রাইড শেয়ারিং বাইকেও চলছে ভাড়া নৈরাজ্য

  ইকবাল হাসান ফরিদ ২৬ অগাস্ট ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা মহানগরীতে সিএনজি অটোরিকশার মতো রাইড শেয়ারিংয়ের বাইকেও ভাড়া নৈরাজ্য চলছে। বেশিরভাগ সময় অ্যাপে না গিয়ে চালকরা চুক্তিতে যান। এতে যাত্রীদের পকেট কাটা যাচ্ছে।

আবার অ্যাপে না গিয়ে চুক্তিতে যাওয়ায় চালক ও যাত্রী উভয়ের জীবনই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়ম লঙ্ঘন করে কেউ যাত্রী বহন করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাইড শেয়ারিংয়ের নৈরাজ্য থামাতে শুরু থেকেই লাগাম টানা উচিত ছিল।

নগরীর মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেল চালকরা পথে লোকজন দেখলেই বলেন, ‘কই যাইবেন?’ কেউ গন্তব্যের কথা জানালেই তারা বলেন, এত (পরিমাণ) টাকা লাগবে। অ্যাপে কেন যাবেন না- এমন প্রশ্ন তুললে তারা কর্কশ ভাষায় নানান কথা বলে থাকেন; যা অনেকের জন্যই বিরক্তিকর। রোববার সকালে শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে গুলশানে যাওয়ার উদ্দেশে অ্যাপে রিকোয়েস্ট পাঠাচ্ছিলেন আলামিন হোসেন। কিন্তু কেউ রিসিভ করছিল না। আবার রিসিভ করলেও গন্তব্য জেনে কেটে দেয়া হচ্ছিল। যুগান্তরকে আলামিন বলেন, ‘পাঠাও’, ‘সহজ’সহ একাধিক রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের অ্যাপে তিনি রিকোয়েস্ট পাঠিয়েও বাইক পাননি। পরে চুক্তিতে ১৫০ টাকা ভাড়ায় মোটরসাইকেলে তিনি গুলশান পৌঁছান। শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চালকদের কাছে ‘পাঠাও’, ‘সহজ’সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাপে রিকোয়েস্ট এলেও তারা রিসিভ করেননি। রাজধানীর বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহিম যুগান্তরকে বলেন, অ্যাপে রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে এখন আর বাইক পাওয়া যায় না। চালকরা রিসিভ করলেও নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে চান না। রিকোয়েস্ট ক্যানসেল করে দেন। তিনি বলেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি জেনেও রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলে চুক্তিতেই গন্তব্যে পৌঁছি।

রহিম বলেন, ‘অ্যাপের বাইকগুলো এক্কেবারে সিএনজি অটোরিকশার মতো হয়ে গেছে। তারা চুক্তিতে বাড়তি ভাড়া ছাড়া যেতে চায় না।’ বাইকচালক সোহেল যুগান্তরকে বলেন, অ্যাপে গিয়ে পোষায় না। কারণ যানজটে অনেক তেল খরচ হয়, অনেক সময় নষ্ট হয়। এছাড়া অ্যাপে গেলে যে ভাড়া আসে সেটির ২০ পার্সেন্ট প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়। এ কারণে অধিকাংশ চালক অ্যাপে রাজি না হয়ে চুক্তিতে যেতে চান।

বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টা। বাংলামোটর মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন ৮-১০ জন মোটরসাইকেল চালক। যাত্রী পেতে তারা ডাকাডাকি করছেন লোকাল বাসের হেলপারদের মতো। বাংলামোটর থেকে জাহাঙ্গীর গেট যেতে এক চালক এক যাত্রীর কাছে ১২০ টাকা ভাড়া চান। ওই যাত্রী রাজি না হওয়ায় পাশের আরেক চালক ১০০ টাকা ভাড়া চান।

রাজধানীর বাংলামোটর, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মগবাজার, গুলশান, বনানী, মতিঝিলসহ বিভিন্ন পয়েন্টে মোটরসাইকেল নিয়ে চালকদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তারা ডেকে যাত্রীদের সঙ্গে চুক্তি করে গন্তব্যে নিয়ে যান। এছাড়া চালকদের বিরুদ্ধে চলতি পথে যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ, বেপরোয়া চালানোসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সেবা প্রদানকারী সংস্থার কল সেন্টারে ফোন করলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত ‘পাঠাও’, ‘সহজ.কম’, ‘চলো’, ‘বাহন’, ‘আমার বাইক’, ‘শেয়ার মোটরসাইকেল’, ‘বিডি বাইক’ ও ‘ইজিয়ার’সহ ১৬টির বেশি প্রতিষ্ঠান অ্যাপসভিত্তিক বাইক রাইড শেয়ারিং চালু করেছে। এতে সিএনজি অটোরিকশা নৈরাজ্য থেকে পরিত্রাণের প্রত্যাশা ছিল মানুষের। কিন্তু অতি লোভে এখন রাইড শেয়ারিংয়ের চালকরা সিএনজি অটোরিকশার মতো ভাড়া নৈরাজ্য করছে। বেশিরভাগ চালক চুক্তি ছাড়া এক পা-ও নড়ছেন না।

গত বছর ১১টি শর্তে অ্যাপভিত্তিক রাইডিং সেবার অনুমোদন দেয় সরকার। এর মধ্যে ১০ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে- মালিক ও চালকের বিরুদ্ধে অনলাইনে অভিযোগ করা যাবে। তবে এ সংক্রান্ত কোনো ফলপ্রসূ কাস্টমার কেয়ার ও অভিযোগ কেন্দ্র ব্যবস্থা রাখা হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে প্রতিকার চাইতে যাত্রীকে ভারতে অবস্থিত উবারের অফিসে যোগাযোগ করতে হবে; যা বেশির ভাগ যাত্রীই করেন না। বাংলাদেশে অনেক আগে এ ব্যবসা শুরু হলেও এখনও নিজস্ব অফিস স্থাপন করেনি উবার।

এদিকে ওয়েবসাইট থেকে উবারের বাংলাদেশি একটি জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের নম্বরে ফোন দেয়া হলে অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয় বাংলাদেশে অভিযোগ জানানোর মতো কোনো প্রতিনিধি আছেন বলে তাদের জানা নেই। তবে অভিযোগ থাকলে উবারের ই-মেইলে পাঠানোর পরামর্শ দেয়া হয়। ‘পাঠাও’-এর কাস্টমার কেয়ারে চেষ্টা করেও সংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অন্যগুলোর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি। এছাড়া তাদের ওয়েবসাইটেও অভিযোগ করার মতো অপশন নেই।

চুক্তিতে যাত্রী নেয়ার বিষয়ে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক উত্তর বিভাগের জয়েন কমিশনার মো. আবদুর রাজ্জাক যুগান্তরকে বলেন, রাইড শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার অনুমোদন দিয়েছে। শর্ত পালন না করলে কারও রাইড শেয়ারিংয়ের সুযোগ নেই। অনিয়ম পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, গণপরিবহনের যে নৈরাজ্য সেই নৈরাজ্যের পথে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোর চালকরাও হাঁটছে। সার্ভিসটা শুরুর পর সবার মাঝে স্বস্তির একটা লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। এটি দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছিল। তবে এটি এখনও অনুমোদন হয়নি। তিনি বলেন, যাত্রীবান্ধব নীতিমালা তৈরি করে শিগগিরই সরকারের বাস্তবায়ন করা উচিত। আর কেউ অনিয়মে জড়িয়ে পড়লে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে অন্যরা সতর্ক হবে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল জব্বার মণ্ডল যুগান্তরকে বলেন, অ্যাপে না গিয়ে চুক্তিতে যাওয়ার বিষয়টি চালক ও যাত্রী উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, এ বিষয়ে যাত্রীদের সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। কেউ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে- এমন অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত