চট্টগ্রামে পেপার মিলের বর্জ্যে হালদা নদী দূষণ

হুমকিতে মাছ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ * হালদা বাঁচাতে হলে মিল সরিয়ে নিতে হবে -ড. মনজুরুল কিবরিয়া * আজ পরিবেশ অধিদফতরে শুনানি

  আবু তালেব, হাটহাজারী ১৮ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নদী দূষণ

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ পাহাড়তলী এলাকার নন্দীরহাটে এশিয়ান পেপার মিলের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একুতি ছড়া (মরা খাল)।

তা আবার হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কাটাখালি, খন্দকিয়া, বাথুয়া, মাদারি ও কৃষ্ণখালী খাল ধরে হালদা নদীতে গিয়ে মিশেছে। কারখানার অপরিশোধিত প্রাণঘাতী বর্জ্য এসব খালের মাধ্যমে মিঠা পানির রুইজাতীয় মাছের প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে গিয়ে পড়ে। এতে নদীর জীববৈচিত্র্য ও নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে।

১২ বছর ধরে এভাবে দূষিত হচ্ছে হালদা নদী। চট্টগ্রামের পরিবেশ অধিদফতরের একজন কর্মকর্তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। চলতি বছরের ১০ জুন পরিবেশ অধিদফতর হালদা দূষণের কারণে ২০ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটিকে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছিল অধিদফতর। ওই ঘটনার দুই মাসের মাথায় এশিয়ান পেপার মিলের বিরুদ্ধে আবার হালদা নদী দূষণের অভিযোগ উঠেছে। ১০ আগস্ট শনিবার রাত সাড়ে ১০টায় ওই কারখানা থেকে পাশের মরা ছড়ায় ছুটির সুযোগে অপরিশোধিত প্রাণঘাতী তরল বর্জ্য ছাড়ার প্রমাণ পেয়েছেন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন।

ওই রাতে এবং পরের দিন রোববার দুপুরে ইউএনও’র সঙ্গে হালদা গবেষক দলের সদস্যরা ওই পেপার মিল তথা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ওইদিন রাতে এশিয়ান পেপার মিল যে রাতের আঁধারেই অপরিশোধিত প্রাণঘাতী তরল বর্জ্য ছেড়ে দেয় হালদায়, এর স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে ইউএনও’র সরেজমিন পরিদর্শনে। দেখা গেছে, ঈদে মানুষের ব্যস্ততার সুযোগে পানি ছেড়ে দিয়েছে এশিয়ান পেপার মিল। সংগ্রহ করা হয় দুই বোতল নমুনা, যা পরিবেশ অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

ইউএনও রুহুল আমিন বলেন, এশিয়ান পেপার মিলের বায়োলজিক্যাল প্ল্যান্টের ট্যাংকটি ছিল প্রায় ভরপুর। একটু বৃষ্টি হলেই সেখান থেকে বর্জ্য গড়িয়ে বাইরে পড়বে। পাশে আরেকটি ছোট্ট সংযুক্ত ট্যাংক আছে, যেটা দিয়ে বর্জ্য বাইরের ছড়ায় চলে যাওয়ার সুযোগ রাখা আছে। তবে বর্জ্য ছাড়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম। তার দাবি, সেখানে কোনো তরল পদার্থ ফেলা হয়নি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ড. মনজুরুল কিবরিয়া জানান, রোববার দুপুরে কারখানায় গেলে কর্মকর্তারা ইটিপি কার্যকর আছে বলে দাবি করেন। তবে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। তাদের একটি বায়োলজিক্যাল প্ল্যান্ট চালু থাকার কথা বলা হলেও সেটিও চালু না। ওই প্ল্যান্টের সঙ্গে ৩টি পাইপ লাগানো, যা খালের সঙ্গে যুক্ত। মিল কর্তৃপক্ষ প্রচুর বৃষ্টি হলে এবং দুই ঈদের ছুটিতে তারা জমিয়ে রাখা বর্জ্য ছেড়ে দেয়, যা অত্যন্ত অনৈতিক। এসব বর্জ্য বিভিন্ন খালের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে হালদায় গিয়ে পড়ে। হালদা নদীকে বাঁচাতে হলে এশিয়ান পেপার মিলকে এখান থেকে সরিয়ে নিতে হবে। এটাই আমাদের দাবি। আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটির এ ধরনের অনৈতিক কাজ এক যুগ ধরে চলছে। অথচ চলতি বছরের ১৭ জুলাই বৃষ্টির আড়ালে তরল বর্জ্য ফেলে হালদা নদীর পানি দূষণের অপরাধে ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টকে তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) ও অয়েল ওয়াটার সেপারেটর স্থাপন না করা পর্যন্ত তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় পরিবেশ অধিদফতর।

পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম বিভাগের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান মুঠোফোনে যুগান্তরকে বলেন, বর্জ্য ছাড়ার বিষয়ে আমরা শুনেছি। ১৪ আগস্ট এ বিষয়ে মিল কর্তৃপক্ষকে আমরা নোটিশ করেছি। তাছাড়া খালে ছেড়ে দেয়া অপরিশোধিত তরল বর্জ্যরে নমুনা আমরা সংগ্রহ করেছি। আজ রোববার বেলা ১১টায় এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিক স্যারের কার্যালয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এ ব্যাপারে আমাদের অধিদফতরের ডিজি মহোদয় আমাদের ফোনে নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও আগের করা ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিষয়টি এখনও আপিলে আছে। চলতি বছরের ৩০ মে সত্তার ঘাট এলাকায় হালদা নদীর পাড়ে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে এশিয়ান পেপার মিলের বিরুদ্ধে মামলাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×