সেবিকা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হল না ইভা-সানজিদার

মেয়ের জন্মদিন পালন করতে গিয়ে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরলেন মনোয়ারা * কাওছারের শোকে পাথর মামা

  সিলেট ব্যুরো ও কুলাউড়া প্রতিনিধি ২৫ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেবিকা

ফাহমিদা ইয়াসমিন ইভা (২০) ও সানজিদা আক্তার (২১)। দু’জনেরই স্বপ্ন ছিল সেবিকা হওয়ার। এ জন্য ভর্তি হয়েছিলেন সিলেট নার্সিং কলেজে। দুই বিভাগের হলেও কলেজে ভর্তির পর একে অপরের আপন হয়ে ওঠেন।

বিএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছেন তারা। আর এক বছরের অপেক্ষা ছিল। কিন্তু বিধি বাম, দু’জনের সেবিকা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হল না। রোববার রাতে সিলেট থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনায় একসঙ্গে নিহত হন দুই বান্ধবী।

জানা যায়, একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার জন্য বান্ধবীর সঙ্গে ঢাকা যাচ্ছিলেন ইভা। তিনি সিলেটের দক্ষিণ সুরমার জালালপুরের আবদুল্লাহপুর গ্রামের আবদুল বারীর মেয়ে। আর সানজিদা আক্তার বাগেরহাট জেলার মোল্লার হাট থানার আতজুরি ভানদর খোলা গ্রামের মো. আকরাম মোল্লার মেয়ে।

তিন ভাই-বোনের মধ্যে ইভা সবার ছোট। তাকে অকালে হারিয়ে পরিবারটিতে চলছে শোকের মাতম। সোমবার দুপুরে কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইভার লাশ নিতে এসেছিলেন তার ভাই আবদুল হামিদ। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আবদুল হামিদ বলেন, সেবিকা হয়ে মানুষের সেবা করতে চেয়েছিল ইভা। তার সে স্বপ্ন আর পূরণ হল না।

তিনি বলেন, রাত ১০টার দিকে সিলেট রেল স্টেশন ছাড়ে উপবন এক্সপ্রেস। ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণ আগে মাকে ফোন করে ঢাকা যাওয়ার খবর জানায় ইভা। বান্ধবীর সঙ্গে প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকায় যাওয়ার কথা বলেছিল। এটা আমাদের সঙ্গে তার শেষ কথা। আজ (সোমবার) বিকালেই পারিবারিক কবরস্থানে বোনের দাফন হবে।

এদিকে কুলাউড়া থেকে বেলা ৩টায় সানজিদা আক্তারের লাশ অ্যাম্বুলেন্সে সিলেট নার্সিং কলেজে নেয়া হয়েছে। এ সময় হৃদয়বিদায়ক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রিয় সহপাঠীদের হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিক্ষার্থীরা। আর মেধাবী দুই শিক্ষর্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ শিক্ষক-শিক্ষিকারা। কলেজের শিক্ষিকা মিনারা বেগম বলেন, দু’জনই মেধাবী ছিল। খুবই ভালো ছিল ওরা। এ মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।

এ সময় কলেজের আরেক শিক্ষক আকতারুজ্জামান পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলছিলেন। তিনি বলেন, ওদের পরীক্ষা হয়ে গেছে। রেজাল্ট দেব। কলেজের খাতায় ফলাফলও থাকবে। কিন্তু থাকবে না ওরা।

নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ ফয়সল আহমদ চৌধুরী জানান, সানজিদার মরদেহ ওসমানী হাসপাতালের মরচ্যুয়ারিতে রাখা হবে। পরিবারের সদস্যরা আসার পর মঙ্গলবার সকালে (আজ) মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।

অধ্যক্ষ ফয়সল আহমদ চৌধুরী আরও বলেন, পারিবারিক কাজের কথা বলে ফাহমিদা ইয়াসমিন ইভা রোববার হোস্টেল থেকে ছুটি নিয়ে গিয়েছিল। সানজিদা হোস্টেলে থাকে না। তাই সে ছুটিও নেয়নি। তাদের ঢাকায় যাওয়ার তথ্যও আমাদের কাছে ছিল না। সোমবার সকালেই বিভিন্ন মাধ্যমে দু’জনের নিহত হওয়ার খবর পাই।

সানজিদার মা সোমবার বিকালে যুগান্তরকে জানান, আমরা ঢাকায় আছি। সিলেট আসতেছি। তিনি আরও জানান, রোববার সন্ধ্যায় ফোনে সানজিদা জানায়, এক বান্ধবীর সঙ্গে ‘ও’ ঢাকা যাচ্ছে। রাতে আর কোনো ফোন না পেয়ে সকালে কল দিয়ে ওর মোবাইল বন্ধ পাই। এরপর খোঁজ নিয়ে জানতে পারি আমার সব শেষ।

মেয়ের জন্মদিন পালন করতে গিয়ে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরলেন মনোয়ারা, কাওছারের শোকে পাথর মামা : দুর্ঘটনায় নিহত কুলাউড়া পৌরসভার টিটিডিসি এলাকার বাসিন্দা মনোয়ারা পারভীনের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। তার স্বামী আবদুল বারি জানান, সিলেট থেকে ট্রেনে উঠার পর তার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। বরমচাল স্টেশন অতিক্রম করার সময় মেয়ে ফোন করে বলে, বাবা ট্রেনের নিচে মায়ের গলা আটকে আছে। মাকে বের করতে না পারলে তিনি মারা যাবেন, জলদি আসো বাবা।

মেয়ের ফোন পাওয়ার পর পাগলের মতো ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে মনোয়ারার মস্তকবিহীন শরীর উদ্ধার করি। শরীর থেকে মাথাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। পরে মাথাটি উদ্ধার করি।

মনোয়ারা পারভীন বড় মেয়ে ইসরাত মুন্নির জন্মদিন পালন করতে সিলেট শহরের পাঠানটুলা (মেয়ের শ্বশুরবাড়ি) গিয়েছিলেন। রোববার ছিল মেয়ের জন্মদিন। জন্মদিন পালন করে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। তিনি বাড়ি ফিরলেন, তবে লাশ হয়ে।

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার ডবলডহর গ্রামের কাওছার আহমদ সিলেটে একটি মোবাইল ফোনের দোকানে কাজ করতেন। সেখান থেকে ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশে সিলেট থেকে আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেসে উঠেছিলেন। এই ট্রেন দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে কাওছারের জীবন প্রদীপ। কাওছারের লাশ নিতে এসেছিলেন মামা লতিফ বাবুর্চি। শোকে পাথর লতিফ বাবুর্চি বলেন, বাবা-মাহারা ভাগ্নে যে এত তাড়াতাড়ি চিরতরে আমাদের ছেড়ে যাবে তা ভাবতে পারিনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×