শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে অভিযান: উচ্ছেদের নামে ভাঁওতাবাজি

বস্তি-ঝুপড়ি ঘরে বিদ্যুৎ পানি গ্যাস সবই অবৈধ

  শিপন হাবীব ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অভিযান

রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনী। মঙ্গলবার সকালে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। ভাড়া করা একটি বুলডোজার আর ১৫-২০ জন শ্রমিক দুপুর ২টা পর্যন্ত কাজ করে। এখানে কয়েক বছর পর পর উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।

কিন্তু, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে শাহজাহানপুরে ২৫ একর জায়গাজুড়ে রেল কলোনির ৮০ শতাংশই চলে গেছে দখলদারদের হাতে।

ছোট বড় বস্তি রয়েছে প্রায় ৩৩টি। আর অবৈধ, দোকানপাট, গ্যারেজ, ক্লাব, কোচিং সেন্টার, মসজিদ, মন্দির, রাজনৈতিক কার্যালয়, বাজার তো আছেই। এখানে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন সবই অবৈধ। বস্তিগুলোতে চালানো হচ্ছে ফ্রিজ থেকে শুরু করে রঙ্গিন টিভিও।

শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনীতে প্রায় ২০-৩০ হাজার অবৈধ লোক বসবাস করছে। যেখানে গড়ে উঠেছে মাদক কেনাবেচার বড় হাট। ২০১১ সালের ২৮ জুলাই এ কলোনীতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে ওই সময়ের ভূ-সম্পদ কর্মকর্তাসহ ৩ জন রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য আহত হন। অবৈধ বসবাসকারীরা দলবদ্ধ হয়ে উচ্ছেদ পরিচালনাকারীদের উপর হামলা চালায়। এক পর্যায়ে উভয়ের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় আতংক বিরাজ করে। পরে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করে দেয়া হয়।

এ বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন মঙ্গলবার দুপুরে যুগান্তরকে জানান, অবৈধভাবে দখল করা রেলের সম্পত্তি উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকবে। শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনীতে গড়ে উঠা সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। উচ্ছেদের পর আবার দখলকারীদের বিরুদ্ধে মামলাসহ গ্রেফতার করা হবে। কোয়াটারের ভেতর কোনো রাজনৈতিক কার্যালয় কিংবা ক্লাব থাকতে পারে না। অবৈধ সব কিছু ভেঙে দেয়া হবে।

অভিযান চলাকালে ঢাকা রেলওয়ে বিভাগীয় প্রধান ভূসম্পদ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, এ কলোনীটি যেন পুরোটাই অবৈধ দখলে রয়েছে। বস্তি থেকে শুরু করে দোকানপাট, রাজনৈতিক কার্যালয়, ক্লাব, মসজিদ-মন্দির, বাজার, কোচিং সেন্টার সবই রয়েছে এ কোয়াটারে। এ সবই সম্পূর্ণ অবৈধ। দু’দিনের জন্য ১ লাখ টাকায় বুলডোজার এবং ৫০০ টাকা রোজে ২৫ জন শ্রমিক ভাড়া আনা হয়েছে।

রেলের নিজস্ব শ্রমিক ও বুলডোজার-সরঞ্জাম থাকলে নিশ্চয়ই উচ্ছেদের গতি আরও বেশি হতো। মঙ্গলবার প্রায় আড়াইশত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। আরও শত শত অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। উদ্ধর্তন কর্মকর্তাদের নির্দেশ পাওয়া গেছে। কোয়াটারের ভেতর কোনো অবৈধ স্থাপনাই রাখা হবে না।

মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে শুরু হওয়া উচ্ছেদ অভিযানের পর পরই লোকজন আবারও দোকানপাট, বেড়া, ঝুপড়ি ঘর তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। রাস্তার পাশে রেলের বাসা-১২ ঘিরে অবৈধ ১৬টি ঝুপড়ি বানিয়ে ভাড়া দিয়েছেন রেলওয়ের শ্রমিক মোস্তফা। তার নামে ১৬ নম্বর বাসাটি বরাদ্দ। তিনি এখানে থাকেন না। বাসাটি ভাড়া দিয়েছেন।

