জাকাত ফান্ডের সংগ্রহ দিন দিন বাড়ছে

গত বছরের সংগ্রহ ছিল ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা * এবার টার্গেট ১০ কোটি টাকা * সংগ্রহ বাড়াতে ১০ শতাংশ প্রণোদনার ঘোষণা

  উবায়দুল্লাহ বাদল ০৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের বিত্তবানদের কাছ থেকে জাকাত আদায় করে তা হতদরিদ্রদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বিতরণের কাজ করে ইসলামী ফাউন্ডেশনের অধীন জাকাত বোর্ড। গত ১০ বছরে বোর্ডটি প্রায় ২৫ কোটি টাকার জাকাত সংগ্রহ করে হতদরিদ্রদের কল্যাণে বিতরণ করেছে। চলতি বছরও ১০ কোটি টাকার জাকাত সংগ্রহের টার্গেট করে কাজ করছেন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সংগ্রহ বাড়াতে ইতিমধ্যে আদায়কারীদের মোট আদায়ের ১০ শতাংশ প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বোর্ড। জনসচেতনতা ও প্রচার বাড়ালে এ সংগ্রহের পরিমাণ আরও বাড়বে বলেও মনে করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন জাকাত ফান্ডের পরিচালক মাহাবুব আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবছরই জাকাত সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ছে। গত বছর জাকাত আদায় হয়েছিল ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকার উপরে। এবার আমাদের টার্গেট ১০ কোটি টাকা। আগামী অক্টোবর-নভেম্বরে এর পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে।’

সংগ্রহ বাড়াতে কোনো বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রচার আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি গত বছর থেকে জাকাত আদায়কারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আদায়কৃত অর্থের ১০ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে; যা ইসলামী বিধানসম্মত। এবার টার্গেট পূরণ হবে বলে আশা করছি।’

১৯৮২ সালের ৫ জুন সরকার এক অধ্যাদেশ বলে জাকাত ফান্ড গঠন করে। এ ফান্ড পরিচালনার জন্য ১৩ সদস্যবিশিষ্ট জাকাত বোর্ড গঠন করা হয়। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী পদাধিকার বলে ফান্ডের সভাপতি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সদস্যসচিব হিসেবে কাজ করেন। জাকাত ফান্ড অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী ১৯৮২ সাল থেকে ৬৪ জেলায় বিত্তবানদের কাছ থেকে সংগৃহীত মোট অর্থের অর্ধেক জেলা জাকাত কমিটির মাধ্যমে গরিব ও অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

জাকাত ফান্ডের গত কয়েক বছরে জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট জাকাত সংগ্রহ হয়েছে ২৩ কোটি ২০ লাখ ৭৫ হাজার ৩৫৭ টাকা। উল্লিখিত সময়ে সংগ্রহের বিপরীতে জাকাত বণ্টন করা হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। যার মধ্যে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সংগ্রহ হয়েছে ৭৬ লাখ ৯৯ হাজার ৪৭৬ টাকা, বণ্টন হয়েছে ৭২ লাখ ৮ হাজার ১ টাকা। পরবর্তী ২০০৯-১০ অর্থবছরে সংগ্রহের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। ওই অর্থবছর জাকাত সংগ্রহ হয় এক কোটি ৪৬ লাখ ৭২ হাজার ৫৮ টাকা, যার পুরোটাই বণ্টন দেখানো হয়েছে। এর পরবর্তী অর্থবছরগুলো ধীর গতিতে বেড়েছে জাকাত সংগ্রহের পরিমাণ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাকাত সংগ্রহ হয় ৩ কোটি ২১ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫৫ টাকা, বণ্টন হয় একই পরিমান অর্থ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জাকাত সংগ্রহ হয়েছে ৩ কোটি ২৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জাকাত সংগ্রহ হয়েছে ৫ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজারের কিছু বেশি; যা বণ্টনের কার্যক্রম চলছে।

জানা গেছে, জাকাত ফান্ড ১৯৮২ সালে শুরু করেই বছরটিতে ১৫ লাখ ১২ হাজার ৩৭ টাকা সংগ্রহ করে। এরপর প্রতিবছরই বেড়েছে অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ। তবে বৃদ্ধিটা আশানুরূপ না।

এ প্রসঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সচিব কাজী নূরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘জাকাত দেয়া ইসলামের একটি মৌলিক কাজ। সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জাকাত আদায় করা ফরজ। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জাকাত ফান্ড কোরআন-হাদিসের আলোকে জাকাত সংগ্রহ করে হতদরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করছে। পত্র-পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এ বিষয়ে সরকার প্রচার করছে। তবে ব্যাপকভাবে এর প্রচার বাড়াতে পারলে আরও বেশি জাকাত সংগ্রহ করা যেত এবং আরও বেশি হতদরিদ্র মানুষ উপকৃত হতো।’

ইসলামী ফাউন্ডেশনের জাকাত ফন্ডের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আবদুল হাই মোল্যা বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমাদের জাকাত সংগ্রহের হার বাড়ছে। কিন্তু বাড়ার সে হার খুব বেশি নয়। আশা করছি আগামী অর্থবছরে আমাদের এ আদায় গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হবে। কারণ এবারই প্রথম আমরা ঘোষণা করেছি যে, যদি কোনো ব্যক্তি সরকারের জাকাত ফান্ডে জাকাতের অর্থ প্রদান করে, তবে প্রদানকারী যে ব্যক্তিই হোক সে ১০ শতাংশ সেখান থেকে পাবেন। এ ঘোষণায় সারা দেশ থেকে মাসিক সম্মানী পাওয়া প্রায় ৮০ হাজার মক্তব ইমাম ও সংশ্লিষ্টরা জাকাত সংগ্রহে কাজ করার সুযোগ পাবেন। এতদিন এ সুযোগ ছিল না। জাকাতের অর্থ পুরোটাই ফান্ডে জমা হতো এবং তা দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন হতো।

ইসলামী ফাউন্ডেশন সূত্র জানায়, এবার জাকাতের সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়েও মাইকিং, সেমিনার, ইফতার মাহফিল, ব্যানার ও ফেস্টুনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতদিন বিভাগীয় পর্যায়ে জাকাত সংগ্রহের হারের ওপর বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা ছিল। এখন তা বাড়িয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আনা হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শীর্ষ ১০ জাকাত সংগ্রহকারীদের দেয়া হবে বিশেষ পুরস্কার।

সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্টের (সিজেডএম) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ফসলি জমির মালিক থেকে ১ হাজার কোটি, মায়েদের গচ্ছিত স্বর্ণ অলংকারে ১০০ কোটি, ব্যাংকিং খাতে ১ হাজার ২৪০ কোটি, শিল্প কারখানা থেকে ১ হাজার কোটি টাকা জাকাত আদায় করা সম্ভব। এছাড়া সঞ্চয়পত্র ও বন্ড থেকে বছরে ৩ হাজার কোটি টাকা জাকাত আদায় করা সম্ভব। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার জন কোটিপতি রয়েছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশে জাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা। এর আড়াই শতাংশ হারে জাকাতের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে যে পরিমাণ মোট সম্পদ আছে তাতে প্রতি বছর ২৫ হাজার কোটি টাকা জাকাত আদায় করে বন্টন করা সম্ভব। সঠিকভাবে জাকাত আদায় করলে ১৫ বছরে দেশে জাকাত নেয়ার মতো কোনো মানুষ পাওয়া যাবে না। কিন্তু অধিকাংশ ব্যক্তিই নিজের মতো করে জাকাত আদায় করে থাকেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×