৯৪ কোটি টাকা নিয়ে ৬ স্বর্ণ ব্যবসায়ী উধাও: চরম বিপাকে ভুক্তভোগীরা, এলাকায় ক্ষোভ

  আবুল খায়ের, কুমিল্লা ব্যুরো ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ক্ষোভ

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গ্রাহকের আমানতের ৯৪ কোটি টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়েছে পাঁচ হিন্দুসহ ছয় প্রতারক স্বর্ণ ব্যবসায়ী।

চড়া সুদসহ নানা প্রলোভন দেখিয়ে এলাকার সাধারণ লোকজনের কাছ থেকে স্ট্যাম্প ও চেকের মাধ্যমে আমানত গ্রহণ করে ৯৪ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় ওই পাঁচ ব্যবসায়ী। এর দায়দায়িত্ব নিতে নারাজ স্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতি। এদিকে হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে টাকা ও স্বর্ণ পাচার করে সেখানে নতুন করে স্বর্ণ ব্যবসাসহ বাড়িগাড়ি করেছেন প্রতারক ওই ব্যবসায়ীরা। স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের এমন প্রতারণা থেকে বাঁচতে এবং অর্থ ফেরত পেতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘেঁষে ও ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত চৌদ্দগ্রাম বাজার। এ বাজারে দীর্ঘদিন ৩৮ ব্যবসায়ী নামমাত্র ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে স্বর্ণ ব্যবসা পরিচালনা করছে। এদের মধ্যে অধিকাংশ ব্যবসায়ী সাধারণ গ্রাহকদের প্রলোভন দেখিয়ে স্ট্যাম্প ও ব্যাংক চেকের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ এবং চড়া সুদের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে স্বর্ণ বন্ধকের কারবার করে আসছিল।

সঠিক নিয়মে মুনাফা প্রদান করে এসব ব্যবসায়ী গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক এসব ব্যবসায়ীর কাছে কোটি কোটি টাকা আমানত রাখে।

সম্প্রতি অনেক গ্রাহক আমানতের টাকা ফেরত চাইলে ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের টালবাহানা করতে থাকে। বেশির ভাগ গ্রাহক প্রবাসীদের স্ত্রী হওয়ায় তারা সঠিকভাবে প্রতিবাদ করতে পারে না।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা এসব আমানতের টাকা কৌশলে হুন্ডির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী ভারতের বেলঘড়িয়া, শিলিগুড়ি, আগরতলায় পাচার করে। তারা সেখানে বাড়িগাড়ি করে আলিশান জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে রেখেছে। অনেকে কৌশলে চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা ও ফেনী সীমান্ত দিয়ে ভারতে স্বর্ণ পাচার করে আসছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাধারণ গ্রাহকের প্রায় ৯৪ কোটি টাকার আমানত ও স্বর্ণালংকার নিয়ে ছয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী আত্মগোপন করে। তাদের মধ্যে পাঁচজনই ভারতে পাড়ি জমিয়েছে। সেখানে নতুন করে স্বর্ণ ব্যবসা পরিচালনা করছে। পালিয়ে যাওয়া স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা হচ্ছেন- চৌদ্দগ্রাম বাজারের পিংকি জুয়েলার্সের মালিক গোবিন্দ বণিক, জলিল জুয়েলার্সের জাকির, শ্রী দুর্গা জুয়েলার্সের মালিক রঞ্জিত বণিক, অর্পা জুয়েলার্সের মালিক অলক ও জয় জুয়েলার্সের মালিক সুমন দত্ত।

গোবিন্দ বণিক প্রায় ৫০ কোটি, জাকির ১৫ কোটি, রঞ্জিত বণিক ২০ কোটি, অলক ৫ কোটি, সুমন দত্ত ৪ কোটিসহ ৯৪ কোটি টাকার আমানত ও স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যায়। তবে পালিয়ে যাওয়া জাকির ঢাকায় অবস্থান করছে। যে কোনো মুহূর্তে ইউরোপে পাড়ি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

আরও জানা গেছে, একই কায়দায় গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা আমানত ও স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে মজুদ রেখেছেন বাজারের আরও ছয় ব্যবসায়ী। ভুক্তভোগী জসিম উদ্দিনের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা এবং প্রবাসী শফিকুর রহমানের ৩৫ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছে পিংকি জুয়েলার্সের মালিক গোবিন্দ। ওই দুই ভুক্তভোগী জানান, বিভিন্ন গ্রাহকের প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক গোবিন্দ।

ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিনের ৩ লাখ টাকা নিয়েছে রঞ্জিত। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করে কোটি কোটি টাকা আমানত রাখি। কিন্তু হঠাৎ করে তারা দোকানে তালা মেরে উধাও হয়েছে। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারি, জমাকৃত আমানত ও স্বর্ণালংকার নিয়ে তারা ভারতে চলে গেছে। আর কোনো স্বর্ণ ব্যবসায়ী যাতে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করতে না পারে, সেজন্য স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের থেকে আমানত তুলে নেয়াসহ প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এ ব্যাপারে চৌদ্দগ্রাম বাজার স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নরেশ বণিক দায়দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, গ্রাহকরা নিজের ইচ্ছায় সমিতিকে না জানিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীদের কাছে আমানত ও স্বর্ণ বন্ধক রেখেছে। এতে আমাদের কিছু করার নেই।

চৌদ্দগ্রাম বাজার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আইনের আশ্রয় নিতে চাইলে সহযোগিতা করব।’

পৌর মেয়র মিজানুর রহমান সাধারণ গ্রাহকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। বলেন, সরকারের নির্দেশনা ছাড়া গ্রাহকরা জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের কাছে যেন কোনো আমানত জমা না রাখে।

চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি আবদুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, ভুক্তভোগীদের কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক আবুল ফজল মীর বলেন, ভুক্তভোগী কোনো গ্রাহক সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×