সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

রান্না করা খাবার দেয়ায় বেড়েছে উপস্থিতি

বাস্তবায়নে আছে নানা চ্যালেঞ্জ * তিন দিন গরম খাবার ও তিন দিন বিস্কুট দেয়ার চিন্তা

  মুসতাক আহমদ, বামনা (বরগুনা) থেকে ফিরে ৩০ জুন ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বরগুনার বামনা উপজেলার দক্ষিণ সফিপুর গ্রাম। সেখানকার ৪৯নং দক্ষিণ সফিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১৪২ জন। যাদের সবাই বিদ্যালয়ে উপস্থিত। শুধু এই বিদ্যালয়ই নয়, ২৬ জুন বামনার আরও দুটি স্কুলে সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি গড়ে ৯৮ শতাংশ।

প্রধান শিক্ষক পিয়ারা বেগম জানান, একটা সময়ে এই এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের অর্ধেক থেকে সর্বোচ্চ তিন-চতুর্থাংশ উপস্থিত হতো নিয়মিত ক্লাসে। কিন্তু ৬ বছর ধরে উপস্থিতি প্রায় শতভাগ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দারিদ্র্য ম্যাপ অনুযায়ী আর্থিকভাবে অসচ্ছল অঞ্চলগুলোর একটি বরগুণার বামনা। এলাকার মানুষের বেশিরভাগ পেশায় জেলে, দিনমজুর, কৃষক ও কৃষি শ্রমিক, গার্মেন্ট শ্রমিক, রিকশা-অটোচালক ইত্যাদি। অনেকেই বাড়তি আয়ের প্রত্যাশায় সন্তানকে স্কুলে না পাঠিয়ে নিজের সঙ্গে কাজে নিয়ে যেতেন। এছাড়া ঘরে খাবার না থাকায় কেউ কেউ ক্ষুধার কারণে স্কুলে নিয়মিত আসত না। আবার যারা আসত তাদের অনেকেই মধ্যাহ্ন বিরতিতে স্কুল থেকে পালাত। ফলে শিশুদের উপস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক হারে কম।

পিয়ারা বেগম আরও জানান, ২০১০ সালে স্কুলে শিক্ষার্থীদের বিস্কুট দেয়ার কর্মসূচি শুরুর পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। বিভিন্ন স্কুলে ভর্তির হার বেড়েছে। ২০১৩ সালে রান্না করা খাবার দেয়ার পর উপস্থিতি আরও বেড়ে যায়।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের (ক্যাম্পে) উপ-পরিচালক কেএম এনামুল হক যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে দেশের ১০৪টি উপজেলায় শিক্ষার্থীদের স্কুলে খাবার দেয়া হচ্ছে। এরমধ্যে ৯৩টি উপজেলায় সরকারি অর্থায়নে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু আছে। এই কর্মসূচির অধীনে শিশুদের উচ্চ পুষ্টির বিস্কুট দেয়া হয়। বাকি উপজেলায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) অধীনে স্কুল মিল কার্যক্রম আছে। এই কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের দুপুরে স্কুলে রান্না করা খাবার দেয়া হচ্ছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, স্কুলে বিস্কুটের পরিবর্তে রান্না করা খাবার দেয়ার জন্য দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কয়েক বছর ধরে সুপারিশ করা হচ্ছে। গত ৬-৭ বছর ধরে এ ব্যাপারে চাপ দেয়া হলেও সম্ভাব্য নানা সমস্যার কথা বিবেচনা করে সরকার রাজি হচ্ছিল না।

এমন পরিস্থিতিতে ডব্লিউএফপি’র কর্মসূচিভুক্ত দুটি উপজেলায় ২০১৩ সাল থেকে রান্না করা খাবার দেয়ার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করা হয়। ওই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের পর দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলো সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, কর্মসূচি শুরু করা হলে শিশুর ক্ষুধা নিবারণ অপেক্ষাকৃত বেশি হবে। কেন না, বিস্কুট পুষ্টি দূর করলেও ক্ষুধা নিবারণে ভূমিকা কম রাখে।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে বামনার তিন স্কুলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছে জানা যায়, স্কুলমিল কর্মসূচির আওতায় ৬ দিনের মধ্যে ৫ দিনই খিচুড়ি দেয়া হয়। এরমধ্যে আবার এক দিন দেয়া হয় ডিম। ষষ্ঠ দিন বা বৃহস্পতিবার বিস্কুট দেয়া হয়। দক্ষিণ সফিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র ও স্টুডেন্ট কেবিনেটের সভাপতি মেহেদী হাসান ইমন জানায়, খিচুড়ি এবং বিস্কুট দুটিই তাদের ভালো লাগে। তবে একটানা ৫ দিন খিচুড়ি দেয়ার কারণে সবাই তার সবটুকু খায় না। অনেকে কিছু খেয়ে বাকিটা বাড়ি নিয়ে যায়। কিন্তু বৃহস্পতিবার সবাই আগ্রহ নিয়ে বিস্কুট খায়। ওইদিন স্কুলে উপস্থিতিও বেশি থাকে।

