স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মচারীর কাণ্ড

আদালতের নির্দেশ গোপন করে স্বপদে ১১ বছর

এটি আদালত অবমাননা অবশ্যই অপরাধ-ব্যারিস্টার শফিক * যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে-স্বাস্থ্যমন্ত্রী

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আদালতের নির্দেশ গোপন করে স্বপদে ১১ বছর

বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক কর্মচারীকে ২০০৮ সালে সুনামগঞ্জে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

কিন্তু নির্দেশিত স্থানে যোগ না দিয়ে তিনি বদলি আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট মামলা করেন। আদালত মামলাটি খারিজ করলে ওই কর্মচারী সুকৌশলে উচ্চ আদালতের সেই আদেশ গোপন করেন।

আদালতের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ১১ বছর ধরে একই কর্মস্থলে একই পদে কাজ করছেন তিনি। ওই কর্মচারীর নাম কবির আহমেদ চৌধুরী। তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ৫ মে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. একেএম জাহাঙ্গীর চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘জনাব কবির আহমেদ চৌধুরী, প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে (প্রশাসন-৩) প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিভিল সার্জন কার্যালয় সুনামগঞ্জের শূন্য পদে বদলি করিয়া বহাল করা হইল। এই প্রজ্ঞাপন প্রশাসনিক কারণে জারি করা হইল এবং প্রজ্ঞাপন জারির ৭ (সাত) দিনের মধ্যে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করিতে হইবে। অন্যথায় ৮ম দিনের দিন সরাসরি অব্যহতি পাইয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’

এ আদেশের বিরুদ্ধে একই দিন কবির আহমেদ চৌধুরী উচ্চ আদালতে মামলা (রিট পিটিশিন নং-৩৮০০-২০০৮) করেন। বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন (বর্তমান প্রধান বিচারপতি) এবং বিচারপতি ফরিদ আহমেদের আদালতে করা এ মামলাটি ওই বছরের ২৫ মে আদালত খারিজ করে দেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মামলা খারিজ হওয়ার বিষয়টি কবির আহমেদ চৌধুরী গোপন করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি নিজের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করেন বলে যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে সদ্য অবসরে যাওয়া এক কর্মকর্তা। তিনি যুগান্তরকে বলেন, অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি আইন শাখা রয়েছে। যেখানে অধিদফতরের মামলা ও আইনগত বিভিন্ন বিষয় দেখভাল করা হয়।

কবির আহমেদ চৌধুরী আইন শাখার সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে এ আদেশ গোপন করে রাষ্ট্র ও আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে প্রতারণার আশ্রয় নেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিজের সব অপকর্ম গোপন করে কবির চৌধুরী মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টার অনুকম্পা নিয়ে বদলি আদেশ প্রত্যাহার করান। এভাবে স্বপদে ফিরে তিনি আরও বেশি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। আদালতের নির্দেশ গোপন করা কী ধরনের অপরাধ জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সোমবার বিকালে মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে বলেন, আদালতের নির্দেশ গোপন করার অর্থ হল সুস্পষ্টভাবে আদালত অবমাননা। এটি অবশ্যই অপরাধ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক রোববার তার দফতরে যুগান্তরকে বলেন, সরকারি নির্দেশ ও আদালতের নির্দেশ অমান্য করা অবশ্যই অপরাধ।

এমন অপরাধ যদি কেউ করে থাকে তবে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক নিয়মানুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ভালো কাজে মনোনিবেশ করেছে। এক্ষেত্রে যারা এসব কাজে বাধা দেবে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ ও অসাধু চক্রের বাণিজ্য বিষয়ে মন্ত্রণালয়, অধিদফতরসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা মো. জামাল উদ্দিন।

এতে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতিবাজ অসাধু চক্র নানা অপকর্ম করে আসছে। তারা সংঘবদ্ধ হওয়ায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে সাহস করে না।

অধিদফতরের সব ধরনের নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য, আউট সোর্সিং জনবল সরবরাহ ও ঠিকাদারিসহ সব ধরনের অপকর্মে এরা জড়িত। এ চক্রের অন্যতম সদস্য আবজাল হোসেনের কিছু অপকর্ম ফাঁস হয়েছে।

কিন্তু চক্রের আরেক প্রভাশালী সদস্য কবির আহমেদ চৌধুরী কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় বসে সব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন প্রশাসন শাখায় চাকরি করায় তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই তাকে বদলি করার হুমকি দেয়।

জানতে চাইলে কবির আহমেদ চৌধুরী মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ সত্য নয়। আমি অধিদফতরের নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের সঙ্গেও জড়িত নই। এমনকি অধিদফতরে কেউ নিয়োগ বা বদলি বাণিজ্য করেন কিনা তাও জানি না। কবির আহমেদ চৌধুরী বলেন, তিনি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এই পদে (প্রশাসনিক কর্মকর্তা) কাজ করছেন।

তবে আদালতের নির্দেশনা গোপন করার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। মোবাইল ফোনে কথা বলার কিছুক্ষণ পরে কবির আহমেদ চৌধুরী যুগান্তর কার্যালয়ে উপস্থিত হন। এ সময় তিনি প্রথম শ্রেণীর বদলি এবং ৩য় ও চতুর্থ শ্রেণীর নিয়োগসংক্রান্ত কমিটির নথি উপস্থাপন করেন।

এসব দিয়ে তিনি বোঝাতে চান, নিয়োগ বদলিতে তিনি যুক্ত নন। আর আদালতের নির্দেশনা গোপন করার প্রসঙ্গ তুললে এবারও তা এড়িয়ে যান তিনি। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, ঘটনাটি বেশ আগের। তখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। তাই বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আইন শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: juga[email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×