সিলেটে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা: পরীক্ষকের অবহেলায় ২শ’ শিক্ষার্থীর সর্বনাশ

রিপোর্ট দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস

  আজমল খান, সিলেট ব্যুরো ০৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অবহেলা

সিলেটে পরীক্ষক, নিরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকের অবহেলায় ২শ’ কোমলমতি শিক্ষার্থীর ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে। যোগ্যতা অনুযায়ী মেধার স্বীকৃতি পায়নি তারা। এমনকি পুনঃনিরীক্ষায় বেশি নম্বর পেলেও প্রাপ্ত নম্বর যোগ করা হয়নি তাদের মার্কশিটে।

কম নম্বর দিয়েই তাদের নম্বরপত্র দেয়া হয়েছে। গত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় এমন ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে এসব তথ্য জানা গেছে। এর ফলে ভুক্তভোগী এসব শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

জানা গেছে, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস শিক্ষা অধিদফতরে তদন্ত রিপোর্ট দিয়েই হাত গুটিয়ে বসে আছে। অথচ বিধান অনুযায়ী তাদেরই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার কথা। শিক্ষা অধিদফতরের এডিজি পর্যায়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ব্যবস্থা নেয়ার নিয়ম। তারা দায়িত্ব পালন না করে শুধু অধিদফতরে কেন রিপোর্ট পাঠাবে? তারা সেখানে কী করছে, এসব খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যারা মার্কস কম দিয়েছে তারা শুধু অন্যায় করেনি, এটি একটি মোটা দাগের অপরাধ। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হওয়া উচিত।

জানা গেছে, ২৫ জুলাই জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. বায়োজীদ খান প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর একটি চিঠি দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরীক্ষার্থীদের কম নম্বর দেয়া হয়েছে- এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট পরীক্ষক সদর উপজেলার গোপাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিন্টু রঞ্জন চন্দ, নিরীক্ষক নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিকেতন দাস ও প্রধান পরীক্ষক মুরাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জয়া রানী পালের গাফিলতির কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে নেত্রকোনায় কর্মরত তৎকালীন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল্লা পুনঃনিরীক্ষায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত নম্বর সংযোজন না করে পূর্বের অবস্থায় রেখে নম্বর ফর্দ অধিদফতরে পাঠিয়েছেন।

অন্যদিকে এর আগে ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ওবায়দুল্লাও একটি তদন্ত প্রতিবেদন মহাপরিচালকের কাছে দিয়েছেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০ ছাত্রের খাতা দেখার ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা, গাফিলতি, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) কর্তৃক প্রদত্ত মার্কিং স্কিম অনুসরণ না করা এবং দায়সারাভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়েছে।

এমনকি পরীক্ষক মিন্টু রঞ্জন চন্দ উত্তরপত্র মূল্যায়নে তার গাফিলতি স্বীকার করে জানান, প্রশ্নপত্রের গায়ে দেয়া প্রদত্ত নম্বর সম্পর্কেও জ্ঞাত ছিলেন না! উত্তরপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন বিকাল ৪টায় পরীক্ষক উত্তরপত্র দেয়ায় নিরীক্ষক নিকেতন দাসের পক্ষে ২০০টি উত্তরপত্র যথাযথভাবে নিরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। প্রধান পরীক্ষক নিকেতন দাস নিরীক্ষকের মতো একই বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু সময় কম থাকলেও প্রধান পরীক্ষক ২০০টি উত্তরপত্রের ৫ শতাংশ মূল্যায়ন করা উচিত ছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে পাওয়া একটি উত্তরপত্র এ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। এতে ২২৮১৬৪৭৬ কোডের খাতায় দেখা যায়, হিন্দুধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার এক নম্বর এর ‘খ’ তে উপাসনা করার যেকোনো দুটি পদ্ধতির নাম লিখতে বলা হয়। উত্তরপত্রে দেখা যায়, ধ্যান ও জপ দুটি উত্তর লেখা আছে। ‘ঙ’ এ প্রশ্ন করা হয় ঈশ্বরকে কখন ভগবান বলা হয়। ছাত্রটি উত্তর লিখেছে ঈশ্বর যখন নিরাকার তখন তাকে ভগবান বলে।

জানা গেছে, উত্তরপত্রের এই খাতাটি নগরীর লাইসিয়াম একাডেমির ১৯৫০ রোল নম্বরধারী দুর্জয় চন্দ্র নাথের। কিন্তু মজার ব্যাপার হল দুটি প্রশ্নের উত্তর সঠিক হলেও পরীক্ষক কোনোটিতেই নম্বর দেননি। তাছাড়া অনেকের অভিভাবক পুনঃনিরীক্ষার আবেদন করার পর মার্কস বাড়লেও যোগ করা হয়নি।

এ ব্যাপারে সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. বায়োজিদ খান বলেন, আমি নতুন এসেছি, আগের ডিপিও থাকাকালীন সময়ে এসব হয়েছে। তবে আমার নজরে আসার পর আমি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দিয়েছি।

এ ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. এএফএম মন্জুর কাদির যুগান্তরকে বলেন, দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে ডিপিও ব্যবস্থা নেয়ার কথা, কিন্তু তারা কাজ না করে পাস কাটিয়ে যাচ্ছে। এটা কেন করছে বুঝতে পারছি না। যারা ভাসা ভাসা প্রতিবেদন দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে এতবড় অবহেলা- শিশুরা প্রথম জীবনে ধাক্কা খেলে সারা জীবন এই ক্ষত নিয়ে ঘুরতে হবে।

জালালাবাদ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রবীন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ বলেন, আমার ছেলে প্রত্যেক বিষয়ে ৯০-এর ওপর পেয়েছে। এমনকি ইংরেজিতে ৯৫ অংকে ৯৮ পেয়েছে। অথচ হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে ৭০ নম্বর পেয়েছে। পুনঃনিরীক্ষণেও দায়সারাভাবে খাতা দেখার পরও সে ৮০ পেয়েছে। তবুও এই নম্বরগুলো যুক্ত করা হয়নি। এই ঘটনার রহস্য উদঘাটনের পাশাপাশি ন্যায়বিচার চাই।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×