জজ মিয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা: জীবন বাঁচাতে শেখানো স্বীকারোক্তি দিয়েছি

রিমান্ডে ফ্যানে ঝুলিয়ে নির্যাতন আর ক্রসফায়ারের ভয় দেখাত

  ইকবাল হাসান ফরিদ ২১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জজ মিয়া

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় আলোচিত নাম জজ মিয়া। গ্রেনেড হামলার হোতাদের আড়াল করতে আষাঢ়ে গল্পের ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছিল নিরীহ এ তরুণকে। জজ মিয়া জানতেন না, কী ছিল তার অপরাধ।

তবুও রিমান্ডে নিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে নির্যাতন ও ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে সাজানো গল্পে জজ মিয়াকে দিয়ে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছিলেন সিআইডির তৎকালীন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

রোববার যুগান্তর কার্যালয়ে বসে জজ মিয়া গ্রেফতার ও রিমান্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। বলেন, আমাকে নিয়ে তারা যে নাটক করেছে, এই নাটক যেন আর কারও সঙ্গে তারা না করে। আমার মতো কোনো ফ্যামেলি যেন এভাবে ঝরে না যায়।

জজ মিয়া বলেন, গ্রেনেড হামলার দিন আমি নোয়াখালীর সেনবাগে বীরকোট গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। বাবুল চাচার চায়ের দোকানে বসে টিভি দেখে গ্রেনেড হামলার ঘটনা জানছি। এ নিয়ে আমরা স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের সঙ্গে তর্কবিতর্কও করছি। সন্ধ্যার পর বাজারে প্রতিবাদ মিছিলও করেছি। মিছিলে আমার সঙ্গে স্কুলের শিক্ষক, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও স্থানীয় অনেক লোক ছিল। সেই আমিই নাকি বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলা করেছি!

জজ মিয়া বলেন, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার পরের বছর ২০০৫ সালের ৯ জুন সেনবাগ থানার কবির দারোগা আমাকে গ্রামের বাড়ি থেকে অ্যারেস্ট করল। বলল, তোমার নামে অভিযোগ আছে। তখন মেম্বার ও গ্রামের মুরুব্বিরা বলেন, তার নামে কী অভিযোগ আমাদের বলেন। আমরা তো চিনি, গ্রামের কোন ছেলেটা কেমন।

এরপর কবির দারোগা তাদের বলেন, আপনারা থানায় আসেন। থানায় এলে কথা হবে। এই কথা বলে আমাকে মোটরসাইকেলে তুলে থানায় নিয়ে গেল। জজ মিয়া বলেন, আমি গ্রামে আওয়ামী লীগের একজন সদস্য হিসেবে কাজ করতাম। আমাকে সেনবাগ থানায় আনার পর আমি কবির দারোগারে জিজ্ঞাস করি, আমাকে কী মামলায় আপনি অ্যারেস্ট করে আনলেন, একটু বলেন। পরে তিনি আমাকে জানান, সেনবাগ থানায় আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। ঢাকায় আমার নামে মামলা আছে। এরপর আমাকে লকাপে ঢুকিয়ে রাখে।

তিন চার ঘণ্টা পর ঢাকা থেকে সিআইডির অফিসাররা সেনবাগ থানায় যান। তখন অফিসাররা কবির দারোগাকে জিজ্ঞাস করলেন জজ মিয়া কোথায়? পরে লকআপ থেকে আমাকে বের করল। এরপর সিআইডি অফিসার উপস্থিত পুলিশের উদ্দেশে বললেন, আমি সিআইডির কর্মকর্তা আবদুর রশিদ। আপনারা সবাই রুমের বাইরে চলে যান। এরপর গামছা দিয়ে আমার চোখ বেঁধে আমাকে মারধর শুরু করল। বলল, তুই এত বড় একটা হামলা করে দেশে এসে বসে রইছস। মনে করছস তোকে ধরতে পারব না। এরপর আমাকে চোখ বেঁধে তারা থানা থেকে গাড়িতে করে ঢাকায় নিয়ে এলো।

আসার পথে প্রায় এক ঘণ্টা পর এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাকে নামিয়ে বলল আমরা যেটা বলি, তুই সেটা স্বীকার করিস, আর না হলে তোর নামে ৪-৫টা মার্ডার কেস দেখিয়ে তোকে শীর্ষ সন্ত্রাসী বানিয়ে ক্রসফায়ারে দিয়ে দেব। আমি বললাম, স্যার আমি কী বলব, আমি কী জানি? তারা বলল, আমরা যেমনে বলব, সেভাবেই তোর শুনতে হবে। এ কথা বলে আবার আমাকে গাড়িতে ওঠায়। ঢাকায় এনে যখন আমার চোখ খুলল, তখন দেখি আমি একটা রুমের ভেতরে আছি। আমি কোথায় আছি, আমি বলতে পারি না। আমার সামনে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন অস্ত্র নিয়ে বসে আছে। আমি তখন রীতিমতো আতঙ্কে। এই বুঝি আমাকে মেরে ফেলে।

পরে সিআইডি অফিসাররা বললেন, যেভাবে ঘটনা হয়েছে, তা তোকে শিকার করতে হবে। আমি বললাম স্যার, আমি যা জানি না, তা কীভাবে স্বীকার করব। তারা বললেন, আমরা যেভাবে বলব, সেভাবেই তোকে বলতে হবে। আমি বললাম, না স্যার। আমি যেটা জানি না, সেটা স্বীকারোক্তি দেব না।

এরপর দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে আমাকে ফ্যানে ঝুলিয়ে পায়ের তলায় পিটিয়েছে। আমার ডান হাতের হাড় ফাটিয়ে দিয়েছে। রিমান্ডে তারা ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গেছে। বলেছে, তাদের কথামতো যদি আমি স্বীকারোক্তি দিই, তাহলে বেঁচে থাকব। তাছাড়া যত দিন আমি জেলে থাকব, তত দিন আমার পরিবারের ভরণপোষণ দেবে সিআইডি। ৩০ দিন নির্যাতনের পর তাদের কথায় রাজি হলাম। তারা আমাকে ঘটনাস্থলের ভিডিও দেখাল। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ছবি দেখিয়ে নাম মুখস্থ করাল।

জজ মিয়া বলেন, রিমান্ডে থাকার সময় বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সহকারী পুলিশ সুপার আবদুর রশিদ ও মুন্সি আতিকুর রহমান নিয়মিত এসে আমার সঙ্গে দেখা করে ক্রসফায়ারের ভয় দেখাতেন এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা আমিই করেছি- এমন কথা বলতেন। তিনি বলেন, সিআইডির কর্মকর্তারা বলতেন, এ ঘটনার সুরাহা করতে উপর থেকে যথেষ্ট চাপ আছে, সে স্বীকার না করলে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা হবে। এরপর আদালতে নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করাল। আমি ভয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দায় স্বীকার করে তাদের শেখানো গল্প বলে যাই। আমি যে পয়েন্টটা ভুলে যেতাম, বলতে পারতাম না, ওইগুলো তারা আমাকে বলে দিত। জবানবন্দিতে আমি বলি, পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বড়ভাইদের নির্দেশে আমি অন্যদের সঙ্গে গ্রেনেড হামলায় অংশ নিই। বড়ভাইয়েরা হচ্ছেন সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদ ও মুকুল। জজ মিয়া বলেন, আমি এসব সন্ত্রাসীকে কোনো দিন দেখিওনি। তিনি বলেন, আমি যে চাপে পড়ে স্বীকারোক্তি দিচ্ছি, তা বলার সুযোগও ছিল না। পাশেই সিআইডি কর্মকর্তারা বসা ছিলেন।

জজ মিয়া জানান, কারাগারে থাকার সময় সেনবাগ থানার দারোগা কবির হোসেনের মাধ্যমে মোবাইল ফোনে মায়ের সঙ্গে সিআইডির কর্মকর্তা রুহুল আমিনের কথা হতো। সিআইডির ওই তিন কর্মকর্তা তাদের কথা অনুযায়ী জবানবন্দি দেয়ার প্রতিদানস্বরূপ তার মাকে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে দিত।

এর প্রায় দুই বছর পর ২০০৬ সালের আগস্টে এই নাটকের পেছনের ঘটনা ফাঁস করে দেন জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন। জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলার রাজসাক্ষী করতে সিআইডির প্রস্তাবের কথা ফাঁস করে দিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জজ মিয়াকে গ্রেফতারের পর থেকেই তার পরিবারকে মাসে মাসে ভরণপোষণের টাকা দিয়ে আসছে সিআইডি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ মামলা তদন্তের নতুন করে উদ্যোগ নেয়া হয়। তদন্তে উঠে আসে, বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সহযোগিতায় গোপন জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) জঙ্গিরা শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে ওই হামলা চালিয়েছিল।

তদন্ত শেষে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুন হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আদালতে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেন। তাতে ২২ জনকে আসামি করা হয়। সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ছাড়া বাকি আসামিদের সবাই হুজি-বির জঙ্গি। এ সময় আসামির তালিকা থেকে জজ মিয়ার নাম বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি। পরে আদালত এ মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দিলে ২০০৯ সালে মুক্তি পান জজ মিয়া। এ বছরই সিআইডি এ মামলার অধিকতর তদন্ত করে। ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। তাতে আরও ৩০ জনকে আসামি করা হয়। এতে ফেঁসে যান জজ মিয়া নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও। এ মামলায় ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর রায় হয়। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের ফাঁসির দণ্ড, তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১১ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েক শ নেতাকর্মী। তাদের অনেকে আজও শরীরে গ্রেনেডের স্পি­ন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×