রাজশাহীতে একই অভিযোগে অভিযুক্ত ডা. রিতা

পেটে গজ রেখে সেলাই প্রসূতির জীবন সংকটাপন্ন

  রাজশাহী ব্যুরো ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহীতে আবারও প্রসূতির পেটে গজ রেখে সেলাই করেছেন গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. নাজনীন সুলতানা রিতা। গত ১৭ অক্টোবর রাজশাহী ইসলামী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডা. রিতা একই ঘটনা ঘটান। ওই সময় যুগান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘প্রসূতির জীবন নিয়ে এ কেমন খেলা!’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ ঘটনায় রাজশাহীসহ সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। এ বিষয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

সর্বশেষ ডা. রিতা গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর রাজশাহীর বাঘার হরিরামপুর গ্রামের আলী আযমের স্ত্রী আলাপি বেগমের (২৭) পেটে গজ রেখে অস্ত্রোপচার করেছেন। এরপর আলাপি বেগমের আবারও এক দফায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন। সংকটাপন্ন অবস্থায় রাজশাহী নগরীর মাদারল্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ এবং অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় সোমবার দুপুরে মামলা করেছেন ভুক্তভোগীর স্বামী আলী আযম।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ ডিসেম্বর মা ফাতেমা ক্লিনিকের গাইনি চিকিৎসক সুলতানা নাজনীন রিতার কাছে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় যান আলাপি বেগম। সবকিছু পরীক্ষার পর ডা. রিতা ওই দিন বিকালে সিজার করেন। এ সময় তার একটি মেয়ের জন্ম হয়। সিজারিয়ানের ৫ দিন পর আলাপি বেগম ক্লিনিক ছাড়েন। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার পর ওই গৃহবধূর পেটে ব্যথা শুরু হয়। ব্যথার কারণে ২৯ দিন পর আবার তাকে মা ফাতেমা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে ৪ দিন চিকিৎসার পর বাড়ি ফিরে আসেন। দ্বিতীয় দফায় আবার তার পেটে ব্যথা হয়। এবার পেটে ব্যথা হলে তারা ডাক্তার রিতার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। নিরুপায় হয়ে তারা নগরীর লক্ষ্মীপুরের রয়েল হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক সাবা সুলতানার কাছে দেখান। তিনি আল্ট্রাসনো করার পরামর্শ দেন। আল্ট্রাসনো করে পেটে কিছু ধরা না পড়ায় তারা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবার ইসলামী হাসপাতালে আল্ট্রাসনো করান। ইসলামী হাসপাতালে করা আল্ট্রাসনোর রিপোর্টে তার পেটে গজ ধরা পড়ে। এরপর ডা. সাবা তাকে মাদারল্যান্ড হাসপাতালে রেফার্ড করেন। সেখানে ভর্তির পর সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল হাকিম তার অস্ত্রোপচার করেন। এ সময় আলাপি বেগমের পেট থেকে পুঁজ ও গজ বের করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আলাপির স্বামী আলী আযম বলেন, মাদারল্যান্ড হাসপাতালে অপারেশনের আগে থেকে ডাক্তার রিতার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। আমার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা খারাপ। তার নাড়ি পচে যাওয়ায় ডাক্তার অন্য পাশ দিয়ে মলদ্বারের ব্যবস্থা করেছেন। খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করতে পারেন না। তাই আমি আইনের আশ্রয় নিয়েছি। আমি এ ঘটনায় ডাক্তার রিতার বিচার দাবি করছি। এ বিষয়ে মা ফাতেমা ক্লিনিকের গাইনি চিকিৎসক সুলতানা নাজনীন রিতার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, একটা অপারেশন হলে কিছু সমস্যা হয়। এক্ষেত্রে রোগীর ইনফেকশন হয়েছিল। এ কারণে পুঁজ বের হচ্ছিল। আর পেটে গজ রেখে সেলাইয়ের অভিযোগ সঠিক না বলে তিনি দাবি করেন। তবে রয়েল হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক সাবা সুলতানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ওই রোগী এর আগে কাকে দেখিয়েছিলেন তা আমার জানা নেই। আমার কাছে তারা পেটে পুঁজ নিয়ে এসেছিল। আল্ট্রাসনো করার পর বিষয়টি জানতে পেরে আমি তাকে মাদারল্যান্ডের সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. হাকিমের কাছে রেফার্ড করি। গৃহবধূ আলাপির অপারেশনকারী ডাক্তার আবদুল হাকিম বলেন, শনিবার রাতে গৃহবধূ আলাপির অপারেশন করে পেট থেকে অনেক পুঁজ বের করা হয়েছে। তার পেটের নাড়ি ফুটো হয়ে যাওয়ায় মল বের হচ্ছিল। তাই পেটের একপাশ ফুটো করে মলদ্বারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তার পেট থেকে গজ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি। রোগীর লোকজন যে গজ দেখিয়েছে তা কিসের, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের ব্যবহৃত গজ তারা তুলে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছে। এ বিষয়ে নগরীর বোয়ালিয়া থানার ওসি আমানউল্লাহ বলেন, রোগীর স্বামীর করা মামলা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ তদন্তে প্রমাণ হলে ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. সঞ্জিত কুমার সাহা বলেন, বিষয়টি আমি জানি না। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিষয়টি জানার জন্য আমি গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা চাইছি।

এর আগে একই অভিযোগে ডা. রিতার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই তদন্তের ব্যাপারে সিভিল সার্জন বলেন, বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন আছে। রিপোর্ট পেলে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। গত ১৭ অক্টোবর রাজশাহীর চারঘাটের আড়ানী পৌরসভা সদরের স্বাধীনাকে রাজশাহীর নওদাপাড়ার ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজার করেন আবাসিক সার্জন (গাইনি বিশেষজ্ঞ) ডা. সুলতানা নাজনীন রিতা। এ সময় স্বাধীনা ছেলেসন্তানের জন্ম দেন। স্বাধীনার সন্তানটি তিন দিন পর ২০ অক্টোবর দুপুরে হাসপাতালেই মৃত্যুবরণ করে। চিকিৎসক ওই দিন সন্ধ্যার আগে প্রসূতি স্বাধীনাকে রিলিজ করে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। এরপর বাড়িতে স্বাধীনার পেটব্যথা, জ্বর ও বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে ৩০ অক্টোবর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে দ্বিতীয় দফা অপারেশন করা হয়। এরপর তাকে আবারও বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু স্বাধীনা সুস্থ না হলে সর্বশেষ ৩ ডিসেম্বর রামেকের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাজমুন নাহার তার অপারেশন করেন। এ সময় স্বাধীনার পেট থেকে গজ বের করা হয়।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.