বন্ডের অপব্যবহার: সাময়িক স্থগিত ৩১১ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স

আমদানিকৃত কাঁচামালের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিজিএমইএ ও বিজিএপিএমইএকে চিঠি

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লাইসেন্স

গত ৬ মাসে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের দায়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় ৩১১ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট।

ফেব্রিক্স, কাগজ, বিওপিপি ফিল্ম, পিপি দানা, ডুপ্লেক্স বোর্ড, আর্টকার্ড ও সুতা বন্ড সুবিধায় আমদানির পর তা খোলাবাজারে বিক্রির দায়ে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া স্থায়ীভাবে লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে অন্য ৫টি প্রতিষ্ঠানের।

আর বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত কাঁচামালের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিজিএমইএ’র সহযোগিতা চেয়ে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

সূত্র জানায়, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই নাগাদ ১৪২টি প্রিভেন্টিভ অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানের আওতায় প্রতিষ্ঠানের বন্ডেড ওয়্যারহাউসে আকস্মিক পরিদর্শন, রাতে ঢাকার প্রবেশপথে টহল দেয়া, বন্ডের পণ্য বিক্রির মার্কেটে হানা এবং বিশেষ অনুসন্ধান চালানো হয়। এসব অভিযানে বন্ড সুবিধায় আনা আমদানি পণ্য চোরাইপথে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগের ৬৪টি পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যান আটক এবং ৫টি গুদাম সিলগালা করা হয়েছে। আটক পণ্যের মধ্যে রয়েছে- কাপড়, কাগজ, বিওপিপি ফিল্ম, পিপি দানা, ডুপ্লেক্স বোর্র্ড ও সুতা।

সূত্র আরও জানায়, শুল্ক-কর ফাঁকির দায়ে ১০৩টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৮০ কোটি ৯ লাখ টাকার মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা আদায় হয়েছে।

এছাড়াও বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় ৩১১টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত এবং আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বন্ধে বিআইএন (বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর) লক করা হয়েছে। এছাড়া অন্য ৫টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়েছে।

যদিও ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু ঢাকা বন্ড কমিশনারেটের আওতায় প্রায় ৫ হাজার লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ৭০ ভাগের বেশি চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত। মূলত দুইভাবে বন্ডের পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রথমত, অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে বন্ড লাইসেন্স খুলে পণ্য আমদানি করে তা খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়।

দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কাঁচামাল আমদানি করে। আমদানিপ্রাপ্যতা নির্ধারণ পদ্ধতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই এ কাজটি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা। অনেক প্রতিষ্ঠানের রফতানি আদেশ যৎসামান্য থাকলেও কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে শুধু মেশিনের উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী প্রাপ্যতা নির্ধারণ করিয়ে নিচ্ছে। এভাবে আমদানি করা অতিরিক্ত কাঁচামাল তারা খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। মাঝেমধ্যে দু-একটি চালান বন্ড কর্মকর্তাদের অভিযানে ধরা পড়লেও বেশির ভাগই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার ড. হুমায়ুন কবীর যুগান্তরকে বলেন, এনবিআর চেয়ারম্যানের নির্দেশে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ছুটির দিনে আজও (শনিবার) ১১টি টিমে আড়াইশ’ কর্মকর্তা-কর্মচারী ফিল্ড ভিজিটের কাজ করছে। লোকবল সংকট ও লজিস্টিক সাপোর্টের অভাব থাকলেও ছুটির দিনে, এমনকি রাতে প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে তা পুষিয়ে দেয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করছে খ্যাতনামা অনেক প্রতিষ্ঠান। বিজিএমইএভুক্ত ৭৬টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে তদন্ত সাপেক্ষে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং আমদানিকৃত কাঁচামালের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিজিএমইএকে চিঠি দিয়েছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। বন্ডের পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার সময় এসব প্রতিষ্ঠানের কাভার্ড ভ্যান হাতেনাতে আটক করা হয়।

জানা গেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন বিভিন্ন দফতর থেকে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত বিজিএমইএ’র সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকা করা হয়। ঢাকা কাস্টমস, চট্টগ্রাম কাস্টমস, বেনাপোল কাস্টমস, ঢাকা বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট, শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তালিকার ভিত্তিতে বিজিএমইএকে চিঠি দিয়ে ওইসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঢাকা বন্ড কমিশনারেট অনুরোধ জানিয়েছে।

ওই চিঠিতে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর শুল্ক-কর ফাঁকির তথ্যও বিজিএমইএ’র কাছে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি ধরেছে, এসব প্রতিষ্ঠান সাড়ে ৩ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা ১২টি প্রতিষ্ঠানের ২৭৫ কোটি টাকার অনিয়ম উদ্ঘাটন করেছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ১৪টি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম উদ্ঘাটন করেছে, জড়িত রাজস্বের পরিমাণ ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করেছে, জড়িত রাজস্বের পরিমাণ ৪৪ কোটি টাকা। এছাড়া ঢাকা কাস্টম হাউস ৩টি, বেনাপোল কাস্টম হাউস ১০টি প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান দায় স্বীকার করেছে।

ঢাকা বন্ড কমিশনারেট সূত্র জানিয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা পাঠানো হয়েছে, তাদের হাতেনাতে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন সময় রাতে অভিযান চালিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকা থেকে খোলাবাজারে বিক্রির কাভার্ড ভ্যান নিয়ে যাওয়ার সময় তা আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই তাদের অপরাধের দায় স্বীকার করে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেছে। বিজিএমইএকে পাঠানো তালিকার বাইরেও বন্ড অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের আরেকটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

ঢাকা বন্ড কমিশনার এসএম হুমায়ুন কবীর বলেন, বন্ডের অপব্যবহার রোধে বিজিএমইএ ও এক্সেসরিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এসব সংগঠনের কিছু ফাঁকিবাজ প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে তাদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিজিএমইএ-কাস্টমস বন্ডের যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির সভা : সম্প্রতি সেগুনবাগিচায় ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটে কাস্টমস বন্ড ও বিজিএমইএ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সঠিত যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির আহ্বায়ক বন্ড কমিশনার এসএম হুমায়ুন কবীরের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিজিএমইএ’র সভাপতি ড. রুবানা হক।

বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বন্ডের কমিশনার আজিজুর রহমান, চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার ফখরুল আলম, বেনাপোল কাস্টমসের কমিশনার বেলাল হোসেন চৌধুরী প্রমুখ। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিজিএমইএ এ তথ্য জানিয়েছে।

সভায় কমিটির আহ্বায়ক এসএম হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘একসঙ্গে কাজ করলে এই শিল্পে আরও গতিশীলতা আসবে। আর তাই উভয় পক্ষ যেন একসঙ্গে উদ্যোগ নিতে পারে, সে লক্ষ্যেই যৌথ কমিটি গঠন করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, গার্মেন্টের ইউডিতে সঠিক পরিমাণ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে পণ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিজিএমইএ’র সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তা বিজিএমইএ’র নিজস্ব টিম দিয়ে গোপনে পর্যবেক্ষণের অনুরোধ জানান তিনি।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, বন্ডবিষয়ক সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তি একই ধরনের নয়। এ বিষয়গুলো বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক পরবর্তী ব্যবস্থা গৃহীত হবে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি, প্রয়োজনে চুয়েটের সহযোগিতা গ্রহণ, খ্যাতনামা পিএসআই কোম্পানির ল্যাবের সহযোগিতা গ্রহণের মাধ্যমে আরও কীভাবে দ্রুত পণ্য চালান খালাসের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তা নিয়ে উভয় পক্ষ আরও বিবেচনা করবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×