রূপনগরে বস্তিতে আগুন: ক্ষতিগ্রস্ত অনেকের নাম তালিকায় উঠছে না

বস্তির টাকায় আলিশান বাড়ি * বিদ্যুৎ-গ্যাসের অবৈধ সংযোগ এখনও আছে * ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা দিল বিএনপি

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আগুন

আগুনে পুড়ে যাওয়া রাজধানীর রূপনগর চলন্তিকা মোড় সংলগ্ন ঝিলপাড় বস্তির বাসিন্দাদের খাবার বিতরণে চরম অব্যবস্থাপনা চলছে। যারা নেতাদের পরিচিত তারা খাবার পাচ্ছেন, আর যারা অপরিচিত তারা খাবার পাচ্ছেন না।

শুধু তাই নয়, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায়ও অনেকের নাম উঠছে না। রোববার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে দেখা যায় তিনটি স্থান থেকে খাবার দেয়া হচ্ছে।

স্থানগুলো হল- ঝিলপাড়, আরামবাগ ও চলন্তিকা। আরামবাগ স্পটের বাসিন্দারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সকালের খাবার পাননি। ভুক্তভোগী কয়েকজন অভিযোগ করেন, শনিবার রাতে তারা শেষ খাবার পেয়েছিলেন। চলন্তিকা এলাকার বঙ্গবন্ধু আদর্শ বিদ্যানিকেতনে সকালের নাশতার জন্য দুপুর ১২টা পর্যন্ত অনেককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

খাবার না পেয়ে অনেককে বিরক্ত হয়ে লাইন ছেড়ে চলে যেতে দেখা গেছে। আরামবাগ ঈদগা মাঠে গিয়ে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য শনিবার রাতে রান্না করা বড় বড় ৩ পাতিল খিচুড়ি নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে।

বস্তির ঝিলপাড় অংশে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রজ্জব হোসেন এবং দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করছেন। এই তালিকায় ক্ষতিগ্রস্ত কারও নাম অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, আবার কারও নাম অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। আরামবাগ বস্তি অংশের বাসিন্দা আকলিমা বেগম জানান, তিনি বাসা-বাড়িতে কাজ করেন। মাসে ২ হাজার ২০০ টাকা ভাড়ায় একটি রুম নিয়ে তিন ছেলেমেয়েসহ থাকতেন। শনিবার রাতে শেষবারের মতো খাবার পেয়েছি। আজ সকালের নাশতা এখন পর্যন্ত পাইনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ঘর থেকে কোনো জিনিসপত্র বের করতে পারিনি। সবই পুড়ে গেছে।

ক্ষতিপূরণ বা সাহায্য কীভাবে নেব তা বুঝতে পারছি না। বাড়িওয়ালাকে বারবার ফোন দিচ্ছি। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। কিন্তু পাচ্ছি না। তিনি বলেন, বস্তিতে কারও কারও ২০-৩০টি ঘর রয়েছে। ওইসব ঘন ভাড়া দিয়ে তারা ফ্ল্যাটবাড়িতে ভাড়া থাকেন। কারও কারও ১০০-১৫০টি করে ঘর আছে। ওইসব ঘরের টাকায় বস্তির পাশেই বিলাসবহুল বহুতল ভবন করা হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় আমাদের নাম উঠছে না। অথচ ওইসব প্রভাবশালীর আত্মীয়স্বজনের নাম তালিকায় উঠছে। আমাদের মতো ভাড়াটিয়াদের কোনো পাত্তাই দেয়া হচ্ছে না।

বস্তির ঝিলপাড় অংশের দুই বাসিন্দা আক্কাস ও হারুন অভিযোগ করেন, ৪ মাস ধরে এখানে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকছি। নতুন হওয়ায় আমাদেরকে নেতারা চেনেন না। তাই আমরা ঠিকমতো খাবার পাচ্ছি না। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাতেও নাম ওঠাতে পারছি না। আগুনে তো সবই হারালাম। এখন আমাদের কী হবে?