জানা গেছে, ওই উপজেলার বেশিরভাগ স্কুলই দুই শিফটের। প্রথম শিফটে শিশু, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্লাস হয়। পরের শিফটে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ক্লাস। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে প্রথম শিফটের এবং দেড়টায় ‘লেইজার’ সময়ে পরের শিফটের শিশুদের খিচুড়ি দেয়া হয়। খিচুড়ি রান্নার জন্য প্রত্যেক স্কুলে একজন করে বাবুর্চি এবং একজন বাবুর্চির সহকারী নিয়োগ করা হয়েছে।

এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ‘সুশীলন’ নামে স্থানীয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে। স্থানীয় পর্যায় থেকে চাল সংগ্রহ করে তা পুষ্টিসমৃদ্ধ করা হয়। এরপর বস্তা ভর্তি করে পাঠানো হয় স্কুলে। সঙ্গে দেয়া হয় তেল এবং ডাল। সুশীলনের সরকারি পরিচালক শেরিনা আকতার বলেন, এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিভিন্ন ধরনের ইতিবাচক দিক আছে। এরমধ্যে আছে স্কুলে শিশুদের আকৃষ্ট করা। দারিদ্র্যপ্রবণ এই এলাকার অনেক শিশুই সকালে পর্যাপ্ত খাবার স্কুলে পায় না। তাই স্কুলে তাজা খাবার তাদেরকে আকৃষ্ট করে। আমাদের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৪ সালে যেখানে স্কুলে গড়ে উপস্থিতি ছিল ৮৮ শতাংশ, সেখানে বর্তমানে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত। এছাড়া ঝরেপড়া হ্রাস পেয়েছে।

তবে ২৬ জুন সরেজমিন পরিদর্শনকালে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের কথা জানা গেছে। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে- চাল-ডাল-তেল সংরক্ষণ, রান্না করা এবং সুশাসন। চাল থাকে স্কুলের শিক্ষকের কাছে। গত কয়েক বছরে ওই চাল-ডাল-তেল লোপাট করে শিক্ষকের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার মতো অন্তত তিনটি ঘটনা ধরা পড়েছে। নাম প্রকাশ না করে অভিভাবকদের অভিযোগ- তেল, লবণ ও ডাল বাঁচিয়ে কোনো কোনো শিক্ষক বাড়িতে নিয়ে যান। এতে খাবারটি সুস্বাদু হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা খেতে চায় না। শিক্ষার্থী উপস্থিতি কম থাকলেও শত ভাগ দেখানো হয় মূলত খিচুড়ির সামগ্রী লোপাটের জন্য।

স্কুলমিল কার্যক্রম সামনে রেখে ২৬ জুন বামনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি মতবিনিময় সভা হয়। তাতে উল্লিখিত এই চ্যালেঞ্জগুলোর কথা তুলে ধরেন অভিভাবক ও স্থানীয় সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা। মনোতোষ হাওলাদার নামে একজন সাংবাদিক বলেন, যে খাবার দেয়া হয় তার মান খুবই নিু। তবে এই কর্মসূচির প্রয়োজন আছে।

ওই সভায় উপস্থিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিউলী বলেন, এটা একটি জনহিতকর কর্মসূচি। এটি প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। সব ক্ষেত্রেই কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে। তবে সেসব উত্তরণ সম্ভব।

ওই সভায় যোগ দেন সরকারের স্কুল ফিডিং কর্মসূচির উপ-প্রকল্প পরিচালক সোহেল আহমেদ। তিনি বলেন, বর্তমানে তিনটি উপজেলায় রান্না করা খাবার শিশুদের দেয়া হয়। আগামী সেপ্টেম্বরে ১৬ উপজেলায় সরকারের অর্থায়নে এই কর্মসূচি পাইলটিং ভিত্তিতে শুরু হবে। পরবর্তীতে সারা দেশে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা আছে।

উল্লেখ্য, ১০৪ উপজেলায় রান্না করা খাবার বিতরণে সরকারের বছরে ৮ হাজার কোটি টাকা লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত নীতি অনুযায়ী, ৬ দিনের মধ্যে ৩ দিন রান্না করা খাবার ও ৩ দিন বিস্কুট দেয়া হবে এক দিন পর পর। বর্তমানে চলমান বিস্কুট কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীপ্রতি ৮ টাকা করে খরচ হয়। রান্না করা খাবার দেয়া হলে বাজেট ১৮ টাকা হবে। প্রতি খাবারে একজন শিশুর দৈনিক শক্তি চাহিদার ৩০ শতাংশ এবং পুষ্টি চাহিদার ৫০ শতাংশ স্কুলের খাবারে নিশ্চিত করা হবে। এ জন্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেয়া হবে। বর্তমানে জামালপুরের ইসলামপুর, বরগুণার বামনা এবং বান্দরবানের লামায় রান্না করা খাবার দেয়ার কর্মসূচি চালু আছে।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত