দক্ষ জনবলের অভাবসহ ১০ সমস্যা

কার্যকর হচ্ছে না মোংলা আধুনিক শস্য সাইলো

আইএমইডির প্রতিবেদন : সমীক্ষায় ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা, এ প্রকল্পের নেতিবাচক প্রভাবে ব্যাঙ, সাপ, কুমির ও বানরের অবাধ বিচরণ কমে গেছে

  হামিদ-উজ-জামান ২১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষ জনবলের অভাব এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকাসহ দশ সমস্যায় পড়েছে মোংলায় নির্মিত আধুনিক গ্রেইন সাইলো। ফলে ৫শ’ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত এ সাইলোটির পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এটি নির্মাণের ফলে এলাকায় পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। সাইলো এলাকায় জলজ ও স্থলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। জুনে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করেছে সংস্থাটি। এক্ষেত্রে দেয়া হয়েছে বিশ কিছু সুপারিশও।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইএমইডির সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, মোংলা সাইলোর খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার পূর্ণ ক্ষমতা অর্জনের জন্য মোংলা নদীর উপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি সেতু নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া সাইলো থেকে মোংলা পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২৫ কিলোমিটার ভারি যানবাহন চলাচল উপযোগী সড়ক নির্মাণ অতীব জরুরি। এ রকম বিভিন্ন সুপারিশসহ প্রতিবেদনটি পাঠানো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে সমস্যা সমাধানে যেসব ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন সেসব পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে আশা করছি।

আইএমইডি বলছে, বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে অষ্টম। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ এদেশে যুক্ত হচ্ছে। এ হিসাবে ২০৫০ সালে দেশের জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩২ কোটিতে। বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি লোক রয়েছে। এতে বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে নিরাপদ খাদ্য মজুদ প্রয়োজন। এজন্য আনুষঙ্গিক সব সুবিধাদিসহ মোংলা বন্দরসংলগ্ন জয়মনিরগোল এলাকায় ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি আধুনিক শস্য সাইলো নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য ‘কনস্ট্রাকশন অব এ কনক্রিট গ্রেইন সাইলো অ্যাট মোংলা পোর্ট উইথ অ্যানসিলারি ফ্যাসিলিটিজ’ নামের একটি প্রকল্প হাতে নেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। দেশের স্বাধীনতার পর আধুনিক ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতি দিয়ে নির্মিত ও ডিজিটাল অটোমেশন কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে পরিচালিত প্রথম এবং পূর্ণাঙ্গ সাইলো হচ্ছে এটি। ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি নির্মাণের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। প্রকল্পটি শেষ হয় ২০১৬ সালের জুনে। ফলে অতিরিক্ত সময় লেগেছে আড়াই বছর। অর্থাৎ ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৯৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছিল ৫৭৮ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় হয় ৩৭৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বা ১৮৯ শতাংশ বেশি। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির প্রস্তাবনায় বাস্তবায়ন কৌশল, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং পরিবীক্ষণ সংক্রান্ত নির্দেশনা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ ছিল না। প্রকল্পের মধ্যে কোনো স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর নেই। বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে কাজ বন্ধ থাকে। যন্ত্রপাতির উপযুক্ত ব্যবহার না হওয়ায় অকার্যকর হয়ে পড়ছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হওয়ায় সেবা নিশ্চিত করতে অসুবিধা হচ্ছে। সাইলো পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। মোংলা উপজেলায় নির্মিত সাইলোটি মূল ভূখণ্ড থেকে নদীর মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন। তাই যোগাযোগ ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ নয়। যেটুকু সড়ক যোগাযোগ রয়েছে তা প্রায় ভঙ্গুর। মোংলা নদীতে কোনো ব্রিজ নেই। গাড়ি পারাপারের জন্য ফেরি সার্ভিস আছে। কিন্তু তা জোয়ারভাটার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় চলাচলের সময় খুবই সংক্ষিপ্ত। বর্তমানে সড়ক ও ফেরি সার্ভিস ভারি যানবাহন নিয়মিত চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। তাই মোংলা সাইলো চালু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত পরিবহনে বোঝাই করার ক্ষমতা অর্ধেক। সড়ক পথে ট্রাকে খাদ্যশস্য সাইলো থেকে সরাসরি বোঝাই করার জন্য দুটি কনভেয়ার বেল্ট থাকলেও তা এখন পর্যন্ত ব্যবহার হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইলোটিতে ২৫ বা ৫০ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার জাহাজ থেকে সরাসরি খাদ্যশস্য নিউমেটিক আনলোডারের সাহায্যে সাইলোর বিনগুলোতে সরবরাহ করার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু অদ্যাবধি কোনো বড় জাহাজ খাদ্যশস্যসহ সাইলো জেটিতে ভিড়তে অনুমতি দেয়নি মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। কারণ নদীর প্রশস্ততা কম হওয়ায় জেটিতে বড় জাহাজ ভিড়লে তার পাশ দিয়ে বন্দরের অন্যান্য মালবাহী জাহাজ অতিক্রম করার সময় দুই জাহাজের নিরাপদ দূরত্ব কমে যায়। ফলে বহির্নোঙ্গর থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে আনলোডে করে খাদ্যশস্য সাইলোতে আনতে হচ্ছে। এ কারণে সাইলোর খাদ্য শস্য খালাসের মূল উদ্দেশ্য এখন পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেনি। সেই সঙ্গে অধিক সংখ্যক লাইটার জাহাজে মালামাল পরিবহন করায় নদীর পানি দূষণ হচ্ছে। মাছ ও অন্যান্য প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।

প্রতিবেদন তৈরির সময় পরিচালিত সমীক্ষায় অংশ নেয়া ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন সাইলো প্রকল্পের ফলে পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এছাড়া ব্যাঙ, সাপ, কুমির ও বানরের অবাধ বিচরণ কমে গেছে। সাইলো দফতরের ভেতর শব্দ দূষণ বেড়েছে। ফলে পরিবেশগত ভারাসাম্যহীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সাইলো দফতরটি নির্মাণের কারণে জলজপ্রাণী ও স্থলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রকল্পটির শুরুতে অধিগ্রহণ করা নিচু জমিতে বালু ভরাটের মাধ্যমে ভূমি উন্নয়নের কাজ করা হয়। অধিগ্রহণ করা জমির উপরিভাগের মাটি সংরক্ষণ না করেই বালি দিয়ে ভরাটের কারণে ঝড়ো বাতাসে প্রচুর বালু উড়ে যায় এবং অধিকাংশ জমির তলের উচ্চতা কমে যায়। সাইলো নির্মাণের ৩ বছর পরও মাটিতে ঘাস জন্মানো সম্ভবপর হয়নি। ফলে সাইলো ক্যাম্পাসের ভেতরের রাস্তার উপরিভাগ এবং ভূমির একই সমতলে যা বর্ষার সময় বৃষ্টির পানিতে ডুবে গিয়ে চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সাইলোতে ইলেক্ট্রো মেকানিকাল ডিভাইসগুলোর রুটিন রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।

প্রতিবেদন বেশ কিছু সুপারিশ দেয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আধুনিক প্রযুক্তির এ সাইলো সংশ্লিষ্ট সব বিষয় নিরবচ্ছিন্ন কার্যকর রাখতে প্রয়োজনী আর্থিক বরাদ্দের সঙ্গে জনবলকে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বাড়াতে হবে। একটি পেশাগত পদের চাহিদা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট ছকে জনবল নিয়োগ ও মোংলা সাইলোতে কমপক্ষে ৩ বছর অবস্থানের নিশ্চয়তা বিধানসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাগিং ও বিন হাইজে স্টিলের প্ল্যাটফর্মসহ ক্যাট লেডার দেয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি। পর্যাপ্ত সংখ্যক ফ্যান বা বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা রাখতে হবে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর প্রশস্ততা ও গভীরতা বাড়াতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×