আর কাজীদের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ডাটাবেজ এবং ওয়েবসাইট তৈরি করতে হবে। যাতে নিবন্ধন নাম্বার দিয়ে যে কেউ কাজী বৈধ না ভুয়া তা যাচাই করতে পারেন।

জানা গেছে, ভুয়া কাজী বাহাউদ্দিনের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে। তার বাবা মৃত আব্দুর রশিদ। বাহাউদ্দিন যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল ইউনিয়নের বিবাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকার লোকজনের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন ২০০০ সাল থেকে। বিষয়টি ২০১৬ সালে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে। ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ডেমরার তৎকালীন সাবরেজিস্ট্রার আশ্রাফুল আলমকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিচার শাখা-৭ থেকে বাহাউদ্দিনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার আদেশ দেয়া হয়। বিচার শাখা-৭ এর সিনিয়র সহকারী সচিব ওয়াসিম শেখ স্বাক্ষরিত এক পত্রে বলা হয়, বাহাউদ্দিনকে মাতুয়াইল ইউনিয়নের নিয়োগ প্রদান করা হয়নি। তার কাছে রক্ষিত ও ব্যবহৃত ২০০০ সালের ১৫ মার্চ তারিখের বিচার-৭/২এন-১৩৪/৭৭-১১৯৮ এবং বিচার-৭/২এন-১০০/৮৬নং স্মারকযুক্ত পত্র জালজালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি। এরপর ২০১৬ সালের ১৬ মার্চ আশ্রাফুল আলম বাদী হয়ে বাহাউদ্দিনের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন (মামলা নং-৪৬)। মামলার তদন্তভার দেয়া হয় এসআই এম আজিজুল হককে। তিনি তদন্ত শেষে কাজী বাহাউদ্দিনের পক্ষে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। এতে বাদী নারাজি দিলে ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি আদালত মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআইকে নির্দেশ দেন। পিবিআই’র ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারের নির্দেশে মামলার তদন্ত শুরু করেন পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম বাবুল। তদন্তে তিনি প্রমাণ পান, বাহাউদ্দিন ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ১৬ বছর ধরে নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় ভুয়া কাজী বাহাউদ্দিন ৩০ হাজারের বেশি বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন করেছেন।

জানতে চাইলে ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, মামলাটি খুবই স্পর্শকাতর। আমি নির্দেশনা দিয়েছি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি উত্থাপন করতে। সে অনুযায়ী তদন্ত কর্মকর্তা কাজ করে সত্য উদঘাটন করেছেন। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ভুয়া কাজী বাহাউদ্দিন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের এসআই এম আজিজুল হক বলেন, কত মামলাই তো আছে পুলিশ তদন্ত করে যা পায় না, ডিবি-সিআইডি তদন্ত করে তা পায়।

কোনাপাড়া এলাকায় বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমার মেয়ে, ছেলে এমনকি নাতনির বিয়ে রেজিস্ট্রি করেছেন কাজী বাহাউদ্দিন। এখন শুনি তিনি ভুয়া কাজী। তার মাধ্যমে যেসব বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়েছে ভবিষ্যতে এ নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হবে কিনা- সে চিন্তায় আছি। কোনাপাড়া পাড়াডগাইর এলাকার বাসিন্দা নুর আলম বলেন, পুলিশ বাহাউদ্দিন সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে এসেছিল। আমরা বলেছি, তিনি এ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা তো তাকে ভালোই জানি। তিনি যে ভুয়া কাজী তা আমরা কেউই জানতাম না।

কল্যাণপুর এলাকার এক মসজিদের ইমাম আব্দুল্লাহ আল সাইমুন বলেন, ‘যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি মাদ্রাসায় পড়ার সময় থেকে বাহাউদ্দিনের সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি জানতাম বাহাউদ্দিন রেজিস্ট্রার্ড কাজী। তিনি ভুয়া কাজী একথা শুনে রীতিমতো অবাক হয়েছি।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×