আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

আদালতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকলে সুবিচার কঠিন হবে-ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ * সুপ্রিমকোর্টে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দরকার -মাহবুব উদ্দিন খোকন

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলমগীর হোসেন

কুমিল্লার আদালতে ছুরিকাঘাতে আসামি নিহত এবং সুপ্রিমকোর্টে আসামির ওপর বাদীপক্ষের হামলার ঘটনায় আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ দুই ঘটনার পর খোদ উচ্চ আদালতের বিচারকরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সারা দেশে বিচারক ও আদালত অঙ্গনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেছেন।

একই সঙ্গে বিচারকদের গানম্যান, সরকারি গাড়ি ও আদালত অঙ্গনে সার্বক্ষণিক পুলিশ সদস্য নিযুক্তির নির্দেশ কেন দেয়া হবে না- তাও জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে। এদিকে পরপর দুটি হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি আছে কিনা তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা। অবিলম্বে দেশের সব আদালতের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান তারা।

আদালতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকলে সুবিচার নিশ্চিত করা কঠিন হবে বলে মনে করেন সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে আদালতে নিরাপত্তা উদ্বেগজনক। বিচারাঙ্গনে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকে তাহলে বিচারক, আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই আতঙ্কে থাকবেন। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

কুমিল্লা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ফাতেমা ফেরদৌসের আদালতে ১৫ জুলাই হত্যা মামলার আসামি আবুল হাসান হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে তার সহযোগী আসামি ফারুক হোসেনকে ছুরিকাঘাত করে। ফারুক দৌড়ে বিচারকের খাস কামরায় গিয়ে আশ্রয় নিলে হাসান সেখানে গিয়েও ফারুককে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে। এতে ফারুক মারা যায়।

পরদিন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে আসামির ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। একটি হত্যা মামলার আগাম জামিন পাওয়ায় ক্ষুব্ধ বাদীপক্ষের মারধরের শিকার হন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম হাওলাদার। এ সময় তার আইনজীবী আবদুল আউয়ালকেও মারধর করা হয়। এ ঘটনায় হামলাকারী জুয়েলকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। তার বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করেন সিরাজুল ইসলাম হাওলাদার।

আইনজীবীদের মতে- নিরাপত্তায় অন্যতম সমস্যা হাইকোর্টসংলগ্ন মাজার এলাকা। সেখানে যখন-তখন নানা শ্রেণি-পেশার জনসাধারণ চলাচল করে। এখানে সন্ধ্যা হলেই মাদকের হাট বসে। এদিকে সরেজমিন দেখা যায়, সুপ্রিমকোর্টের গাড়ি পার্কিং এলাকায় দিনদুপুরে জুয়ার আসর বসে। জুয়াড়িদের বেশির ভাগই গাড়িচালক। মাঝে-মধ্যে জুয়া নিয়ে বাদানুবাদ হতে দেখা যায়।

বর্তমানে সুপ্রিমকোর্টের মূল ভবনের নিচতলার প্রবেশপথে একটি আর্চওয়ে ও একটি ব্যাগেজ স্ক্যানার মেশিন লাগানো থাকলেও এগুলো প্রায় অকার্যকর। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করে দেখা গেছে, কেউ ভেতরে প্রবেশের সময় আর্চওয়ের অ্যালার্ম বাজলেও তাকে কোনো প্রকার তল্লাশি করছেন না নিরাপত্তাকর্মীরা। একটি মাত্র আর্চওয়ে থাকলেও তা যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে না।

সুপ্রিমকোর্টের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) নাদিয়া ফারজানা। তিনি শনিবার যুগান্তরকে বলেন, সুপ্রিমকোর্টের নিরাপত্তায় কোনো কমতি নেই। নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। মূল ভবনের নিচতলার প্রবেশপথে আর্চওয়ে ও ব্যাগেজ স্ক্যানার মেশিন লাগানো থাকলেও এগুলো অকার্যকর কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি আমাদের নয়, এটি সুপ্রিমকোর্ট বারের। অন্যান্য প্রবেশপথে আমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা রয়েছে।

২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগের দুটি আদালত কক্ষ থেকে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের একটি টয়লেট থেকে পিস্তল উদ্ধার করা হয়। এর আগে ঝালকাঠিতে দুই বিচারক নিহত হন। চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণের তল্লাশি চৌকিতে জেএমবির আÍঘাতী বোমা হামলায় এক পুলিশ কনস্টেবলসহ তিনজন মারা যান। ২০০৬, ২০১১, ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্টে বড় ধরনের ভাংচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন যুগান্তরকে বলেন, দেশে যে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে তারই একটি নমুনা হচ্ছে আদালতে পর পর দুটি হামলা। তিনি বলেন, দুটি ঘটনার পর আমরা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেছি। সার্বিক নিরাপত্তার ব্যাপারে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। আমরা বলেছি, সুপ্রিমকোর্টে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দরকার।

তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। খোকন বলেন, আদালত হচ্ছে নিরাপদ জায়গা। সুপ্রিমকোর্টের ইতিহাসে হামলার ঘটনা ঘটেনি। এই প্রথম। এখানে হামলা ও হাইজ্যাকের ঘটনা ঘটেছে, যা নজিরবিহীন। যদিও বারের পক্ষ থেকে হামলাকারীদের ধরে থানায় দেয়া হয়েছে। তবুও আমি মনে করি এটি যথেষ্ট নয়।

সারা দেশের আদালতে নিরাপত্তা চেয়ে ১৭ জুলাই রিট করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। এর পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশের আদালতে আইনজীবী, বিচারক ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা জানতে চান হাইকোর্ট। বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে কুমিল্লা জজকোর্টে এক আসামির হাতে আরেক আসামিকে হত্যার ঘটনার সময় আদালতে যারা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তাও জানতে চান সর্বোচ্চ আদালত।

আদালতের নির্দেশে পরে কুমিল্লা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এতে বলা হয়, কুমিল্লা আদালতে পর্যাপ্ত লোকবল এবং আধুনিক সরঞ্জামাদির অভাব রয়েছে। শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেন। এদিন হাইকোর্ট বলেন, ‘কুমিল্লার আদালতে বিচারকের সামনে একজনকে হত্যার ঘটনায় বিচারকদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।

এর আগে ঝালকাঠিতে দুই বিচারককে হত্যা করা হল। কুমিল্লায় এজলাসে ঢুকে আসামিকে খুন করা হল। সুপ্রিমকোর্ট বারে হামলা হল। আমরা আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এ কারণে আমরা বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রুল জারি করছি।’