মরণব্যাধি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ গাড়ি

থাকবে জিন এক্সপার্ট মেশিন, এক্সরেসহ নানা সুবিধা * যক্ষ্মাপ্রবণ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার পাশাপাশি এসব গাড়ি যাবে গার্মেন্ট ও জেলখানায়

  রাশেদ রাব্বি ০৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মরণব্যাধি যক্ষ্মা নির্ণয়ে নামানো হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি সংযোজিত ভ্রাম্যমাণ গাড়ি। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা যক্ষ্মা রোগীদের চিহ্নিত করে চিকিৎসার আওতায় আনতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এ গাড়িগুলো। যক্ষ্মার সংক্রমণ থাকতে পারে এমন এলাকায় এ গাড়িগুলো পৌঁছে যাবে সব ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে। ফলে যক্ষ্মা রোগীরা নিজেদের বাড়িতে বসেই পাবেন বিনামূল্যে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সুবিধা।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্যমতে, আগামী ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে প্রাথমিক ভাবে চারটি ভ্রাম্যমাণ গাড়ি রাস্তায় নামানো হবে। যার দুটি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এবং দুটি কক্সবাজারে যক্ষ্মা নির্ণয়ে কাজ করবে। এক্সরে ও জিন এক্সপার্ট মেশিন সংযুক্ত বিশেষ ধরনের গাড়ি নগরীর যক্ষ্মাপ্রবণ এলাকা, গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি, কল-কারাখান ও জেলখানায় গিয়ে সেখানকার লোকদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। তবে কক্সবাজারে যে দুটি গাড়ি যাবে সেগুলো স্থানীয়দের পাশাপাশি রোহিঙ্গা আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতেও প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যক্ষ্মা একটি মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি। যা সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে চারপাশের সব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যে ক’টি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের যে ৩০টি দেশে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা সর্বাধিক, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এখনও দেশের ২৬ ভাগ যক্ষ্মারোগী নির্ণয়ের বাইরে রয়ে গেছে। আবার ২০৩৫ সালের মধ্যে ‘এন্ড টিবি’ কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, যক্ষ্মা সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য হলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, অপুষ্টি, দারিদ্র্য প্রভৃতি কারণে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১০ দশমিক ৪ মিলিয়ন মানুষ নতুনভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন। এবং ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষ এ রোগে মৃত্যুবরণ করছেন। যক্ষ্মার এ ভয়াবহতার কারণে ১৯৯৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ রোগটিকে গ্লোবাল ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে নতুন যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুহার ছিল প্রতি লাখে যথাক্রমে ২২১ এবং ৩৬ জন। মোট সংখ্যার হিসাবে যা ৩ লাখ ৬৪ হাজার এবং ৫৯ হাজার। যক্ষ্মা রোগে মৃত্যুর হার ২০০১ সাল থেকে প্রায় ৫০ ভাগ কমানো সম্ভব হয়েছে। চিকিৎসা নিরাময়ের হার গত ১০ বছর ধরে ৯০ শতাংশের বেশি আছে। যা ২০১৮ সালে ছিল ৯৬ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশ ১ লাখ জনসংখ্যায় ২২১ যক্ষ্মারোগী আছেন। ২০১৮ সালে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৫৯৬ জন রোগীকে শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার আওতায় আনা হয়েছে। যা অনুমিত যক্ষ্মা রোগীর শতকরা ৭৪ ভাগ।

স্বাস্থ্য অধিদতর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি যক্ষ্মা নির্মূলে এবং যক্ষ্মার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও জোরদার করতে বিভিন্ন কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেছে। সেই কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে চালু হতে যাচ্ছে ভ্রাম্যমাণ গাড়ি বা মোবাইল ভ্যান কার্যক্রম।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের টিবি-ল্যাপ্রোসি এবং এইডস/এসটিডি কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. শামিউল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, যাদের দুই সপ্তাহ বা তার অধিক সময় কাশি আছে এমন ব্যক্তিদের এক্সরে ও জিন এক্সপার্ট মেশিনের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো জরুরি। এ প্রেক্ষাপটে সরকার, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় ৪টি মোবাইল এক্সরে ইউনিটের মাধ্যমে যক্ষ্মারোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের উদ্যোগ নিয়েছে। এ কর্মসূচিতে সরকারকে সহায়তা করছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ গাড়িগুলোতে অত্যাধুনিক ডিজিটাল এক্সরে ও জিন এক্সপার্ট মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে শহরাঞ্চলে বস্তি এলাকা, পেরি আরবান এলাকা, ফ্যাক্টরি ও কারাগারে নির্দিষ্ট মেয়াদে যক্ষ্মারোগ শনাক্তকরণ ও যক্ষ্মা আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসা কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। অধ্যাপক শামিউল বলেন, সহজ উপায়ে যক্ষ্মারোগ শনাক্তকরণে উন্নত ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির জিন-এক্সপার্ট মেশিনের ব্যবহার ও দেশব্যাপী সম্প্রসারণ, বিনামূল্যে যক্ষ্মারোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান, প্রয়োজনী ওষুধ, যন্ত্রপাতি (যেমন : মাইক্রোস্কোপ) প্রদান এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে যক্ষ্মা রোগ সেবার আওতায় আনাই এ কার্যক্রমের প্রধান উদ্দেশ্য। এ সমন্বিত কর্মসূচি সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত ‘এন্ড টিবি’ লক্ষমাত্রা অর্জনে সফল হব।

২০১৫ সালের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যক্ষ্মার মহামারীকে আলোকপাত করার জন্য একটি নতুন কৌশল অনুমোদন করে। এ কৌশল একটি উচ্চাভিলাষী নতুন দিকনির্দেশনা যা ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্ব থেকে যক্ষ্মারোগে মৃত্যুহার ৯০ শতাংশ (বেজ লাইন ২০১৫ সালের তুলনায়) কমাবে এবং নতুনভাবে সংক্রমিত যক্ষ্মা রোগীর হার ৮০ শতাংশ (বেজ লাইন ২০১৫ সালের তুলনায়) কমিয়ে আনবে। এর সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক থাকবে যা ২০২৫ সালের মধ্যে অর্জন করতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×