ব্লগার অভিজিৎ হত্যার ৩ বছর

মেজর জিয়াসহ ৭ জঙ্গিকে খুঁজছে সিটিটিসি

গ্রেফতার ১১ জনের মধ্যে ৬ জন কারাগারে, মারা গেছে ২ জন * এখনও মূল পরিকল্পনাকারী গ্রেফতার না হওয়ায় পরিবারের ক্ষোভ * তদন্তের নামে সময় নষ্ট করলে আদালতে যাব -অভিজিতের বাবা

  সিরাজুল ইসলাম ও হাসিব বিন শহিদ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ড. অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্তকৃত মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হকসহ ৭ জঙ্গিকে খুঁজছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এদের মধ্যে মেজর জিয়া ছাড়াও চারজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা হল- হাসান, আরিফ, আলী এবং অন্তু। এগুলো তাদের সাংগঠনিক নাম। এ পাঁচজনকে গ্রেফতারের পাশাপাশি আরও দু’জনের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হতে কাজ করছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। সিটিটিসি যাদের খুঁজছে তাদের মধ্যে কেউ দেশে, আবার কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র রোববার যুগান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। এদিকে হত্যাকাণ্ডের ৩ বছরেও মূল পরিকল্পনাকারী মেজর জিয়াকে আইনের আওতায় আনতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিজিতের বাবা অধ্যাপক ড. অজয় রায়। তিনি জানিয়েছেন, তদন্তের নামে সময় নষ্ট করলে ন্যায়বিচারের জন্য তিনি আদালতে যাবেন। সিটিটিসির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১১ জন জড়িত ছিল। এদের মধ্যে তিনজন ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারেক্তি দিয়েছে। একজন ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। অন্য ৭ জনকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি। তবে বুধবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিটিটিসি প্রধান পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, অভিজিৎ হত্যা মামলায় ৯ জন জড়িত ছিল। এর মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। এ বিষয়ে সিটিটিসি সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সিটিটিসি প্রধান একটি মিটিং থেকে বের হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেছেন। তাই সংখ্যাগত কিছু বিষয়ে তার ভুল হয়েছে।

সিটিটিসির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ‘মামলাটি আমাদের হাতে আসার আগে ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে ৭ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। ২০১৫ সালের ৩ মার্চ যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে শফিউর রহমান ফারাবী নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে র‌্যাব। ওই বছরের ১৮ আগস্ট ধানমণ্ডি ও নীলক্ষেত এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় তৌহিদুর রহমান ওরফে গামা, সাদেক আলী ওরফে মিঠু ও আমিনুল মল্লিককে। একই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর আবুল বাশার, জুলহাজ বিশ্বাস ও জাফরান আল হাসানকে গ্রেফতার করা হয়। তাছাড়া সিলেটে অনন্ত বিজয় দাস হত্যা মামলায় মান্না ইয়াহিয়া ওরফে মান্নান রাহি নামের একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে ঢাকার ডিবি পুলিশ তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখায়। এদিকে ২০১৬ সালের ১৮ জুন মুকুল রানা নামে এক যুবক রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় ডিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। পরে জানা যায়, সে অভিজিৎ হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল।

সূত্র জানায়, সিটিটিসির হাতে তদন্তভার আসার আগে গ্রেফতার হওয়া ৮ জনের কারও বিরুদ্ধেই অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের স্বীকারোক্তিও আদায় করা সম্ভব হয়নি। তাদের মধ্যে মান্নান রাহি এবং আবুল বাশার মারা গেছে। তিনজন জামিনে বেরিয়ে গেছে। সূত্রমতে, সিটিটিসি যে ৩ জনকে গ্রেফতার করে তারাসহ ছয়জন এখন কারাগারে আছে। সিটিটিসির হাতে গ্রেফতার হওয়া তিনজন ১৬৪ ধারায় স্বীকারেক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা হল- আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাব, মোজাম্মেল হোসেন ওরফে সায়মন ওরফে শাহারিয়ার এবং আরাফাত রহমান ওরফে সিয়ার ওরফে সাজ্জাদ।

সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, কাউন্টার টোরোরিজম ইউনিট তিনজনকে গ্রেফতারের পরই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন হয়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করা হয়। আনসার আল ইসলাম বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আনসার আল ইসলামের প্রধান মেজর জিয়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে নিজেই অপারেশনটি পরিচালনা করে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘মামলাটির তদন্তভার যে পর্যায়ে আছে তাতে আর কাউকে গ্রেফতার করতে না পারলেও চার্জশিট দেয়া সম্ভব।’ মেজর জিয়ার অবস্থান সম্পর্কে মনিরুল বলেন, ‘তিনি বর্তমানে পলাতক। কয়েক মাস আগে দেশে ছিলেন। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে তিনি আত্মগোপনে আছেন।’

প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়ে শতাধিকবার : অভিজিৎ হত্যা মামলায় আদালতের ২২৯ কার্য দিবসের মধ্যে শতাধিকবার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। সর্বশেষ চলতি মাসের ২ ফেব্রুয়ারি মামলার প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু এদিনও পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট তা দাখিল না করায় ১৫ মার্চ প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন আদালত। এদিকে দীর্ঘদিনেও এ মামলার তদন্ত কাজ শেষ না হওয়ায় নিহতের পরিবারের মাঝে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। তদন্তের নামে অযথা সময় নষ্ট করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়ে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন অভিজিতের বাবা অধ্যাপক ড. অজয় রায়।

অভিজিৎ হত্যা ও মামলার তদন্ত : মা-বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্য ২০১৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে আসেন অভিজিৎ। ওই বছরের একুশে বই মেলায় তার দুটি বই প্রকাশিত হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় অভিজিৎ বই মেলায় যান। মেলা থেকে ফেরার সময় রাত সাড়ে ৮টায় টিএসসি চত্বরের সামনে স্ত্রী বন্যা আহমেদসসহ হামলার শিকার হন অভিজিৎ। এ ঘটনায় অভিজিতের বাবা ড. অজয় রায় বাদী হয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেন। মামলাটি প্রথমদিকে থানা পুলিশ তদন্ত করে। পরে এর তদন্তভার ন্যস্ত হয় ডিবির ওপর। গত বছরের ১ নভেম্বর মামলাটির তদন্তভার দেয়া হয় সিটিটিসির ওপর। সিটিটিসি পরিদর্শক মুহাম্মদ মনিরুল ইসলাম এর তদন্ত করছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×