ছাত্রলীগের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী-উপমন্ত্রীর রুদ্ধদ্বার বৈঠক

স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে

নিয়োগ, জমি ক্রয় ও উন্নয়নে দুর্নীতিসহ নানা সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে * উত্তরপত্র মূল্যায়নে বৈষম্য নিরসনে ওএমআর চালুর পরামর্শ * ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে অসহযোগিতার অভিযোগ প্রশাসনের বিরুদ্ধে * সমস্যা সমাধানে দুই সপ্তাহের মধ্যে ভিসিদের সঙ্গে বসছেন শিক্ষামন্ত্রী

  যুগান্তর রিপোর্ট ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাবলিক ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার করছেন। বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নিয়ে চলছেন অনেক ভিসি। চাকরিও দেয়া হচ্ছে ভিন্ন মতের লোকদের। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাংগঠনিক কাজেও করা হচ্ছে অসহযোগিতা। ছাত্রলীগ করায় নম্বর কম দেয়ার নজিরও আছে কোথাও কোথাও।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে বৈঠকে বসে বিশ্ববিদ্যালগুলোর ছাত্রলীগ নেতারা এসব অভিযোগ করেন। শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও উপস্থিত ছিলেন। ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে ছিলেন সংগঠনের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। সাম্প্রতিককালে শিক্ষার উন্নয়নে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে কোনো শিক্ষামন্ত্রী এই প্রথম রুদ্ধদ্বার বৈঠক করলেন। বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, অধিকাংশ বক্তাই ভিসি ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের প্রতি অসন্তোষ ও ক্ষোভ জানান। শুরুতে শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে কেবল একাডেমিক বিষয়ে কথা বলার জন্য বলেন। বৈঠকে ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ প্রতিনিধিরা যোগ দিলেও বক্তব্য দেন ১৪টির প্রতিনিধিরা। ছাত্রলীগ নেতাদের বক্তব্যে উঠে আসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক ও প্রশাসনিক নানা বিষয়। আবাসন, পরিবহন, ইন্টারনেট, কেন্টিন, লাইব্রেরি ও নিরাপত্তা সমস্যা ছাড়াও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ধীরগতি। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের চিত্র তুলে ধরে তারা বলেন, এখনও সনাতনী পদ্ধতিতে খাতা দেখা হয়, এর ফলে সহজেই শিক্ষকরা চিনতে পারেন শিক্ষার্থীদের। খাতা মূল্যায়নে সহজেই দুর্নীতি হয়। পরীক্ষায় কোডিং সিস্টেম চালুর পরামর্শ দিয়ে তারা বলেন, পরীক্ষার উত্তরপত্রে ওএমআর থাকলে এই অনিয়ম বন্ধ হবে। প্রকৃত মেধাবীরা ভালো করবে। তারা বলেন, ছাত্র সংসদ বন্ধ রাখা হয়েছে, বার বার বলার পরও নির্বাচন হচ্ছে না। অথচ ছাত্র সংসদ ফি নেয়া হচ্ছে। ওই অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতাও নেই।

বৈঠকে ইউজিসির (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) সক্ষমতা নিয়েও কথা হয়। বলা হয়েছে, এর যাত্রাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল কম। এখন কয়েক গুণ বেড়েছে, তাই তদারকি বাড়াতে বিদ্যমান কাঠামোতে সংস্কার করে এর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ইশাত কাসফিয়া ইরা যুগান্তরকে বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কী কী সমস্যা আছে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শিক্ষকদের ভূমিকা ছাড়াও শিক্ষকদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে।

