ঈদে সড়ক যোগাযোগ

মহাসড়কের আতঙ্ক ৩ চাকার গাড়ি

২২ মহাসড়কে চলাচল নিষিদ্ধ হলেও মানা হচ্ছে না * গত ঈদে ১৫ দিনে ১৯৫টি দুর্ঘটনায় ২৪৯ জনের মৃত্যু, যার ১৮.২ শতাংশ তিন চাকার গাড়ির কারণে

  কাজী জেবেল ০৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদে মহাসড়কে মহা আতঙ্কের নাম তিন চাকার যানবাহন। লেগুনা, ভটভটি, নছিমন, করিমন ও টেম্পোর দাপটে অসহায় বাস মালিক ও চালকেরা। ২২টি মহাসড়কে এসব তিন চাকার গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ করা হলেও তা মানতে নারাজ তারা। এসব গাড়ির অনিয়মতান্ত্রিক চলাচলের কারণে মহাসড়কে বাড়ছে দুর্ঘটনা, ঘটছে প্রাণহানি। এতে বিষাদে রূপ নিচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঈদের আনন্দ। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সহায়তায় আইন ভেঙে এসব তিন চাকার গাড়ি চলাচল করছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে ও স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমরা ২২টি মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি চলাচল অনেক আগেই নিষিদ্ধ করেছি। ঈদে যাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন করা সংক্রান্ত সভায় ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে বিভাগীয় কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের দায়িত্ব দিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। তারাই মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি যাতে চলাচল না করে সে বিষয়টি দেখভাল করবে।

জানা গেছে, সর্বশেষ রোববার বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়কের উল্লাপাড়া উপজেলার বোয়ালিয়া বাজার এলাকায়। ওই এলাকায় একটি লেগুনা ও পাবনা এক্সপ্রেসের যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ওই ঘটনায় ১০ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন অন্তত দু’জন। এ মহাসড়কটিতে তিন চাকার গাড়ি লেগুনা চলার কথা নয়। তবুও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এ গাড়িটি চলছে। জানা গেছে, দুর্ঘটনার পর ওই মহাসড়কে কিছু সময়ের জন্য লেগুনা চলাচল বন্ধ ছিল। পরে আবার চালু হয়েছে। সোমবারও একই মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি চলাচল করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ওসি এসএম জিলানী যুগান্তরকে বলেন, তার আওতাধীন মহাসড়ক এলাকায় ৮৭টি ফিডার রোড রয়েছে। পুলিশের চোখ এড়িয়ে এসব ফিডার সড়ক থেকে মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি উঠে পড়ে। পুলিশ দেখলেই আবার তারা ফিডার সড়কে পালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, গত ছয় মাসে ২ হাজার তিন চাকার গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করেছি। এখনও ৫০টির বেশি গাড়ি থানায় আটক রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (এআরআই) তথ্যমতে, ঈদে বেপরোয়া গাড়ি পরিচালনা, মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি চলাচল, পথচারীসহ নানা কারণে দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। গত ঈদুল আজহায় ১৫ দিনে ১৯৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণহানি হয়েছে ২৪৯ জনের, আহত হয়েছেন ৫৯৬ জন। গত বছরের ১৫ আগস্ট থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনার ১৮ দশমিক ২ শতাংশ ঘটেছে তিন চাকার গাড়ির কারণে। আর বাসের কারণে ঘটেছে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ওই সময়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে কুমিল্লা, গাজীপুর ও ঢাকা অঞ্চলে।

এআরআইয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুব আলম তালুকদার যুগান্তরকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের পরিবারের ঈদ আনন্দ মাটিতে মিশে যায়। শুধু তাই নয়, পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে সারা জীবন ওই পরিবারটি পথে বসে যায়। তিনি বলেন, মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি চলতে দেয়া উচিত নয়। আর ঈদের সময় কোনোভাবেই এসব গাড়ি মহাসড়কে উঠতে দেয়া যাবে না। উঠলেই দুর্ঘটনা ঘটবে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এসব গাড়ির বেশিরভাগের লাইসেন্স ও ফিটনেস নেই। চালকের নেই যোগ্যতা ও দক্ষতা। ঈদে মহাসড়কে দ্রুতগতিতে গাড়ি চলে। কিন্তু এসব তিন চাকার গাড়ির গতি কম, চালকেরা যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করে। এতেই দুর্ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, যে ২২টি মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার বেশিরভাগ মহাসড়কে এসব গাড়ি চলছে। গাজীপুর, ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গের রংপুর থেকে পঞ্চগড়, দক্ষিণবঙ্গের রাজবাড়ী থেকে মাগুরা, বরিশাল ও যশোরে চলছে এসব গাড়ি।

মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি চলার নেপথ্যে স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধির ইন্ধন রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমরা বারবার দাবি জানানোর পর তিন চাকার গাড়ি মহাসড়কে নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু অনেক এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তা মানতে চান না। তাদের মতে, তিন চাকার গাড়ি চলাচল বন্ধ হলে স্থানীয়দের যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। এই কারণ দেখিয়ে তারা এসব গাড়ি চলতে দিচ্ছেন।

আর সোহাগ পরিবহনের মালিক ফারুক তালুকদার সোহেল যুগান্তরকে বলেন, মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি চলাচল বন্ধের পরপরই দুর্ঘটনা কমে এসেছিল। এখন অনেক মহাসড়কে আবার ওইসব গাড়ি ফিরে আসছে। এগুলো কম গতির গাড়ি, হঠাৎ করে গ্রামের রাস্তা থেকে মহাসড়কে উঠে আসছে, হঠাৎ করে ডানে বা বায়ে টার্ন নিচ্ছে। এতে দুর্ঘটনা হচ্ছে।

জানা গেছে, সরকার মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমাতে ২০১৫ সালে ২২টি মহাসড়কে এসব গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ করেছিল। ওই সময়ে এসব গাড়ির বিরুদ্ধে জোরশোরে তৎপর হয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বর্তমানে বিভিন্ন কারণে ওই তৎপরতা কমে গেছে বলে মালিক ও চালকদের অভিযোগ রয়েছে। যে মহাসড়কগুলোতে তিন চাকার গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ সেগুলো হল: (মহাসড়কের নম্বর) এন ১-কাঁচপুর সেতু (ঢাকা)-মদনপুর-কুমিল্লা- ফেনী-চট্টগ্রাম-রামু (কক্সবাজার), এন ২-কাঁচপুর সেতু (ঢাকা)-ভেলানগর (নরসিংদী)-ভৈরব-সরাই-মাধবপুর-মিরপুর-শেরপুর-সিলেট বাইপাস, এন ৩-জয়দেবপুর চৌরাস্তা-ময়মনসিংহ বাইপাস পয়েন্ট, এন ৪-জয়দেবপুর চৌরাস্তা-টাঙ্গাইল-জামালপুর, এন ৫-আমিনবাজার সেতু (ঢাকা)-মানিকগঞ্জ-পাটুরিয়া ঘাট-খয়েরচর ঘাট-কাশিনাথপুর-হাটিকুমরুল-বগুড়া বাইপাস-রংপুর বাইপাস-সৈয়দপুর বাইপাস-দশমাইল (দিনাজপুর)-ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা, এন ৬-কাশিনাথপুর (পাবনা)-পাবনা বাইপাস-দাশুড়িয়া-নাটোর বাইপাস-রাজশাহী বাইপাস-নবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ-বালিয়াদীঘি স্থলবন্দর, এন ৭-দৌলতদিয়া-ফরিদপুর (রাজবাড়ী মোড়)-মাগুরা-ঝিনাইদহ বাইপাস-যশোর বাইপাস-খুলনা সিটি বাইপাস-মোংলা, এন ৮-তেঘরিয়া মোড় (ঢাকা)-মাওয়া-কাওড়াকান্দি-ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী, এন ১০২- ময়নামতি (কুমিল্লা)-ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাইপাস-সরাইল, এন ১০৫-মদনপুর-ভুলতা-মিরেরবাজার-ভোগড়া-কড্ডা (ঢাকা বাইপাস), এন ৪০৫-এলেঙ্গা-নলকা-হাটিকুমরুল, এন ৫০২-বগুড়া-নাটোর, এন ৫০৬-রংপুর-কুড়িগ্রাম, এন ৫০৭-হাটিকুমরুল-বনপাড়া, এন ৫০৯-লালমনিরহাট-বুড়িমারী, এন ৫৪০- নবীনগর-ইপিজেড-চন্দ্রা, এন ৭০২-যশোর-মাগুরা, এন ৭০৪ ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া-দাশুড়িয়া, এন ৭০৬-চাঁচড়া মোড় (যশোর)-বেনাপোল, এন ৮০৪ ও ৮০৮-ভাঙ্গা-ফরিদপুর বাইপাস-রাজবাড়ী মোড়, এন ৮০৫ ভাঙ্গা-ভাটিয়াপাড়া-মোল্লারহাট-ফকিরহাট-নোয়াপাড়া এবং এন ৮০৬-ভাটিয়াপাড়া-কালনা-লোহাগড়া-নড়াইল-যশোর।

প্রসঙ্গত দেশের আড়াই লাখ কিলোমিটার জাতীয়, আঞ্চলিক, জেলা ও গ্রামীণ সড়ক রয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন সড়ক-মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ২১ হাজার কিলোমিটার। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×