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পুড়ে যাওয়া ঝিলপাড় বস্তিটি অবৈধভাবে গড়ে উঠেছিল জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের জমিতে। সেখানে চলত মাদক ব্যবসাও। এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। তারা রূপনগর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজি রজ্জব হোসেনের লোক হিসেবে পরিচিত।

বস্তির নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে ছিল তাদের মধ্যে আছেন- ফকির কবির আহমেদ, দুলাল হোসেন ওরফে কারেন্ট দুলাল, হানিফ, নুরুল ইসলাম, আনসার মিয়া, মোহাম্মদ দিলু, তৈয়ব আলী, তুষার, জাহাঙ্গীর হোসেন, হেলাল উদ্দিন, খলিলুর রহমান ওরফে বাইট্যা খলিল, ফারুক, সালাম মিয়া, রহিম, ডিশ বাবু, খোকন, রফিক, রাসেল প্রমুখ। তাদের মধ্যে কবির আহমেদ বস্তির টাকা দিয়েই বস্তির পাশে আটতলা বিলাসবহুল বাড়ি বানিয়েছেন। কবিরের দখলে রয়েছে বস্তির ২ শতাধিক ঘর। এক সময় কবির জাতীয় পার্টি করতেন।

এরপর যোগ দেন বিএনপিতে। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর তিনি যুক্ত হন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। স্থানীয় ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রজ্জব হোসেনের সঙ্গে তার বেশ খাতির।

বস্তির বাসিন্দা হাজেরা বেগম জানান, ৩৫ বছর আগে তিনি ঝিলপাড়ে ঘর তুলে থাকতে শুরু করেন। পরে তিনি আরও তিনটি ঘর তুলে ভাড়া দেন। প্রথম দিকে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ ছিল না। পরে দুলালসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের অনেক নেতা বস্তিতে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ দেন। প্রতি মাসে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জন্য তিনি দুলালকে দুই হাজার করে টাকা দেন। বস্তির অপর এক বাসিন্দা বলেন, এই বস্তিতে মাদক কেনাবেচা হতো।

জানতে চাইলে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী রজ্জব হোসেন বলেন, ‘যারা বস্তির নিয়ন্ত্রণে ছিলেন তারা আওয়ামী লীগের কেউ না। এক সময় যুবদল করত। এখন যুবলীগ বলে পরিচয় দেন।’

তিনি বলেন, ‘আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করছি। তারা বাসস্থানে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। আর স্থানীয়রা যাদের চিহ্নিত করে দিচ্ছেন তাদের নামই ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় অন্তুর্ভুক্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ এলে তা খতিয়ে দেখা হবে।’

ডিএনসিসি (অঞ্চল-২) এর নির্বাহী প্রকৌশলী ইনামুল কবীর বলেন, এখানে খাবারের কোনো সংকট নেই। গৃহহারা মানুষ যেন অনাহারে না থাকে সেজন্য আমাদের সজাগ দৃষ্টি আছে। তাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

রূপনগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম রব্বানী বলেন, সরকারি জমিতে বস্তিঘর তুলে সাধারণত ছিন্নমূল গরিব মানুষ বসবাস করা শুরু করে। তাদের মধ্যে কারও কারও অবস্থার উন্নতি হলে ফ্ল্যাটবাড়িতে চলে যায়। ফ্ল্যাটে যাওয়ার আগে তার বস্তিঘরটি অন্যজনের কাছে ভাড়া দিয়ে যায়। এভাবে বস্তিঘরের মালিক তৈরি হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বস্তিকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসা হয়, এটা কম-বেশি সবাই জানে। মাদক ব্যবসা দমনে পুলিশ সব সময় তৎপর আছে। কিছুদিন আগেও এই বস্তিতে মাদকবিরোধী ব্লক-রেইড চালানো হয়।

এদিকে বস্তির পশ্চিমাংশে বেশকিছু ঘর এখনও রয়ে গেছে। মাঝখানে খালি জায়গা থাকায় আগুন সেখানে পৌঁছতে পারেনি। বস্তির ওই ঘরগুলোতে অবৈধ বিদু্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে গ্যাস সংযোগ টানা রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় বসিন্দাদের অভিযোগ, অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাসলাইনের কারণেই শুক্রবারের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যেসব বস্তিঘরে অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুতের লাইন রয়েছে সেগুলো দ্রুত বিচ্ছিন্ন করা উচিত।

ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা দিল বিএনপি : চলন্তিকা বস্তিতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বিএনপি। রোববার বিকালে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সেখানে গিয়ে অসহায় নারী ও শিশুদের হাতে নগদ অর্থ তুলে দেয়। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরীসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন।

শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে মিরপুরের চলন্তিকা বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ২০টি ইউনিট প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু এরই মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে যায় বস্তির কয়েক হাজার ঘর। নিঃস্ব হয়ে যায় সেখানকার বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×