গোলাম রাব্বানী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ অনেক সময় স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার করে। ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের নম্বর কম দেয়ার অভিযোগ করে তিনি বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক। ছাত্রলীগের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২০ হাজার আবাসন সুবিধা পাচ্ছে। একে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরে আরও হল নির্মাণ দরকার। আণবিক শক্তি কমিশনের দফতর আগারগাঁওয়ে স্থানান্তর করা করা হলেও নানা প্রক্রিয়ায় ওই জায়গাটি দখলে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ঢাবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির আধুনিকায়ন দরকার। ক্যাম্পাসের দুই পাশে দু’টি থানা আছে, তাই ক্যাম্পাসের ফাঁড়ি দুটির আর উপযোগিতা নেই। রাজধানীর ৭ কলেজ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ আছে। ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর বিষয়টি যেখানে পরিপূর্ণভাবে হচ্ছে না, সেখানে ৭ কলেজের বিষয়টি শিক্ষার্থীরা ঝামেলা হিসেবেই দেখছেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা অভিযোগ করেন, ছাত্রলীগ করার অপরাধে দলীয় নেতাকর্মীদের নম্বর কম দিতেন এমন শিক্ষক এখনও প্রভোস্টের দায়িত্বে আছেন। জামায়াতপন্থী ওই শিক্ষক বিএনপির সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাদের অভিযোগ হচ্ছে, ভিসি ক্যাম্পাসে থাকেন না। নিয়োগ পাওয়ার পর এক-চতুর্থাংশ দিনও তিনি ক্যাম্পাসে যাননি। গেলেও সকালের ফ্লাইটে গিয়ে বিকালের ফ্লাইটে ফিরে আসেন। তিনি একাই বিভিন্ন বিভাগে মোট ২৬টি কোর্স পড়ান। অন্য শিক্ষকদের কোর্স শেষ হলেও তারটা শেষ হয় না। কয়েক দিন রাত ২টা নোটিশ দিয়ে আড়াইটায়ও ক্লাস নিয়েছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে হোসনি মোবারক রিশাতসহ অনেকে বৈঠকে ছিলেন। একজন বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্টিন সমস্যা প্রকট। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গেটই বেদখল। ছাত্রদের আবাসন ব্যবস্থা নেই। কলেজ আমলের ১৮টি হোস্টেল উদ্ধারে উদ্যোগ নেই। ছাত্রী হলের নির্মাণ কাজ শেষ হচ্ছে না। পরিবহন সংকট আছে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠানের জমি কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ করে বলেন, এতে প্রশাসনের লোক জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন ও পানি সংকট প্রকট। হলে নিুমানের খাবার দেয়া হয়। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষও নেই। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি বলেন, নামে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হলেও পদার্থ-রসায়নের মতো বিভাগ নেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। নেই ইন্টারনেট সংযোগও। বাংলা বিভাগে ৫০ শিক্ষার্থীর জন্য আছে ১৩ শিক্ষক। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) প্রতিনিধিরা বলেছেন, ক্যাম্পাসে বিদ্যুৎ সমস্যা প্রকট। আগে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিত বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্পাসে পল্লী বিদ্যুতের স্টেশন বসানোর পর থেকে বিদ্যুতের সমস্যা শুরু হয়েছে। ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেয়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ধূমায়িত আছে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি সাম্প্রতিক নিয়োগ নিয়ে নানা অভিযোগ থাকার কথা উল্লেখ করে বলেন, ভেতরে বাজার বসছে, ফলে ক্যাম্পাস অরক্ষিত হয়ে আছে।

বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বক্তৃতা করেন। মন্ত্রী আগামী ১০ দিনের মধ্যে সমস্যাসমূহ লিখিত আকারে জানানোর নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব সমস্যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভিসিসহ অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। তবে ছাত্রনেতাদের টেন্ডার ও নিয়োগ নিয়ে মাথা না ঘামানোর পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। পাশাপাশি মাদক, সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ, যৌন হয়রানি ইত্যাদি প্রতিরোধের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেন। শিক্ষামন্ত্রী ক্যাম্পাসের যে কোনো সমস্যা আলোচনা করে সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রশাসন ব্যর্থ হলে তা নিয়ে তার (শিক্ষামন্ত্রী) সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না। উপমন্ত্রী বলেন, ছাত্র হিসেবে ছাত্রদের প্রধান কাজ হল লেখাপড়া করা এবং নিজের ক্যারিয়ার ও বাংলাদেশের অগ্রগতিতে অবদান রাখা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×