ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে বিশেষ উদ্যোগ

আসছে ‘মিনি পেডি সাইলো’

ধারণক্ষমতা ১০ লাখ টন * হাওর এলাকায় হচ্ছে ৫টি সরকারি অটো রাইস মিল

  উবায়দুল্লাহ বাদল ২৬ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ধান

ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সারা দেশে ২০০টি স্টিলের ‘মিনি পেডি সাইলো (ধান সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা)’ নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনে এই সাইলোতে সংরক্ষণ করা হবে। প্রতিটি সাইলোতে ৫০০০ টন করে ধান ২-৩ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে।

প্রতিটি সাইলো নির্মাণ করতে ৭ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এ সংক্রান্ত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এটি অনুমোদনের জন্য শিগগির পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। বিশেষায়িত এসব সাইলো নির্মিত হলে চালের পাশাপাশি আরও ১০ লাখ টন ধান সংরক্ষণ করতে পারবে সরকার। এ মুহূর্তে সরকারের ধান সংরক্ষণের কোনো গুদাম নেই। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

আরও জানা গেছে, ধান থেকে চাল বানাতে হাওর এলাকায় সরকারি খরচে ৫টি অটো রাইস মিল স্থাপন করা হবে। যাতে প্রয়োজনে পেডি সাইলো থেকে ধান নিয়ে দ্রুত চাল করা যায়। চালকল মালিকদের ওপর থেকে নির্ভরতা কমাতেই এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বৃহস্পতিবার নিজ দফতরে যুগান্তরকে বলেন, ‘ধানের ন্যায্যদাম নিশ্চিত করতে হলে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনতে হবে। কিন্তু আমাদের ধান সংরক্ষণের কোনো গুদাম নেই; যেগুলো আছে তার সবই চালের গুদাম। তাই আমরা বিষয়টি নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলেছি। সেখান থেকে ধান সংরক্ষণের জন্য স্টিলের ‘মিনি পেডি সাইলো’ নির্মাণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্য যাচাই) করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে। অনুমোদনের জন্য শিগগির পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।

কবে নাগাদ এসব পেডি সাইলো নির্মিত হবে, জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো ধরনের বাধা বিপত্তি না হলে আগামী ইরি-বোরো মৌসুমের আগেই আমরা ১০০টি পেডি সাইলো নির্মাণ করতে পারব।’

জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে ১২ লাখ ৫০ হাজার টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১০ লাখ টন সেদ্ধ চাল, দেড় লাখ টন আতপ চাল এবং বাকি দেড় লাখ টন ধান (এক লাখ টন চালের সমপরিমাণ) সংগ্রহ করা হবে। ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই সংগ্রহ অভিযান চলবে। গত ২৮ মার্চ খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের সভাপতিত্বে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) এক সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে খাদ্যমন্ত্রী জানান, ৩৬ টাকা দরে সেদ্ধ চাল, ৩৫ টাকা দরে আতপ চাল এবং ২৬ টাকা দরে ধান সংগ্রহ করা হবে। ইতিমধ্যে চাল সংগ্রহ শুরু করলেও ধান সংগ্রহ করতে পারেনি সরকার।

বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকেই এ ধান সংগ্রহ করতে হবে। মাঠপর্যায়ে কৃষকের তালিকা না পাওয়ায় ধান কিনতে পারছেন না খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র দাবি করেছে, স্থানীয় প্রভাবশালীদের কারণে প্রকৃত কৃষকের তালিকা পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ ওই প্রভাবশালীরাই কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে বেশি দামে সরকারের কাছে বিক্রি করার অপচেষ্টা করছে। অনেক জায়গায় স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ফলে তালিকা ছাড়া ধান কিনতে পারছেন না খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। এ অবস্থায় কিছু জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিজেই সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা শুরু করেছেন। তারপরও সরকারের ধান কেনার তেমন কোনো প্রভাব নেই ধানের বাজারে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। উৎপাদন খরচের চেয়ে মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা লোকসানে ধান বেচতে হচ্ছে কৃষকের। উৎপাদন খরচের অর্ধেক মূল্যে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। দুই মণ ধান বিক্রি করে একজন ধান কাটার শ্রমিকের মজুরি শোধ করতে হচ্ছে। ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে রাজপথে নানা কর্মসূচিও পালন করছে কৃষকসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং স্থায়ীভাবে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সারা দেশের হাওর ও ধান উৎপাদনপ্রবণ এলাকায় ২০০ মিনি পেডি সাইলো নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এ প্রসঙ্গে খাদ্য সচিব শাহাবুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে রাইস সাইলো নির্মাণ করা হবে। এসব সাইলোতে ড্রায়ার ও ফেনি মেশিন থাকবে। কৃষক ভেজা ধান নিয়ে এলেও তা ড্রায়ারে ঢোকালেই তা গুদামজাতকরণের মতো উপযুক্ত হবে। ফেনি মেশিনে ময়লাগুলো পরিষ্কার হবে। সরকারের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সরকার প্রতিবছর চালের পাশাপাশি আরও ১০ লাখ টন ধান সংরক্ষণ করতে পারবে। এ ছাড়া প্রতি ধানের মৌসুমে চালের সমপরিমাণ ধানও কিনতে পারবে। এসব ধান ২-৩ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। ফলে কৃষকের ধানের ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ হবে।’

ধানের ন্যায্য দাম পাওয়ার বিষয়ে কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ধানের বাম্পার ফলন হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। আর সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে এটাই স্বাভাবিক। সরকার প্রতিবছর সার, বীজ ও সেচের ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ায় এখন ধান কাটার শ্রমিক (কামলা) পাওয়া যাচ্ছে না। একজন কামলাকে দিনপ্রতি ৮০০ টাকা দিতে হচ্ছে। এ কারণে কৃষকের ক্ষোভটা বেশি। এ থেকে মুক্তির উপায় হচ্ছে কৃষি ক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণ। কৃষকদের মাঝে ধান কাটার পর্যাপ্ত মেশিন সরবরাহ করতে হবে।’

তবে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে ধান-চালের উৎপাদন খরচ কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ মণ্ডল। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের ন্যায় কৃষি উপকরণে ভর্তুকি দিতে হবে। পাশাপাশি খোলা বাজার থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করতে হবে। মিলারদের ওপর থেকে নির্ভরতা কমাতে হবে। চালের পাশাপাশি ধান সংরক্ষণের জন্য গুদাম বানাতে হবে।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×