তার ১৬টি অবৈধ ঝুপড়ির মধ্যে ২-৩টি ভাঙার পরই উচ্ছেদকারীরা চলে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাড়াটিয়ারা বেড়া ও ভেঙে ফেলা ঝুপড়ি ঘর তিনটি মেরামত করে ফেলেন। কয়েকজন ভাড়াটিয়া জানান, রেল শ্রমিক মোস্তফাকে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা ভাড়া দিয়েই এক একটি ঝুপড়িতে ভাড়া থাকেন তারা। এখান থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ভাড়া তুলেন মোস্তফা।

রেলের ড্রাইভার আজগরের রয়েছে ২৫টি ঝুপড়ি ঘর। তার বাসা ঘেঁষে গড়ে উঠা অবৈধ ঝুপড়িঘরগুলো উচ্ছেদ করা হয়নি। কারন বুলডোজারটি বেশ বড়। রাস্তার দু’পাশে গড়ে উঠা কিছু অবৈধ স্থাপনা ভাঙা হয়েছে। যেসব গলি দিয়ে বুলডোজার প্রবেশ করা গেছে সেসব গলি ঘেঁষে থাকা কিছু অবৈধ স্থাপনা ভাঙতে দেখা গেছে। অবৈধ স্থাপনা অলিগলি, রাস্তা, বাসার প্রবেশমুখ, বাদ নেই কোনো জায়গা।

কর্মচারি ভবনের গা ঘেঁষে সামনে পিছনে গড়ে উঠেছে শত শত স্থায়ী দোকানপাট। এগুলোর গ্যাস, বিদুত্যের সংযোগও সরকারি, যা নিয়ন্ত্রন করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। উচ্ছেদকারীদের কয়েকজন জানান, এসব অবৈধ স্থাপনায় বিদুৎ, গ্যাস ও পানির লাইন সংযোগ রয়েছে। প্রাণের ভয় আছে। জীবন দিয়ে তো আর কাজ করতে পারবো না।

প্রায় শতাধিক রিকসা, ভ্যান ও মোটর গ্যারেজ রয়েছে কোয়াটারের ভেতর। আছে ভাঙারির দোকানও। ক্লাব তো মোড়ে মোড়েই রয়েছে। মঙ্গলবারের উচ্ছেদ অভিযানে কোনো ক্লাব কিংবা দলীয় কার্যালয়, গ্যারেজ ভাঙতে দেখা যায়নি। উল্লেখ, এ কোয়াটারের ভেতর ১০৮টি ৪ তলা ভবন রয়েছে। প্রায় ৯৫ শতাংশ ভবনেই রেলের লোকজন বাস করছেন না। পুরো কোয়াটারের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবং বগিরাগতদের নিয়ন্ত্রণে এ কোয়াটার চলে যাওয়ায় রেলের লোকজন নিজের নামে বরাদ্দ হওয়া রুম ভাড়া দিয়ে অন্যত্র থাকছেন। এখানে বরাদ্দ পাওয়া রেলের লোকজনদেরও লাভ হচ্ছে। রেলের লোকদের রুম বরাদ্দের বিপরীতে যদি ৪ হাজার টাকা কেটে রাখা হয়, তারা ভাড়া দিচ্ছেন ১২ হাজার থেকে ২৩ হাজার টাকা পযর্ন্ত।

জানা যায়, কলোনির ভেতরে রয়েছে প্রায় অর্ধশত ক্লাব-সমিতির কার্যালয়। বেশ জায়গা জুড়ে পাকা করে গড়ে উঠেছে শাহজাহানপুর থানা ছাত্রলীগ কার্যালয়। কার্যালয় প্রাঙ্গনে কার্যালয়টির ভিত্তিপ্রস্থর ফলকে লেখা রয়েছে ‘জনাব খালিদ মাহমুদ ভুইয়া’ দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। কোয়াটারের ভেতর অবৈধভাবে গড়ে উঠা শাহজাহানপুর থানা ছাত্রলীগের এ কার্যালয় বিষয়ে সংগঠনটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাজু যুগান্তরকে জানান, মঙ্গলবার থেকে উচ্ছেদ অভিযান চলছে। আমাদেরকেও নোটিশ করা হয়েছে এ কার্যালয়টি সরিয়ে নিতে। আমরা উপরের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। এখানে শুধু আমাদের কার্যালয়ই নয়, আরও বহু দলীয় কার্যালয় রয়েছে। সবার কার্যালয় উচ্ছেদ করা হলে আমাদেরটাও করা হবে। খোদ রেলওয়ের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর থেকেই এ কোয়াটার অবৈধ দখলকারীদের দখলে চলে যায়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×