২২ কিলোমিটারের কাজ ফেলে ঠিকাদার উধাও

রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কে জনদুর্ভোগ চরমে

  আনু মোস্তফা, রাজশাহী ব্যুরো ২১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহী-নওগাঁ ৭৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কটি সংস্কারে শুরু থেকেই অনিয়ম-দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গুরুত্ব¡পূর্ণ এ মহাসড়কটির সংস্কার কাজ চলছে ধীরগতিতে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে জনদুর্ভোগ। প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের ১২ প্যাকেজের মধ্যে তিন প্যাকেজের দুই ঠিকাদার অধিকাংশ বিল তুলে নিয়ে ৬ মাস ধরে লাপাত্তা। বাকি ৫ জন যেনতেনভাবে কাজ করলেও কাজের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগ অনেকটাই নীরব ভূমিকা পালন করছে।

এদিকে সড়কটির এ দুরবস্থায় ফুঁসে উঠেছে এলাকার লোকজন। বৃহস্পতিবার রাজশাহী অংশের ২২ কিলোমিটার সড়কের দু’পাশের ভুক্তভোগী হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘ মানববন্ধন করেছেন সড়কটির নির্মাণ কাজ শেষ করার দাবিতে। মানববন্ধন ও সমাবেশ থেকে হুশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, দ্রুত সড়কটির নির্মাণ কাজ শেষ না হলে তারা এই সড়কটিতে যান চলাচল বন্ধ করে দেবেন। ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি করেছেন এলাকার সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজশাহী-নওগাঁ ৭৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। মোট ১২টি গ্রুপে ভাগ করে টেন্ডার আহ্বান করা হয় ওই বছরই। অভিযোগ রয়েছে, সক্ষম প্রতিষ্ঠানকে না দিয়ে সড়ক ও জনপথের কর্মকর্তারা সিন্ডিকেট করে অখ্যাত ও নামধারী কিছু দলীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদার হিসেবে নির্বাচন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় এ মহাসড়কটির সংস্কার ছাড়াও ৭ দশমিক ৩ মিটার চওড়া থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৩ মিটার প্রশস্ত করার কর্মসূচি রয়েছে। সড়কের পুরো কাজ সম্পন্ন করার শেষ সময় ছিল ৩০ এপ্রিল। তবে ঠিকাদাররা আবেদন করে আগামী ডিসেম্বরে কাজ শেষ করার অঙ্গীকারনামা দিয়েছেন। কিন্তু এখনও সড়কটির রাজশাহী অংশের শতকরা ৬০ ভাগ কাজই পড়ে রয়েছে। নওগাঁ অংশের কার্পেটিং শেষ হলেও ফিনিশিং ছাড়াই পড়ে আছে ৬ মাস ধরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, মোট ১২ প্যাকেজের মধ্যে আমিনুল এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয় চারটি প্যাকেজের কাজ। আমিনুল এন্টারপ্রাইজ চারটির মধ্যে একটি প্যাকেজ রয়েছে রাজশাহী অংশের মোহনপুরে। আর দুটি প্যাকেজের কাজ পেয়েছেন মঞ্জুর রহমান পিটার নামের রাজশাহীর এক বাস মালিক নেতা ও তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়াহেদ কনস্ট্রাকশন। এছাড়া দুটি করে প্যাকেজের কাজ পেয়েছে ডন কনস্ট্রাকশন ও ঢাকার কামাল অ্যাসোসিয়েটস। বাকি দুটি প্যাকেজের কাজ করছে তৃণা ও প্যারাডাইস কনস্ট্রাকশনস। রাজশাহী ও নওগাঁ সড়ক ও জনপথ বিভাগ প্রকল্পটি তদারকি করছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাজশাহী অংশের নওহাটা ও মোহনপুর এলাকার দুটি প্যাকেজের ১৫ কিলোমিটার কাজ করছে পরিবহন মালিক ও ঠিকাদার মঞ্জুর রহমান পিটারের ওয়াহেদ কনস্ট্রাকশন। পিটার রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাও। প্রায় দেড় বছর আগে সড়কের কার্পেটিং তুলে সড়কটি পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হলেও সেখানে দেয়া হয়নি মাটি, খোয়া ও পাথর। ফলে সড়কে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। নির্মাণ কাজ চলাকালীন ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণের জন্য পানি দেয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। ফলে ভয়ংকর ধুলাবালি ছড়িয়ে এলাকার পরিবেশ হয়ে উঠেছে বসবাসের অযোগ্য। অন্যদিকে প্রশস্তকরণের জন্য সড়কের পার্শ্ববর্তী এলাকায় মাটি ভরাট করার পর সেগুলো আর সমতল করা হয়নি। কাদাপানিতে লেপ্টে সড়কে যান চলাচলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। ভোগান্তির ফলে এলাকার স্কুল-কলেজগুলো শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়েছে প্রায়।

রাজশাহী সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীর দফতর সূত্রে জানা গেছে, ওয়াহেদ কনস্ট্রাকশন ও আমিনুল এন্টারপ্রাইজের তিন প্যাকেজের ঠিকাদারি মূল্য ৫০ কোটি টাকা। তবে এরই মধ্যে এই দুই ঠিকাদার তুলে নিয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকার বিল। এই দুই ঠিকাদার সড়কের কাজ ফেলে প্রায় ৬ মাস ধরে লাপাত্তা বলে জানিয়েছেন রাজশাহী সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শামসুজ্জোহা। তিনি বলেন, আমিনুল ও ওয়াহেদ কনস্ট্রাকশন তাদের তিন প্যাকেজের মাত্র ৪০ ভাগ কাজ শেষ করেছে। ঠিকাদারদের বারবার চিঠি দেয়া হয়েছে সড়কটি কার্পেটিং করার জন্য। কিন্তু তিনি কাজ করছেন না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নির্দেশ পেলেই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে ওয়াহেদ কনস্ট্রাকশনের পক্ষে ঠিকাদার মঞ্জুর রহমান পিটার দাবি করেন, তার কাজ চলছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় আছে। এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেনি। আমিনুলের প্যাকেজের বিষয়ে বিক্ষোভ করেছে। এ ব্যাপারে যোগাযোগের চেষ্টা করেও আমিনুলের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। রাজশাহী-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজে অচলাবস্থা প্রসঙ্গে রাজশাহী-৩ (মোহনপুর-পবা) আসনের সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন বলেন, সড়কটির কাজ দীর্ঘ সময়েও শেষ না হওয়ায় এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। এ নিয়ে আমরা খুবই বিপাকে আছি। এতে সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। আমরা সওজকে বলেছি, প্রয়োজনে ঠিকাদার পরিবর্তন করে সড়কের কাজটি যেন দ্রুত শেষ করা হয়।

এদিকে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের নওগাঁ জেলা অংশের কিছু কাজ ইতিমধ্যে শেষ হলেও তা নিয়ে এলাকার মানুষের ক্ষোভের অন্ত নেই। রাজশাহীর কেশরহাট পৌরসভার মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা শহিদুজ্জামান শহীদ বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক যেভাবে সংস্কার হচ্ছে একজন নাগরিক হিসেবেও তা মেনে নেয়া যায় না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×